নীলাকে বুঝিয়ে বলতে হল, আমাদের দেশে আমরা এরকম ভাগ করে দাম দিই না, খেতে গেলে যে কোনও একজন মেটায় দাম। মানে, হয় আমি দেব, নয় তুমি দেবে।
ক্যাথারিনের ভুরুতে সংশয় তখনও লেগে আছে দেখে নীলা ওর কাঁধে হাত রেখে হেসে বলেছিল, চলো উঠি।
তুমি যে দাম দিলে, তোমাকে আমি বিনিময়ে কী দিতে পারি? ক্যাথারিন কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিল।
আমাকে কিছু দিতে হবে না। দিতে হবে কেন! তুমি এমন বিনিময়ের কথা ভাবো কেন বলো দেখি!
ক্যাথারিনের ভুরু থেকে সংশয় নামে, মুখে হাসি ফোটে, চমৎকার হাসি। ধন্যবাদ, অনেক ধন্যবাদ তোমাকে।
নীলার মনে হয়েছিল, বিনিময়ের দায়িত্ব কাঁধ থেকে নেমেছে বলেই সম্ভবত ক্যাথারিনের সারা মুখে প্রশান্তি ছড়াল।
ওরকমই চমৎকার একটি হাসি এখন ক্যাথারিনের ঠোঁটে।
নীলা এত চমৎকার হাসতে জানে না। হাসলে ওর ভাঙা দাঁতটি বেরিয়ে আসে, ছোটবেলায় কলতলায় পড়ে ভাঙা।
.
লা ফামেলিয়া
কিষানের কাছ থেকে ঠিকানা পাওয়া যায়নি বাক্সবন্দির কারখানার, মোজাম্মেলের কাছে ধরনা দিয়ে ঠিকানা জোগাড় করে দুদিন ফোন করে একদিন নিজে কারখানায় এসেও নীলার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি সুনীলের। অতঃপর এই ডাকের চিঠি, তোমার মা খুব অসুস্থ, কলকাতা চলে যাও যত শীঘ্র পারো।
সুনীলের এই পরামর্শে নীলা হেসে ওঠে। নীলা হাসে কারণ তার কিছুতে মনে হয় না মলিনার অসুখ করেছে, যদি করেই থাকে, সে সর্দিজ্বর, আর সুনীল পরামর্শ দিচ্ছে নীলাকে কলকাতা যাওয়ার এ মলিনার কোনও অসুখের কারণে নয়, নীলার স্পর্ধার কারণে যে স্পর্ধায় সে কিষানের বাড়ি ত্যাগ করেছে, সুনীলকে যে কারণে বেকায়দায় পড়তে হয়েছে, যেহেতু কিষান সুনীলকেই দোষ দিচ্ছে নীলার এই ধৃষ্টতার জন্য, আর প্যারিসের ভারতীয় মহলে নীলা যেহেতু মুখরোচক আড্ডার একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিষানের বউ পালিয়েছে রে, পালিয়েছে! আর সুনীলের যেহেতু ইচ্ছে হয় না এসব শুনতে, স্বামীর সংসার করতে নীলা প্যারিসে এসেছে, তার যদি স্বামীর বাড়ি ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে, সে বাপের বাড়ি চলে যাক, যা নিয়ম।
নীলা প্রথম দানিয়েলকে খবরটি দেয়।
শুনে দানিয়েল বলে, পরিষ্কার ষড়যন্ত্র। দেখো গিয়ে কিষান জড়িত আছে এর মধ্যে। আর, তোমার মার যদি অসুখ হয়েই থাকে তো তুমি গিয়ে অসুখ সারাবে নাকি? তোমাদের দেশে কি ডাক্তার নেই?
তাই তো! নীলা বলে।
তাই তো। দানিয়েলও।
তারপর দুজন এক বোতল সাদা ওয়াইন শেষ করে। সাদা ওয়াইন, কারণ দানিয়েল এক থালা শামুক আর এক বাটি ঝিনুক শেষ করেছে। ওর রাতের খাবার। ওসবের সঙ্গে লাল ওয়াইন যায় না, যায় সাদা।
নীলার শামুক ঝিনুক পোষায় না। ভেতো বাঙালি ভাত খেয়েছে। সবজি খেয়ে তার অভ্যেস হয়েছে। মাছ মাংস না হলেও আজকাল চলে তার।
শুতে যাবার আগে দানিয়েল দুটো সুখবর দেয়, প্রথম–রিতা সিকসুস একটি ছবি বানাচ্ছে প্যারিসে বিদেশি মেয়েদের অবস্থা নিয়ে। এতে নীলার একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। পাঁচশো ফ্রাঁও দেবে।
দ্বিতীয়–দানিয়েল তার তিনজন বন্ধুকে বলেছে নীলার জন্য ভাল একটি চাকরি খোঁজ করতে।
দানিয়েলকে জড়িয়ে ধরে নীলা নাচে।
এই তো নাচলে!
