অত সকালেই রাস্তার ধারে এক সাদা ভিখিরি বসে গেছে, হাতে বড় একটি কাগজ ধরে রেখেছে, আমরা ক্ষুধার্ত। লোকটির পাশে বসে আছে লোকটির চেয়ে দ্বিগুণ বড় একটি কুকুর। দানিয়েল এ দৃশ্য দেখলে, নীলা জানে, কুকুরটির জন্য আহা আহা করবে, লোকটির সামনে রাখা টুপির ওপর দশ ফ্রাঁ রেখে তবে যাবে। কেবল দানিয়েলই নয়, এই ভিখিরি লোকটিকে যে লোকই পয়সা দেবে, দেবে কুকুরটির প্রতি মায়ায়। লোকের প্রতি নয়। নীলা মেট্রো ইশটিশনের ভেতরে দেখেছে, মেক্সিকান ছেলেরা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আদি মেক্সিকান সংগীত বাজায়, অদ্ভুত এক ধরনের বাঁশি ওদের মূল বাদ্যযন্ত্র, সামনে টুপি থাকে, গিটারের খোল পড়ে থাকে, লোক যেন পয়সা ফেলে ওতে, লোকে ভিড় করে দাঁড়িয়ে শোনে, শুনে বেশির ভাগই চলে যায়, পয়সা ফেলে না। মেট্রোয় বাজনা বাজিয়ে ভিক্ষে করা অবশ্য বেশ পুরনো ব্যাপার, কেউ কেউ জগৎবিখ্যাত সংগীতশিল্পী হয়েছে, জীবন শুরু করেছিল প্যারিসের মেট্রোয়। নীলার ধারণা, মেক্সিকান ছেলেরা যদি সংগীতে না যেয়ে কুকুরের খেলা দেখাত, ভাল পয়সা পেত। আমি ক্ষুধার্ত লেখা কাগজ নিয়ে আর হাতে একটি জলের গেলাস নিয়ে আজকাল অনেক মেয়েরাও বসে মেট্রোতে। সাদা মেয়ে। দানিয়েল বলেছে এরা কসোভা থেকে আসা, পূর্ব ইয়োরাপের গরিব দেশ থেকে আসা।
পূর্ব ইয়োরোপের গরিব দেশ থেকে লোকেরা এখন ভিক্ষে করতে আসছে এখানে? কমুনিজম ভেঙে তা হলে ওদের লাভটা হয়েছে কী, যদি ভিক্ষেই করতে হয়!
দানিয়েল বলেছে, কম্যুনিজম থাকাকালীন ওদের কোনও স্বাধীনতা ছিল না।
কী স্বাধীনতা ছিল না?
স্বাধীনতা ছিল না দেশের বাইরে যাবার।
নীলা প্রশ্ন করছে, হেসে, দেশের বাইরে গিয়ে ভিক্ষে করার?
কেবল তো ভিক্ষেই নয়, ওসব দেশের শিক্ষিত মেয়েরা, যারা একসময় ইস্কুলের মাস্টার ছিল, অথবা বড় কোম্পানিতে বড় পদে চাকরি করত, কমিউনিজম ঝরে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে, ইস্কুল বন্ধ হল, কোম্পানির দরজায় তালা পড়ল, কাজ কর্ম চাকরি বাকরিও ঝরে পড়ল, ঝাঁকে ঝাঁকে পতিতা হতে পশ্চিমে ধাইছে। এ নিয়ে দানিয়েল কোনও মন্তব্য করতে চায়নি।
পৃথিবীর সব দেশ থেকে লেনিন স্তালিনের মূর্তি উপড়ে ফেললেও, শহরের নাম বা রাস্তার নাম থেকে লেনিন স্তালিন দূর করলেও এই প্যারিসে কেন একটি জায়গার নাম এখনও স্তালিনগ্রাদ, তা জিজ্ঞেস করলেও দানিয়েল উত্তর দেয়নি, বিরক্ত হয়েছে।
.
