মুহূর্তে কনকর্ড মেট্রো ইশটিশনটি পুলিশ এসে ঘেরাও করে ফেলে। পুলিশের একজনকে দানিয়েল জিজ্ঞেস করে, ঘটনা কী?
ঘটনা কিছু না। দুটো আত্মহত্যা ঘটেছে।
কী কারণ।
ওই যা ঘটে। কারণ হল বসন্ত।
কারণ হল বসন্ত, নীলা হাঁ হয়ে থাকে। দানিয়েল নীলার হাঁয়ের ভেতর একবোঝা তথ্য গুঁজে দেয়।
বসন্তকাল হল আত্মহত্যার ঋতু। দুটো যুবক চলন্ত গাড়ির তলায় ঝাঁপ দিয়েছে। মরতে চেয়েছে, মরেছে। এরকম প্রতি বসন্তকালেই লোকে রেলের তলে জীবন দেয়। এর কারণ, দানিয়েল আগেই জানিয়েছে যে বসন্তকাল।
বসন্তকালে মানুষের আত্মহত্যা করার ইচ্ছে হবে কেন, এই কারণটি নীলা জানতে চায়।
বসন্ত এলে পশ্চিমিরা যত দূর জানে সে, আনন্দে মেতে ওঠে। তবে আত্মহত্যা কেন?
দানিয়েল বলে, যারা একা, সঙ্গীহীন, তারা আত্মহত্যা করে এ সময়টায়। বসন্তকালে একাকিত্বের জ্বালা খুব বেশিরকম হয় কিনা। বসন্তই তো জানিয়ে দেয় যে গ্রীষ্ম আসছে, সুখের সময় আসছে, প্রেমের সময় আসছে, মিলনের সময় আসছে। সারা গ্রীষ্মকাল প্রেমিক প্রেমিকা জোড়ায় জোড়ায় ঘুরে বেড়াবে, আনন্দ করবে, আর যারা একা, মাঠে ঘাটে লেকের ধারে, সমুদ্রতীরে এত জোড়া দেখে আরও বেশি একা বোধ করবে, এই ভয়ে এই কষ্টে বসন্তকালেই, গ্রীষ্ম আসার আগেই আত্মহত্যা করে।
নীলা বোঝে না।
বুঝলে না তো! বুঝবে কেন? অন্যের কষ্টের কথা তুমি বুঝবে কেন!
দানিয়েলের ব্যঙ্গোক্তি নীলাকে স্পর্শ করে না। ত্রকাদেরোর দিকে হাঁটতে হাঁটতে সে অন্যমন হয়। ভাবতে থাকে রেলের চাকায় পড়ে খুলি উড়ে যাওয়া, গায়ের মাংস হাড় থেতলে ছিটকে পড়া দুটো যুবকের কথা।
আত্মহত্যা করল কেবল সঙ্গী ছিল না বলে, সামনের দুটো মাসে তাদের আনন্দ করা হবে না বলে! নীলার যদি কোনও প্রেমিক না থাকত, নীলা কি আত্মহত্যা করতে পারত? পারত না। প্রেমই তো জীবনের একমাত্র সুখের ঘটনা নয়, আরও কত কী আছে, ঝরাপাতার মর্মর শব্দ শোনা আছে, মেঘের সঙ্গে এলোমেলো ভেসে বেড়ানোর খেলা আছে, দীর্ঘ বিকেল জুড়ে চমৎকার একটি কবিতার বই পড়ে ফেলা আছে, জীবন পূর্ণ করার সহস্র উপায় পড়ে আছে।
মানুষকে বুঝতে শেখো নীলা, মানুষের কষ্টগুলোকে জানতে শেখো।
নীলার জানা হয় না অনেক কিছু। ত্রকাদেরোর ডাক্তারখানায় রোগীর ভিড় দেখে নীলা ঘাবড়ে যায়। এত লোকের মনে কী অসুখ তার জানতে ইচ্ছে করে। নীলা দেখে, খুব মন দিয়ে কেউ পত্রিকা পড়ছে, কেউ পাশের জনের সঙ্গে গলা নামিয়ে কথা বলছে, কেউ ঝিমোচ্ছে। নিকল এসেছিল তার বেড়ালের পেচ্ছাপের অসুখ হয়েছিল বলে সে মনোকষ্টে ছিল, তা সারাতে। দানিয়েল এসেছে, নীলা কলকাতা যাচ্ছে বলে মনে সে আঘাত পেয়েছে, সেটি দূর করতে। নীলা অনুমান করে ঝিমোচ্ছে লোকটির নিশ্চয় বউয়ের সঙ্গে দু রাত ঝগড়া