নীলা চা খেল কেবল। চা খেয়ে বলল উঠি।
উঠি মানে? কোথায় যাবে?
কাজে। তারপর কাজ থেকে বাড়ি।
বাড়িটা কোথায় শুনি।
এক বান্ধবীর বাড়ি।
বান্ধবীর বাড়িতে কদিন থাকবে?
যতদিন ইচ্ছে।
এভাবে হয় না, বুঝলে নীলা। একটা কিছু সিদ্ধান্ত নাও।
কী সিদ্ধান্ত?
হয় কিষানের কাছে ফেরো, নয় কলকাতা ফেরো।
নীলা এরকমই একটা উত্তর মনে মনে জানত, যে সুনীল দেবে।
সুনীল নাগাড়ে বলে গেল, নীলা যা ইচ্ছে তাই করছে। এভাবে যা ইচ্ছে তাই করে জীবন চলে না। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এরকম মনোমালিন্য হয়ই। সময়ে সব ঠিক হয়ে যায়। কিষান এখনও নীলার জন্য অপেক্ষা করছে, সুনীলের তাই মনে হয়। আর যদি চেষ্টা করে ব্যর্থ হতে হয়, দেখা যায়, সম্পর্ক কিছুতে টিকবে না, তবে কিষানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলুক নীলা, পাকাপাকি ভাবে ছাড়াছাড়ির ব্যবস্থা হোক। তারপর সে অন্য কাউকে বিয়ে করুক, যার সঙ্গে জীবন যাপন সম্ভব হবে।
কী অন্যায় করেছিল কিষান? তোমাকে মেরেছিল?
না।
বাইরে অন্য কোনও মেয়ের সঙ্গে ওর সম্পর্ক ছিল?
না।
তবে কি ইমানুয়েলের ঘটনা?
না।
তবে কী?
নীলা ম্লান হাসল।
নীলা কুয়াশায় বেরিয়ে পড়ল।
কিষানের কাছ থেকে অলংকার উদ্ধারের পথ কী আছে সামনে ভাবতে ভাবতে নীলা কুয়াশার ভেতর হাঁটে। মেট্রোয় চড়ে না। কারখানার কাজে যাওয়ার ইচ্ছেকে বাতিল করে ক্যাফে রিভলিতে বসে পর পর দুকাপ চা খায়। চা খেয়ে সে বাসে চড়ে, আগের মতো বাসে, নিরুদ্দেশ যাত্রায়।
বাসে যা কখনও ঘটতে দেখেনি নীলা, ঘটে সেদিন। দুজন ইনস্পেক্টর টিকিট দেখতে উঠেছে যাত্রীদের। নীলা বসেছিল বাসের পেছনের দিকে, সাদা ইন্সপেক্টর সব লোক রেখে নীলার কাছে এল টিকিট চাইতে। প্যান্টের না কি জ্যাকেটের পকেটে টিকিট রেখেছে মনে করতে না পেরে সে এক এক করে পকেট খুঁজতে থাকে, টিকিটও বেরোতে থাকে একাধিক, যে টিকিটই ইনস্পেক্টরের হাতে দেয়, নাকচ করে দেয় পুরনো বলে। তাকে নতুন টিকিট দেখাতে হবে। এ পকেট, ও পকেট, হাতব্যাগ তন্ন তন্ন করে খোঁজে, চুপসে যায়, ঘামে, আর টের পায়, বাসের লোকগুলোর চোখ তার দিকে। পেছন ফিরে সবাই তাকে দেখছে। অসংখ্য সাদার মধ্যে নীলা এক অসাদা, অদ্ভুতুড়ে এক জীব, নীলা অন্যরকম, আর সব বাসযাত্রীর