বড় মন খারাপ করা ব্যাপার আছে।
এ তো খুশির দিন। খুশিতে ময়ূরের মতো নাচছে মেয়েরা।
দানিয়েল ভুরু কোঁচকায়, তা হলে মেঘলা কেন? ঝকঝকে রোদ দাও। মেঘলা দিন তো মন খারাপ করা দিন।
ছবিটির দিকে নেশাগ্রস্তের মতো তাকিয়ে নীলা বলে যায়, মেঘ দেখলে ময়ূর যেমন আকাশে পেখম মেলে নাচে, মেয়েরা তেমন নাচছে। খরায় পোড়া শরীর তাদের। অনেকদিন পর আকাশে মেঘ জমেছে, বৃষ্টি হবে। মেয়েরা খুশিতে ছুটে এসেছে বন্ধ ঘরের বাইরে, বাইরের ঝিরঝিরে হাওয়ায়। বৃষ্টিতে ভিজবে, গা শীতল হবে এদের, গায়ের ধুলোকালি দূর হবে।
.
ছবি আঁকার নেশায় নীলা বাক্সবন্দির কাজে অনিয়ম করতে লাগল।
দানিয়েল ও চাকরি ছেড়ে, যে প্রকাশনী তাকে চিঠি লিখেছিল যে তার বই ছাপা যেতে পারে, সেখানেই একটি চাকরি জুটিয়ে নিয়েছে, বই পড়ার চাকরি। বই পড়ে মন্তব্য করার।
অভাবের মুখে নীলা একদিন সুটকেসে তার অলংকার খুঁজল, ইচ্ছে, বিক্রি করে দেবে। অলংকার নেই, কিষানলালের বাড়ি থেকে সব এনেছে, অলংকার আনতেই কেবল ভুলেছে।
দানিয়েল বলেছে শুনে, এত উদাসীন হলে চলে না নীলা। টাকা পয়সা, আমি দেখেছি, হাতে থাকলে বেহিসেবি খরচা করো। তারপর ফুরিয়ে গেলে অন্যের কাঁধে চড়ো।
তোমার কাঁধ থেকে নামাতে চাইছ আমাকে? দাও নামিয়ে?
আমি চাইছি না। যে চাকরি আছে, তাই করতে থাকো আপাতত।
এসব ছোট চাকরি আমার ভাল লাগে না।
কার ভাল লাগে! কিন্তু থাকা খাওয়ার খরচা আছে না! সে তো জোগাতেই হবে। ছোট চাকরি ভাল লাগে না, তো বড় চাকরি খোঁজো, খুঁজতে তো হবে।
নীলা এক সকালে বড় চাকরি এবং ভাল চাকরি খুঁজতে বেরোল, চাকরি খোঁজা বলতে পত্রিকা কিনে বিজ্ঞাপন দেখো, দু একটা ফোন নম্বর টোকো। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে পত্রিকা কেনা হয় নীলার, বিজ্ঞাপন দেখা হয় না, ফোন নম্বরও টোকা হয় না। সে হারিয়ে যায় বিশাল এক স্রোতে। একটি আনন্দস্রোত যাচ্ছে প্যারিসের রাস্তায়। লাল নীল বেলুন উড়ছে। আর সেই স্রোত নীলাকে নিতে নিতে জনদার্ক অব্দি নেয়। নীলা কলকাতায় অনেক মিছিল দেখেছে, এমন চমৎকার কোনও মিছিল দেখেনি। অভিভূত মুগ্ধ মোহিত নীলা আর সবার মতো জনদার্কের মূর্তির সামনে মাথা নোয়ায়, পায়ে ফুল দেয়।
.
বাড়ি ফিরে যখন সে দানিয়েলকে তার এই চমৎকার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে, দানিয়েল চমকে তাকায়, সব্বনাশ করেছ।
সব্বনাশের কী হল?
বেঁচে যে ফিরেছ এই বেশি।
নীলা বোকা বনে যায়। তাকে আরও বোকা করে দিয়ে দানিয়েল বলে, এরা বর্ণবাদী লিপেনের দল। এরা এ দেশ থেকে যত অসাদা আছে, এদের তাড়াতে চায়। জনদার্ক হচ্ছে এদের দেবী। আর তুমি কিনা এই চরম ডানপন্থীর সঙ্গে মিছিল করেছ?
