দানিয়েল যেদিন প্রথম বলেছিল, আমি শক্ত পরিশ্রম করেছি গত দুসপ্তাহ।
কী পরিশ্রম? নীলা জানতে চেয়েছিল।
গোটা দুই বই পড়ে সারাংশটা লিখেছি।
শক্ত পরিশ্রম কী করলে সেটা বলো।
ওটাই তো শক্ত পরিশ্রম।
ওটা শক্ত পরিশ্রম? নীলা অবাক হয়েছে শুনে।
হ্যাঁ।
বই পড়ার মতো আরামের জিনিস আর আছে নাকি? কী বই?
গল্পের।
বাহ। এ তো অবসরের মজা।
বলো কী? অবসরে আমি ঠিক ওই বইটিই হয়তো পড়তে চাই না।
হুম, ক পাতা লিখেছ?
দু পাতা!
এমন চাকরি যদি আমি পেতাম। নীলা মনে মনে বলেছে।
দানিয়েল তাকে আকর্ষণ করে আবার করেও না। দানিয়েলের কথায় যুক্তি আছে, আবার নেইও। নীলা দোলে। ভাল লাগায় না লাগায়। দানিয়েল যে যুক্তিই দিক, সুদর্শন পুরুষ থেকে নীলা চোখ ফেরাতে পারে না। তার ইচ্ছে করে পুরুষটি তাকে বলুক ভালবাসি। পুরুষটি তাকে চুমু খাক। তাকে নিয়ে শৃঙ্গারে মাতুক, পুরুষটি তার ভেতর ঘরে চলে যাক অপার আনন্দে। কিন্তু নীলা চাইলেই ব্যাপারটি ঘটে না। সে লক্ষ করছে, কোনও সুদর্শন পুরুষ তার দিকে ফিরে তাকায় না। কলকাতার রাস্তায় বেরোলে লোকে ফিরে ফিরে দেখত তাকে। এখানে রাস্তার বখাটে ছেলেরাও সিটি বাজায় না নীলাকে দেখে, যেন সে কেউ নয়, যেন সে বিদঘুটে একটি মাংসপিণ্ড, তাকে এড়াতে পারলেই বাঁচে সব। রূপসি বলে তাকে সবাই বলত কলকাতায়, তার রূপের কোনও দাম নেই এদেশে। দানিয়েল দাম দিচ্ছে, দানিয়েলের শরীর রোদ্যাঁর ভাস্কর্যের মতো সুডোল সুন্দর হোক না কেন, ওর মুখটি লাবণ্যহীন, কণ্ঠটি কর্কশ। নীলা শেষ অব্দি এক কুশ্রী মেয়ের সঙ্গে জীবন জড়াল কি! আসলে এ ঠিক জীবন জড়ানো নয়, দানিয়েলের প্রেমে সে পড়েনি, দানিয়েলকে নিয়ে কোনও স্বপ্ন সে দেখে না, ও কি জানে একথা? নীলার বিশ্বাস, জানে না।
এত গভীরভাবে ভাবছে কী নীলা, দানিয়েল কফি শেষ করে জানতে চায়। কী ভাবছে তা নীলা বলে না, কিন্তু জিজ্ঞেস করে দানিয়েল তাকে কিছু ফ্রাঁ ধার দিতে পারবে কি না।
কত?
এই ধরো, পাঁচ হাজার।
পাগল হয়েছ। কী করবে ফ্রাঁ দিয়ে?
কলকাতা যাব।
কলকাতা কেন?
মার অসুখ।
ওই সুনীলের বাড়ি গেছিলে তো! ও তোমার মাথায় এসব দিয়েছে। যাও কলকাতা, দেখবে কীভাবে তোমাকে বন্দি করে ওখানে। দানিয়েল ভীষণ বিরক্ত হয়ে বলে।
আমার মার অসুখ, আমি দেখতে যাব। ব্যাস।
তুমি গিয়ে অসুখ সারাবে? এমনই দেশ তোমাদের, ডাক্তার নেই? হাসপাতাল নেই?
সব আছে, কিন্তু আমি দেখতে যাব।
এখন গিয়ে কোনও লাভ আছে? সৎকারের সময় না হয়ে যেয়ো।
সৎকারের প্রশ্ন আসছে না। সেবার প্রশ্ন।
ওখানে নার্স নেই সেবা করার? তুমি তো বলেছ কাজের লোক আছে অনেক।
সব আছে। কারও অভাব নেই। কিন্তু আমি যাব কলকাতা…
তা যাও। আমার কাছে এত টাকা নেই।
অন্য কারও কাছে ধার করে দিতে পারবে?