মতো সে দেখতে নয়। দাঁড়ালে, তার সন্দেহ হয়, লোকেরা তার পেছনদিকটায় তাকাবে লেজ আছে কি না দেখতে। নীলা টিকিট না নিয়ে বাসে চড়ে, দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজায়, সাদাদের নিজেদের জন্য করা সুযোগ সুবিধে বহিরাগত হয়ে দেদারসে ভোগ করে। ইন্সপেক্টরের ঠোঁটের কোণে দেখলে তো, অপরাধীকে চিনতে আমাদের ভুল হয় না। রং দেখলেই বুঝি কে টিকিট করেছে কে না করেছে ধরনের হাসি।
হাতব্যাগের কাগজের আড়ালে লুকিয়ে ছিল নতুন টিকিটটি, শেষ অব্দি খুঁজে পায় সে। ইন্সপেক্টরের হাতে দিলে টিকিটের সময় মিলিয়ে নীলাকে ছাড়ল। তার মনে হয়, অনেকটা আশাহত হয়েই ছাড়ল। বাসের আর কারও কাছে ইন্সপেক্টর টিকিট দেখতেও চাইল না। আর কারও রং, সে লক্ষ করে, তার রঙের মতো নয়।
হোটেল দ্য ভিলের সামনে বাস থামলে নীলা নেমে পড়ে। এই দালানটি সে বরাবরই মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখে, এত দেখে তবু দেখা ফুরোয় না। যেন অনন্তকাল সে এটির সামনে বসে বিমুগ্ধ নয়নে দেখতে পারবে এর স্থাপত্য, এতটুকু ক্লান্ত হবে না। নেমে সে দানিয়েলকে ফোন করে বলে দেয় সে কাজে যায়নি, তার ইচ্ছে করেনি। কেন ইচ্ছে করেনি, সে জানে না কেন ইচ্ছে করেনি। কী করছে নীলা? কিছুই করছে না। কোথায়? হোটেল দ্য ভিলের সামনে। কেন ওখানে গেছে, সে জানে না কেন। কখন বাড়ি ফিরবে, তাও সে জানে না।
দানিয়েল বলে, ওখানেই থেকো। আমি আসছি।
নীলা চায়নি দানিয়েল আসুক। ওভাবেই সে কাটাতে চেয়েছিল একা। তার আরও একটি ফোন করতে ইচ্ছে হয়েছিল, কিন্তু সে হাত গুটিয়ে রাখে। ফোনটি সে করে না, করে না কারণ তার ইচ্ছে করে না সে কোথায় থাকে কার সঙ্গে থাকে, আর কেনই বা কিষানের বাড়ি থেকে সে বেরিয়েছে এরকম প্রশ্নের সামনে পড়তে। নীলার ভয় হয়, পাছে সে শোনে সে বেশ্যা।
.
দানিয়েল এসে নীলাকে নিয়ে কাছের এক ক্যাফেতে ঢোকে।
কী হয়েছে।
নীলা হেসে বলে, কিছু হয়নি তো।
মন ভাল নেই তোমার নীলা, হয়েছে কী বলো?
কিছু হয়নি।
কী করলে সকাল থেকে?
সুনীলের বাড়ি গিয়েছিলাম। অলংকারের কথা জিজ্ঞেস করলাম। ফেরত পাবার কোনও সম্ভাবনা দেখছি না।
দানিয়েল জিজ্ঞেস করে, সে কারণেই কি এত ভেঙে পড়েছ?
নীলাও হাসে, আমাকে দেখে তাই কি মনে হচ্ছে তোমার?