মিছিলে লোকদের পাশাপাশি হেঁটেছে নীলা। কই তাকে তো কেউ কিছু আঘাত করেনি, কিছু বলেনি।
পাশাপাশি হেঁটে নীলা জনদার্কে ফুল দিয়েছে, ওদের কেউ তো বিষচোখে নীলার দিকে তাকায়নি।
.
ফরাসি গৌরব, ফরাসি সংস্কৃতি রক্ষা করতে লিপেন রাজনীতিতে নেমেছে। ফরাসি ছাড়া, সাদা ছাড়া অন্য কোনও জাতি, অন্য কোনও রং এ দেশে আসুক বা থাকুক লিপেন চায় না। লিপেনের ভয়, কালোয় ছেয়ে যাবে এ দেশ, সাদার হাত থেকে সাদার দেশ চলে যাবে কালোর হাতে, সাদাদের বংশবৃদ্ধি হচ্ছে না, সাদা মেয়েরা বিয়ে না করার, সন্তান জন্ম না দেবার স্বাধীনতা পেয়ে গেছে, কিন্তু ওদিকে কালো মেয়েরা বছর বছর জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। কালোরা গ্রাস করে ফেলবে এ দেশ, সাদা সংস্কৃতি বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। সাদা ফুরোতে ফুরোতে একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তাই এ দেশ থেকে যত অসাদা আছে সময় থাকতে তাড়িয়ে দেশটির পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে, সার দিয়ে সাদার উৎপাদন বাড়াতে হবে, উঁচু জাতের মানুষ তৈরি করতে হবে। লিপেনের আবেগকে নীলা যুক্তি দিয়ে দেখে। আজ যদি, নীলা ভাবে, ভারত ভরে যেত আফ্রিকার জঙ্গল থেকে আসা লোকে, লুটপাট চালাত, ভারতীয়দের সব সুবিধেয় ভাগ বসাত, ভারতীয়দের করের টাকায় বসে খেত, আর নিজেদের অসভ্যতায় সংক্রামিত করতে শুরু করত সমাজ, তবে নীলা বেশ জানে, ভারতেও এমন বিদেশি তাড়াও আন্দোলন হত। যেভাবে ইংরেজ তাড়াতে হয়েছে, দেশের স্বার্থে, সংস্কৃতির স্বার্থে এদেরও তাড়াতে হত। হত না কি? হত। ঔপনিবেশিক শক্তি ছাড়াও তো অন্য কোনও শক্তি হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। পারে না কি? নিশ্চয়ই পারে।
দানিয়েল বলে, হিটলারের জন্যও সম্ভবত তোমার এক ধরনের মমতা আছে।
আছে, নীলা হেসে বলে, তার কাকা সিদ্ধার্থর আছে, কেবল সিদ্ধার্থ নয়, ভারতের অনেক লোকেরই আছে। তারা বলে, অমন মহাশক্তিমান কারও শৌর্যে বীর্যে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না।
দানিয়েল দম বন্ধ করে শোনে নীলার যুক্তি।
আবার নীলার বাবার যুক্তি অন্য, অনির্বাণ বিশ্বাস করেন শত্রুর শত্রু হল বন্ধু। হিটলার সুভাষ বসুকে সমর্থন জুগিয়েছেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করতে। সুভাষ বসু বাঙালির গর্ব, কেবল বাঙালির নয়, পুরো ভারতবর্ষের গর্ব, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যে মানুষ প্রাণপণ লড়েছেন। যে মানুষ কোনও আপসের মধ্যে ছিলেন না। গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনে যাঁর বিশ্বাস ছিল না, যিনি শত্রুর বন্দুকের সামনে খালি হাতে দাঁড়াতে রাজি হননি। গুলির বিনিময়ে গুলি। তাই তো হয়। তা না হলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে মিত্রশক্তি তো গান্ধীর আদর্শ মানত। তারা তো গুলির বিনিময়ে গুলিই করেছে। পশ্চিমের এই গান্ধীপ্রীতি অনির্বাণকে হাসায়। গান্ধী কিন্তু তাঁর কাহাকেও মারিব না, কেবল মার খাইব নীতি দিয়ে ইংরেজ তাড়াননি, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইংরেজের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙেছিল বলেই ভারতের পাট গুটিয়ে নিয়েছিল।