হয়েছে বলে এসেছে, পত্রিকা পড়ছে ভদ্রলোকের নিশ্চয় কয়েক রাত ভাল ঘুম হয়নি বলে এসেছে, আর পাশের জনের সঙ্গে কথা বলছে যে সম্ভবত কথা যখন বলে জোরে বলে বলে এসেছে। আর যে ষোলো সতেরো বছর বয়সি মেয়েটি জানালায় তাকিয়ে আছে, মেয়েটি, নীলা অনুমান করে, প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল যাচ্ছে না বলে এসেছে। প্রথম বিশ্বের লোকের মনের সামান্য এদিক ওদিক হলে চলে না। মন থাকা চাই একশো ভাগ সুস্থ। মনের ভেতর কোনও রোগ শোক, কোনও দুঃখ কষ্ট, কোনও জ্বালা যন্ত্রণার চিহ্ন যেন না থাকে। শরীরে বল না থাকতে পারে, মনে যেন বল থাকে। আবেগ পরিমাণ মতো, কম বা বেশি হলে চলবে না। আর তৃতীয় বিশ্বে লোকের মনে পরিমাণ মতো কিছু নেই। এক কিলো শুয়োরে রসুনের কটি কোয়া চটকে দিলে স্বাদ হয় ভাল, তা নিয়ে প্রথম বিশ্বে গবেষণা চলে, তৃতীয় বিশ্বে চলে না, রসুনের পরিমাণ নিয়ে গবেষণা করার সময় নেই। পেটে ভাত নেই যাদের তাদের আবার রসুন, তাদের আবার মন। মন ধুয়ে জল খাওয়া গেলে, সে জলও খেত তৃতীয় বিশ্ব, খাবার জলের অভাব।
দানিয়েলের হয়ে আসতে ঘণ্টা দুই লাগে। ও ঠিক বেরিয়ে আসে গির্জার স্বীকারোক্তি ঘরের জানালা থেকে পাঁড় ক্যাথলিকের মতো। বেরিয়ে বিষণ্ণ মুখ, নীলার দিকে না এগিয়ে দরজার দিকে। নীলা ভিড় কেটে দানিয়েলকে ফেরায়।
নীলার দু বাহুর বেষ্টন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দানিয়েল বলে, আমাকে একা থাকতে দাও।
তাকে একা থাকতে দেয় না নীলা, কারও মন খারাপ হলে একা থাকতে দিতে সে শেখেনি। তার যদি মনে কষ্ট হত কোনও, মলিনা এসে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন, চোখের জল মুছিয়ে দিতেন, আদর পেয়ে নীলার কষ্ট চলে যেত ত্রিসীমানার বাইরে। নীলার কখনও কোনও মনের ডাক্তার খুঁজতে হয়নি।
কেন তোমার ডাক্তারের কাছে যেতে হল। আমি যদি কারণ হই, আমার সঙ্গে কথা বলো। মনের যা কথা আছে খুলে বলো। আমাকে বলো, আমাকে তো তুমি ভালবাসো, ভালবাসো না? নীলা দানিয়েলের চিবুক ধরে নিজের দিকে মুখটি ফিরিয়ে বলে।
দানিয়েল চেঁচায়, বলেছি তো তোমাকে, আমাকে একা থাকতে দাও।
তোমার মন খারাপ, একা থাকলে মন আরও খারাপ হবে। ডাক্তারের ঘরে ঢোকার আগে মন তোমার এত খারাপ ছিল না। বলে নীলা দানিয়েলকে জড়িয়ে ধরে আবার দুহাতে। নীলার হাত ছুড়ে নিজেকে মুক্ত করে দানিয়েল ত্রকাদেরোর বেদিতে গিয়ে বসে। পাশে বসে নীলা বড় মমতায় একটি হাত রেখে দানিয়েলের কাঁধে, বলে, এত সুন্দর শহর, এত সাজানো, সবার পেটে খাবার আছে, সবার বাড়ি আছে, সবার পরনে কাপড় আছে, সবার জন্য নিরাপত্তা আছে, তার পরও কেন মানসিক রোগের ডাক্তারের কাছে যেতে হয় এত লোকের।
