দানিয়েল জিভে কামড় দেয়। হিটলারের সঙ্গে যে লোক বন্ধুত্ব করেছে, তাকে নিয়ে বাঙালির গৌরব?
নীলা হেসে বলে, গুন্টার গ্রাসও এভাবে জিভ কেটেছিলেন লজ্জায়। কলকাতায় সুভাষ বসুর মূর্তিতে মানুষের ফুল দেওয়া দেখে।
.
ওরই মধ্যে এক মন উদাস করা বিকেলে নীলা বেরিয়ে পড়ে, এলোমেলো হেঁটে বেড়িয়ে পের লাসেজের দক্ষিণ দরজার উলটোদিকে ছত্রিশ নম্বর বাড়িতে ঢোকে, ক্যাথারিনের বাড়ি। ক্যাথারিনের সঙ্গে চা খেতে খেতে বাউলের গল্প করবে, আর ও চাপাচাপি করলে দুটো বাউলসংগীতও ওকে শুনিয়ে দেবে, এরকম ইচ্ছে।
দরজায় কড়া নাড়লে ক্যাথারিন বেরিয়ে আসে। নীলাকে দেখে চমকে ওঠে, তুমি?
অপ্রস্তুত হেসে নীলা বলে, একা লাগছিল খুব। ভাবলাম তোমার বাড়ি বেড়াতে যাই।
ক্যাথারিন দরজা ধরে দাঁড়িয়ে, অবাক, বলে, কিন্তু তোমার তো আসার কথা ছিল না।
না ছিল না।
কোনও জরুরি দরকার আছে আমার কাছে?
না তা নেই।
তবে?
নীলা লজ্জায় চোখ নামিয়ে বলে, আসলে পের লাসেজের কবরগুলো দেখার ইচ্ছে ছিল তো…।
ও তাই বুঝি, ক্যাথারিন শুকনো মুখে বলে, তা কবরখানা তো একেবারে কাছে। নেমে হাতের বাঁদিকে সোজা চলে যাবে। তারপর একটু ডানে ঘুরতেই দেখবে বড় দরজা।
শুনে, যত দ্রুত সম্ভব হয় নীলা সরে যায় ক্যাথারিনের দরজা আগলে দাঁড়িয়ে থাকা থেকে, ওর শুকনো মুখ থেকে, ওর কপালে ওঠা দুচোখ থেকে। নীলা যেতে যেতে পেছনে শোনে দরজা বন্ধ হবার খটাস শব্দ। নীলার জীবনে এরকম ঘটনা কখনও ঘটেনি। কলকাতায় বিকেলবেলা সে বন্ধুদের বাড়ি বেড়াতে চলে যেত, কোনও জরুরি কাজে নয়, আগে থেকে বলে রাখা নয়, এমনি। নীলার বাড়িতেও যে কেউ ওভাবেই আসে। অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথির মুখোমুখি নীলাকে হতে হয়েছে, তার পরও তো ঘরে এনে বসিয়েছে, চা বিস্কুট দিয়েছে, খেতে খেতে গল্প করেছে। শত্রুও যদি বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে, তাকেও ফেরাতে হয় না, এরকমই নিয়ম বলে জানে নীলা। মলিনা প্রবাদ আওড়ান প্রায়ই, শত্রুকে সবসময় বড় পিড়িটা দিতে হয় বসতে।
বড় বড় পায়ে সিঁড়ি নেমে যায় নীলা, পেছনের খটাস শব্দ পেছনেই পড়ে থাকে না, এটি নীলার সঙ্গে সঙ্গে যায়। গার দ্য অস্তারলিজ অব্দি যায়।
পরদিন নীলাকে অবাক করে ক্যাথারিন সেই বাক্সবন্দির কারখানায় আকৰ্ণবিস্তৃত হাসি উপহার দিয়ে জিজ্ঞেস করে, পের ল্যাসেজেয় গিয়েছিলে?
নীলা বলে, গিয়েছিল।
কার কার কবর দেখলে, টিম মরিসনের কবর দেখলে তো? অস্কার ওয়াইল্ডের? বালজাক, শঁপা, এডিথ পিয়াফ, খুব মলিন একটি কবর পল এলুয়ারের, দেখেছ?