না নীলাকে দেখে তা মনে হচ্ছে না। নীলাকে দেখে কিছুই অনুমান করতে পারে না দানিয়েল।
আমি তোমাকে ভালবাসি নীলা, আমার কাছে সব খুলে বলো না কেন! কাতরতা দানিয়েলের কণ্ঠে।
ভালবাসি শব্দটি নীলা দানিয়েলের মুখে আগেও শুনেছে। ঘরে। শব্দটি কখনও নীলাকে ফাঁপরে ফেলেনি, এখন ফেলছে। নীলার আশঙ্কা হয়, যে কেউ দানিয়েলের মুখে ভালবাসি শব্দটি শুনলেই বুঝে নেবে মেয়েটি সমকামী, আর ওর সঙ্গী, স্বাভাবিকভাবেই সমকামী। মেয়েতে মেয়েতে প্রেম কী করে হয়, নীলা বুঝে পায় না। আর মেয়েতে মেয়েতে কী করেই বা সত্যিকার সঙ্গম সম্ভব, যদিও প্রায় রাতেই দানিয়েলের পাশে শুয়ে ভোগ করে শীর্ষসুখ, বুঝে পায় না। এরকম সুখ সে নিজেই অবশ্য দিতে পারে নিজেকে, দানিয়েলের যে খুব একটা প্রয়োজন এ সুখ পেতে, নীলার মনে হয় না। নিজের শরীর নিয়ে সে নিজে কখনও খেলেনি, খেলা যে যায়, তাই সে কখনও জানত না। দানিয়েল বলেছে, যখন প্রেমিকার অভাব, তখন সে নিজেই নিজেকে যা সুখ প্রয়োজন, দেয়। শুনে নীলা অবাক হয়েছে। কত যে অবাক করা ব্যাপার চারদিকে। যৌনতা বিষয়ে বিষম লজ্জা ছিল নীলার, কেবল নীলার কেন, ভারতীয় মেয়ে মাত্রই থাকে, আর যে কথাই বলো যৌনতা বিষয়ে কোনও কথা নয়, এ লজ্জার জিনিস, এ লুকোনোর ব্যাপার, এ ঢেকে রাখার বিষয়। সুশান্তর সঙ্গে দু বছরে বড়জোর ছবার চুমু খেয়েছে দুজন। আর সেই ছটি চুমু খেতে কত না অপেক্ষা গেছে, কত না আড়াল তৈরি করতে হয়েছে। আর এখানে, নীলার ভাল লাগে আবার রাগও হয়, দেখে যে, ছেলেমেয়েরা দিব্যি রেলে বাসে, রাস্তায় বাগানে যেখানে ইচ্ছে চুমু খাচ্ছে একশো লোকের সামনে। ভাল লাগে ভালবাসা এরা লুকোয় না বলে, এদের ভেতর রাখঢাক বলে কিছু নেই বলে, এরকম হওয়াই তো উচিত, আর রাগ হয় এ কারণে কী রক্ষণশীলতার মধ্যে থেকে নীলা কত আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। নীলা তো এদেশে জন্ম নিতে পারত, নীলা তো পুরো কৈশোর, যখন তাকে ঘরে বসে থাকতে হয়েছে, ঘুরে বেড়াতে পারত বন্ধুদের সঙ্গে, প্রেমিকের কোমর জড়িয়ে হাঁটতে পারত যেখানে সেখানে, থাকতে পারত তার যা খুশি করার স্বাধীনতা। নীলার অনেকটা বয়স অব্দি যা খুশি করা হয়ে ওঠেনি, পারেনি সে। এই এখন, কিষানের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে অনেকটা যা খুশিই করছে সে, একটি মেয়ের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করা নিশ্চয়ই যা খুশি করা, নীলা অবশ্য এটিকে যা খুশি বলে না, এ সঙ্গম তার ইচ্ছেয় নয়, দানিয়েলের ইচ্ছেয়। সে দিব্যি ভেবে নিয়েছে নীলা তাকে ভালবাসে। দানিয়েল অবশ্য লক্ষ করে মাঝে মধ্যে, যে রাস্তায় হাঁটলে, রেস্তোরাঁ বা ক্যাফেয় বসলে নীলা তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে থাকে সুদর্শন ফরাসি যুবকদের দিকে। এই ক্যাফেতেও, দানিয়েল যখন বকে চলছে, ঘণ্টাখানেক পর দানিয়েলকে উঠতে হবে, নিকলকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে সে, নীলার চোখ অন্যদিকে।