নীলা হেঁটে হেঁটে ল্যুভর জাদুঘরের পেছনে যায়, পেছনে রু দ্য রিভলি, পেছনে সুনীলের বাড়ি।
সুনীল নীলাকে দেখে অবাক, এই সকালে তুমি কোত্থেকে? কোথায় থাকো! কী করো! চিঠি পেয়েছ! একটা খবর দেবে না! এদিকে কী রকম দুশ্চিন্তায় আছি, সে জানো?
একসঙ্গে অনেক প্রশ্ন। নীলা একটিরও উত্তর দেয় না। জিজ্ঞেস করে, কী অসুখ হয়েছে মার?
সে জানি না। নারায়ণ, যে শ্যানেল পৌঁছে দিয়েছিল তোমাদের বাড়িতে, কলকাতা থেকে ফিরে এসেছে, সেই বলেছে যে মাসিমার অসুখ নিখিল ফোন করেছিল দুদিন, বলেছে তোমাকে কলকাতা যেতে। পারো তো আজই।
এ কথা সে কথার পর নীলা আসল কথা পাড়ে। সোনার অলংকার।
কিষানের সঙ্গে অনেকদিন যোগাযোগ নেই সুনীলের। শেষ কথা হয়েছে ফোনে, সুনীল ফোন করেছিল, নীলার কোনও খবর পেয়েছে কি না জানতে, কিষান বলেছে আমার কাছে জিজ্ঞেস করো কেন, নীলার খবর তুমিই তো ভাল জানো।
আমি জানব কী করে? সুনীল অবাক।
আমার বউকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছ, তুমি জানবে না তো কে জানবে। এই হল কিষানের উত্তর।
কিষান বিশ্বাস করে, সুনীলের আশকারা পেয়ে নীলার এমন বাড় বেড়েছিল। কিষানের বিশ্বাস সুনীলের সঙ্গে শলা পরামর্শ করেই নীলা বাড়ি ছেড়েছে।
ওই বেশ্যার নাম আমার সামনে আর নেবে না। বলে কিষান ফোন রেখে দিয়েছে।
এরপর সুনীল আর কিষানের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। কিষানের তো প্রশ্ন ওঠে না।
সুতরাং অলংকারের কথা জিজ্ঞেস করা সুনীলের নিজের পক্ষে সম্ভব হবে না, তবে কিষাণের বন্ধুদের সে জানাতে পারে। সুনীলের ধারণা, কিষান সে অলংকার ফেরত দেবে না।
নীলারও ইচ্ছে করে সব দুর্ঘটনার জন্য সুনীলকে দায়ী করতে। দায়ী করে কিষানলালের সঙ্গে তার বিয়ে ঘটানোর জন্য। কিন্তু নীলা আবারও ভাবে, আজ যদি কিষানলাল না হয়ে অন্য এক ভারতীয় হত তার স্বামী, খুব একটা পার্থক্য হত কি! হত না, সে ওই বসে থেকেই দেখছে, চৈতালি সকালের খাবার তৈরি করে টেবিলে রাখছে, সুনীল খেতে বসছে। সুনীল ক্লিনিকে চলে গেলে টুম্পাকে ইস্কুলে ওই চৈতালিই দিয়ে আসবে, তারপর যাবে নিজের আপিসে। আপিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে টুম্পাকে ইস্কুল থেকে নেবে। বাচ্চাকে স্নান করানো, খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো সব চৈতালিই করবে। ঘরদোর ঝাড়মোছ চৈতালিই করবে, রাতের রান্না, চৈতালিই। সংসারে সময় বেশি দিতে হয় বলে, চৈতালি চাকরি নিয়েছে কম সময়ের, আট ঘণ্টার জায়গায় চার ঘণ্টার।
দানিয়েলের সঙ্গে নীলার যে সংসার, এতে কোনও বৈষম্যের ব্যাপার নেই। নীলা রান্না করল তো দানিয়েল বাসন ধুল। নীলা বাজার করল তো দানিয়েল রান্না করল। সে এ মাসে বাড়ি ভাড়া দিল তো পরের মাসে দানিয়েল দিল। নীলার হাতে টাকা নেই তো দানিয়েল সংসার চালাচ্ছে, হাতে টাকা এলে সে তা শোধ করে দেবে।