কেউ এত টাকা দিতে পারবে না।
নীলা নিঃশব্দের কোলে মাথা রেখে বসে থাকে। চা তার অনেকক্ষণ শেষ হয়েছে।
এখন গিয়ে যদি চলে আসো, তারপর সৎকারের সময় কি আবার যাবে? দানিয়েল তার কর্কশ কণ্ঠ যথাসাধ্য মধুর করে বলে।
সৎকার সৎকার কোরো না দানিয়েল। আমার মার এমন অসুখ হয়নি যে তিনি মারা যাবেন। নীলা দাঁতে দাঁত পিষে বলে, চোয়ালের পেশি তার শক্ত হয়ে থাকে।
তাহলে আর যাওয়া কেন?
যাওয়া, কারণ আমার মা…
দানিয়েল নীলাকে কথা শেষ করতে দেয় না, ভেংচি কেটে বলে, আমার মা, আমার বাবা, আমার ভাই, আমার বোন, যত্তসব।
দানিয়েলের ভেংচিতে ভ্রূক্ষেপ না করে নীলা বলে, আমার মন বলছে মার কেবল সর্দিজ্বর হয়নি। অন্য কিছু।
দানিয়েল নিজের কফির দাম টেবিলে ছুঁড়ে দিয়ে শব্দ করে চেয়ার সরায়। বাঁ হাতের মধ্যমাটি তুলে ধরে নীলার সামনে। নিজের বাঁ বাহুতে ডান হাতে চাপড় লাগিয়ে, কনুই তেঙে ঝাঁকুনি দেয়। দানিয়েলের সারা গা থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে দগদগে রাগ, সেই রাগ সামান্য দমন না করে সে ক্যাফের দবজা ঠেলে বেরিয়ে যায়, চেঁচাতে চেঁচাতে, লা ফামেলিয়া। লা ফামেলিয়া।
.
আবিয়াঁ তো
কলকাতা যাবার আগে দুটো জায়গায় যাওয়া হয় নীলার। এক সানদানি, আর দুই ত্রকাদেরোয় মানসিক রোগের ডাক্তারের বাড়ি। সানদানিতে, কারণ রিতা সিকসুস তার তথ্যচিত্রের জন্য সাক্ষাৎকার নেবে। বাসিলিক দ্য সানদানির বাগানে বসে সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। বাগানের ভেতর সার্জ সান্তোসের বাড়ি। সার্জের সঙ্গে রিতার পরিচয়, তার বান্ধবী আন লরের কারণে, আন লরের মা ফ্রান্স বেনজাকিন জন্মেছে মিশরের এক ইহুদি পরিবারে, ফ্রান্সের যখন পাঁচ বছর বয়স, মিশর থেকে সব ইহুদিদের বের করে দেওয়া হয়েছিল, ফ্রান্সের পুরো পরিবার তখন চলে আসে ফ্রান্সে, রিতার প্রতিবেশী ছিল ফ্রান্স, এই সানদানিতেই, সানদানি তখন অনেকটা গ্রাম। সেই সানদানি এখন ঘিঞ্জি শহরতলি, চুরি ডাকাতি ছিনতাই হামেশা ঘটছে, সাদার বসতি খুব কম, বেশির ভাগই কালো আর বাদামি, বেশির ভাগই দরিদ্র, বেশির ভাগই লেখাপড়া না জানা, বেশির ভাগই বেকার।
নীলাকে যখন সানদানির ঝকঝকে বাড়িঘরের দিকে আঙুল তুলে বলা হয়, এসব দরিদ্র লোকের বাড়ি, নীলা ঠিক বোঝেনি দারিদ্র্য বলতে এরা কী বোঝে। বাড়িগুলোর সামনে দাঁড়ানো সার সার গাড়ি দেখে নীলা বলে, এই গাড়িগুলো তবে কাদের? ওদেরই, ওই দরিদ্রদের। নতুন মডেলের দামি গাড়ি নেই বলে ওরা দরিদ্র। নতুন মার্সেডিজ হলে, বি এম ডব্লু হলে, লিমোজিন হলে ওরা দরিদ্র নয়, খুব সহজ অঙ্ক। নীলার চোখ দেখেছে কলকাতার বস্তি, এ চোখে আর কোনও দারিদ্র্য দারিদ্র্য ঠেকে না। নীলার চোখ দেখেছে লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল মানুষ, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, পেটে খাবার নেই, পরনে কাপড় নেই, অসুখে ধুকছে, চিকিৎসা নেই, নীলাকে তোমরা দারিদ্র্য দেখিয়ো না, যে লোকটি রঙিন টেলিভিশনের সামনে বসে ভরপেট খেয়ে এই মাত্র বেরিয়ে এল, গায়ে ফ্যাশনের জামা জুতো, জোরে গান ছেড়ে, মাথা দুলোতে দুলোতে গানের তালে, গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে, তাকে আর যাই বলো দরিদ্র বোলো না, অন্তত নীলার সামনে।
