কী ব্যাপার আমার কথা শুনছ না?
শুনছি।
মোটেও শুনছ না।
শুনছি।
তবে যে অন্যদিকে তাকিয়ে আছো!
এখানেই ভুল করছ। যখন আমি মন দিয়ে কথা শুনি, তখন মুখের দিকে তাকাই না। তাকালে মনোযোগ নষ্ট হয় আমার।
তা তাকাও কোথায়?
তাকাই চেয়ার টেবিলের দিকে, দেয়ালের দিকে। যেসব পদার্থ মনকে অন্যদিকে ফেরায় না।
আর মুখ বুঝি অন্যদিকে ফেরায়?
তা ফেরায়। নাক ভোঁতা না টিকোলো, চোখ কালো না বাদামি, হাসলে কি গালে টোল পড়ে, কথা বললে মুখের কোন কোন পেশি নড়ছে, কপালে ভাঁজ পড়ছে কিনা কোনও কারণে, আর যদি পড়েই কটি ভাঁজ পড়ে…এসব দিকে মন চলে যায়।
দানিয়েল বলে, আমি কী বলেছি বলো তো? শুনেছ যখন!
বলেছ, নিকলকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
নিকলের আবার কী অসুখ হল হঠাৎ? নিকলের নয়। অসুখ পিপির। পিপিটা কে? পিপি হচ্ছে নিকলের বেড়াল।
পিপি পেচ্ছাপ করছে না। দানিয়েল বলে।
বেড়াল পেচ্ছাপ করছে না তো নিকলের হয়েছে কী?
তাই তো নিকলের মন খারাপ। ও মানসিক রোগের ডাক্তারের কাছে যাবে।
নীলা চমকায়। বেড়াল খাচ্ছে না বলে কারও মনে অসুখ হয় আর সে অসুখ সারাতে ডাক্তারের কাছে যেতে হয়! নীলা জোরে হেসে উঠতে চায়, কলিকালে কত কী দেখব বাবা! বলে অনেকক্ষণ সে হাসির রেশ ধরে রাখতে চায়, কিন্তু দমন করে নিজের কুকুরে স্বভাব।
কুকুর বেড়ালের নাম শুনলে নীলার পা উসখুস করে লাথি লাগাতে। কুকুর বেড়ালকে সে লাথি লাগিয়ে আসছে হাঁটতে শেখার পর থেকে, বলা যায় লাথি লাগানো শেখার পর থেকে। পাঁচিল টপকে রাস্তার বেড়াল রান্নাঘরে ঢুকে পাতিলের ঢাকনা সরিয়ে রাঁধা মাছ মাংস খেয়ে যায়, এ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। তাই চোরা বেড়াল দেখলে একেবারে পেট বরাবর লাথি লাগানোই ছিল একরকম নিয়ম। রাস্তার নোংরা ঘাঅলা নেড়িকুত্তাগুলো বাড়ির ত্রিসীমানায় ঢুকতে চাইলে লাথি মেরেই ওদের সরাতে হত। নীলা এই সভ্য সুন্দর কুকুরবিড়ালপ্রেমীর দেশে নিজের উসখুস করা পা দুটোকে ধমকে উদার করে।
.
এত কী দেখছ ওদিকে। নীলার চোখ যেদিকে, সেদিকে তাকিয়ে দানিয়েল দেখে এক ঝাঁকড়া চুলের যুবক দাঁড়ানো।
নীলার স্বীকারোক্তি, সুদর্শন থেকে চোখ ফেরাতে পারি না।
ছোঃ! একগাদা ঘেন্না ছুড়ে দেয় দানিয়েল। তুমি কি আবার আগের জীবনে ফিরতে চাও নীলা? দেখেছই তো পুরুষের সঙ্গে জীবনযাপন কী জঘন্য। তোমার শিক্ষা হয়নি?