সেই পল এলুয়ার যে লিখেছিল, ইল প্ল দ মা কর, কম ইল প্ল দ্য লা ভিল?
সেই পল এলুয়ার যে লিখেছিল জা ক্রি ত নম, লিবার্তে।
ক্যাথারিনকে দেখে একেবারে মনে হয় না, সে আদৌ মনে করছে গতকাল তার ব্যবহার মোটে অসুন্দর ছিল। ও নিয়ে একটি শব্দ সে উচ্চারণ করল না, বলল না, অন্তত এরকম যে কাল আমার ব্যস্ততা ছিল, বা আমার কোথাও যাবার ছিল। যেন ব্যাপারটিই খুব স্বাভাবিক যে, আমার বাড়ি যাবার তোমার কথা ছিল না, তুমি যাবে কেন, আমি যেদিন বলব, সেদিন যাবে।
ক্যাথারিনের অশালীন ব্যবহারে ক্যাথারিনের লজ্জা হয় না, লজ্জা হয় নীলার।
লজ্জায় নীলা ক্যাথারিনের চোখের দিকে তাকায় না। লজ্জায় সে বলে না, তোমার ব্যবহারে কাল আমি খুব কষ্ট পেয়েছি, পের লাসেজ দেখার কোনও ইচ্ছে আমার ছিল না, ও আমি আগেই দেখেছি, বরং হেসে, যেন গতকাল বলে কোনও কাল আসলে আসেনি, যেন ক্যাথারিনের বাড়ির দরজায় নীলা আচমকা উপস্থিত হয়নি, ক্যাথারিন তাকে তাড়িয়ে দেয়নি, দুজনের শেষ স্মৃতি কিষানলালের বাড়িতে যে আমোদটুকু হয়েছিল ওটুকুই।
বোদেলেয়ারের কবরটা কোথায়, পের লাসেজে? কিছুই ঘটেনি স্বরে নীলা বলে।
সে দেখতে তোমাকে যেতে হবে মোপারনাস কবরখানায়। কিছুই ঘটেনি স্বর ক্যাথারিনেরও।
ও আচ্ছা, ধন্যবাদ। নীলা মনে করে ধন্যবাদ বলে।
নীলা ধন্যবাদ বলে না, ব্যবহার জানে না, কথা বললে নীলা অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে, দেয়াল বা চেয়ার টেবিলের দিকে, যে বলছে তার মুখের দিকে বা চোখের দিকে তাকায় না। নীলা মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। এসব কথা কারখানার লোকের মুখে মুখে কানে কানে ঘোরে, নীলা টের পায়।
নীলা ধন্যবাদ বললে ক্যাথারিনের মুখে চমৎকার একটি হাসি ফোটে। এরকম হাসি ফুটেছিল প্রথম যেদিন ক্যাথারিন তাকে বিস্ত্রো রোমায় নিয়ে গিয়েছিল খেতে। দুজন মুখোমুখি বসে এন্ত্রোকত খেল, পান করার জন্য লাল ওয়াইন থাকতে হয়, ছিল। খাওয়া শেষ হলে রেস্তোরাঁর লোক লাদেসিঁয়ো রেখে গেল, একশো বিরানব্বই ফ্রাঁ। ক্যাথারিন পঁচানব্বই ফ্রাঁ টেবিলে রেখে বলেছিল, আমার ভাগেরটা, এন্ত্রোকত আর কফি।
ঠিক বুঝিনি, তোমার ভাগেরটা মানে?
আমি তো তাই খেলাম। তোমার দিতে হবে সাতানব্বই, এন্ত্রোকত আর চা।
ক্যাথারিনের পঁচানব্বই ক্যাথারিনের দিকে ঠেলে দিয়ে দুশো ফ্রাঁর একটি নোট বের করে রেস্তোরাঁর লোকের হাতে দিয়ে নীলা বলেছিল, দুটোর দাম রাখুন।
ক্যাথারিনের ভুরুতে সংশয় কাঁপে, কী ব্যাপার দুটোর দাম দিচ্ছ যে!
ওর ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে নীলার নিজেকে এক দাগি আসামির মতো মনে হল, যেন গুরুতর এক অন্যায় কাজ সে করতে যাচ্ছে, আর এ কাজের পেছনে তার বদ উদ্দেশ্য আছে।