পেটে কিছু পড়লে নাচা যায়। হাত পা ছুঁড়ে ডিসকোটেকের নাচ নাচা যায়। ভরতনাট্যম নয়।
দেখলে তো, যোগাযোগ থাকলে কী হয়! সেদিন নিকলের বাড়িতে যাওয়ার উপকারটা পেলে তো!
নীলা অস্বীকার করতে পারে না।
রাতে তার ভাল ঘুম হয় না। সারারাত উঠে উঠে পেচ্ছাপ করে, রাতের পেচ্ছাপ জমা করতে হয় ঘরের বালতিতে, সকালে ভরা বালতি করিডরের কোণে বারোয়ারি পেচ্ছাপখানায় ঢেলে দিতে হয়। এ কাজটি নীলা নাক চোখ মুখ বন্ধ কোরে করে, করতে হয়। দানিয়েলই করত প্রথম প্রথম। কিন্তু একসময় অতিষ্ঠ হয়ে আদরের দুলালিকে বলল, এই মেয়ে, তুমি কি আমাকে তোমার চাকর পেয়েছ? না, নীলা দানিয়েলকে চাকর পায়নি মোটে, চাকর যে পায়নি তা প্রমাণ করতেই সপ্তাহে তিনদিনের জায়গায় পাঁচদিনই বালতি পরিষ্কার করে সে।
সকালবেলা ছতলার করিডরের কোণে তয়লেতে যাবার লাইন লাগে, নীলা লাইন ভেঙে তয়লেতে ঢুকতে চেয়েছে কদিন, দানিয়েল বলেছে, এই মেয়ে, যে আগে সে আগে। যে আগে সে আগে, কনুই ঠেলে লাইন ভেঙে গা গলিয়ে আগে যাওয়ার বদঅভ্যেস নীলাকে ত্যাগ করতে হয়েছে। রোববার সকালে বুলানজেরিতে লাইন, বাসে উঠতে লাইন, নামতে লাইন, মেট্রোয় টিকিট কেনার লাইন, যেদিকে যায় সেদিকে লাইন, লাইনের শহর এটি, নীলার চোখ মুখ নাক বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে লাইন রক্ষা করতে হয়। যে আগে সে আগে, যে পেছনে, সে পেছনে। নীলা বরাবরই পেছনে। সবার পিছে, সবার নীচে, সবহারাদের মাঝে।
.
ভোরের আলো ফুটতেই নীলা তৈরি হয়।
দানিয়েল জিজ্ঞেস করে, এত সকালে নীলা যাচ্ছে কোথায়। এত সকালে নীলা ভোরের হাওয়ায় হেঁটে বেড়াবে, ক্যাফেতে ঢুকে চা আর কোয়াসাঁ খাবে, এত সকালে নীলা সকাল দেখবে শহরের।
কুয়াশায় ঢাকা রাস্তায় নীলা একা হাঁটে। দুতিনটে মাতাল রাস্তায় কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছ। মাথার কাছে খালি মদের বোতল। দুতিনটে লোক কুকুর নিয়ে বেরিয়েছে, কুকুরের হাওয়া খাওয়া আর প্রাতঃক্রিয়া দুটোই সারতে। কুকুরমূত্রে পথচারীর কোনও অসুবিধে হয় না, হয় মলে। শহরের ফুটপাতে কুকুরের মলের পাহাড় গড়ে উঠত, যদি না মল তোলার সরকারি এক সবুজ বাহিনী থাকত। সবুজ বাহিনীর চাকরিই হচ্ছে মটরসাইকেলে ঘুরে ঘুরে শহরের যত জায়গায় যত কুকুরনির্যাস আছে, তুলে সাইকেলের পেছনে বড় সবুজ বাক্সে ভরে শহরের বাইরে চলে যাওয়া।