সব ছেলেই তো কিষান নয়।
কিষান নয় তো সুশান্ত। ওই তো। সব পুরুষই এক। সব পুরুষই নারীকে অত্যাচার করে।
সবাই এক না দানিয়েল। কেউ কেউ ভালও তো বাসে।
ভালবাসা? এসপ্রেসোর কাপে চিনি নাড়তে নাড়তে দানিয়েল বলে, ও এক ধরনের জাল। পুরুষের ওই পাতা জালে আটকা পড়ে মেয়েরা। ভাবে, পুরুষ ছাড়া মেয়েদের চলে না। খুব চলে। এই দেখো আমাকে, আমার কি কোনও পুরুষের দরকার!
নীলার চা ঠাণ্ডা হতে থাকে, দানিয়েলের চোখে তাকিয়ে মুখের কথা শোনে।
দানিয়েলের পুরুষ ছাড়া চলছে, কিন্তু জগতের সবাই যদি দানিয়েলের মতো সমকামী হয়, জগৎ চলবে কী করে, নীলার প্রশ্ন। নীলা প্রাণী জগতের উদাহরণ দেয়, যে কোনও প্রাণীই স্বাভাবিক আকর্ষণ বোধ করে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি, মিলিত হয়, মিলিত হয় বলেই জন্মপ্রক্রিয়া চলছে, তা না হলে, সব মরে ভূত হয়ে যেত, জগৎটিও প্রাণীহীন হত, এমনকী উদ্ভিদহীন। ফিনিতো।
দানিয়েল বলে, এসব পুরুষের সৃষ্টি করা নিয়ম।
তুমি আমি কি কোনও বাচ্চা জন্ম দিতে পারব? পারব না। নীলা বলে।
কফিতে চুমুক দিতে গিয়েও না দিয়ে দানিয়েল বলে, আর কত বাচ্চার দরকার এ জগতে? যথেষ্ট আছে। আর পুরুষশাসিত বৈষম্যের জগতে আরও বাচ্চা এনে তাদের বৈষম্যের মধ্যে ফেলার দরকার কী!
একসময় তো আর বৈষম্য থাকবে না। এক হবে সব। সূদুর স্বপ্নের দিকে তাকিয়ে নীলা বলে।
দানিয়েল বলে, যখন হবে তখন হবে…আর যৌনতার জন্য, নারী যেদিন বলবে তার কোনও প্রয়োজন নেই পুরুষের, সেদিনই হবে পুরুষের পরাজয়। তার আগে নয়।
নীলা ঠাণ্ডা চায়ে চুমুক দেয়। এখানে ক্যাফেতে এক কাপ চা নিয়ে তিন চার ঘণ্টা পার করে লোকে। ক্যাফের বাইরে এদের দেখলে কী বিষম ব্যস্ত মনে হয়, যেন দৌড়োচ্ছ, ব্যস্ত ব্যস্ত বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলে এরা আর ক্যাফেতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয় বসে, ব্যস্ততার নীলা দেখে না কিছু। তার অনেক সময় মনে হয়, এদের চেয়ে কলকাতার লোকেরা অনেক ব্যস্ত, সত্যিকার ব্যস্ত, কিন্তু ব্যস্ততার কথা ওরা অত বলে না। এরা সপ্তাহে দুদিন ছুটি পায়, এই দুদিন দিব্যি ঘুরে বেড়ায়, শুয়ে থাকে, দুঘণ্টা বসে থেকে কাগজ পড়ে বলে শক্ত পরিশ্রম করে এলাম। ছো! শক্ত পরিশ্রমের এরা কিছুই জানে না। দেখত কলকাতার মুটে মজুর, দেখত রিকশাঅলা। কলকাতায় চায়ের দোকানে কেবল চা খাওয়ার জন্য যায় লোকে, খামোকা বসে থাকার জন্য নয়। এখানে ক্যাফেতে বসে অলস সময় কাটানো, বা সস্তা আড্ডাকেও সম্ভবত ব্যস্ততা বলে ধরে এরা।
পরিশ্রমের সংজ্ঞাও আলাদা এখানে। ভোরবেলা থেকে রাত অব্দি মাথায় দুমণ করে একশোটি বালুর বস্তা নিয়ে দু মাইল দূরে যেখানে দালান তোলা হচ্ছে, হেঁটে পৌঁছে দিলে নীলা বলবে বেশ পরিশ্রম করে এসেছে লোকটি। নীলার কাছে পরিশ্রমের সংজ্ঞা হল এই।
