মিউজে দর্সেতে পুরো দিন কাটিয়ে বাড়ি ফেরার পথে দানিয়েল টাকা ধার দেয়, নীলা ইজেল কেনে, রং তুলি কেনে। নীলা ওড়ে, হঠাৎই ওড়ে, প্যারিসে স্বপ্নের ঘোরে।
নীলা তখনও ঘোরে, আর তার নিখুঁত শরীর জুড়ে দানিয়েলের তৃষ্ণার্ত আঙুল আর জিভ খেলা করে। আঙুলগুলো শরীরের সব আনাচ কানাচ চেনে। কোথায় কোন ঠোঁট, সেই ঠোঁটের আড়ালে আরেক ঠোঁট, আর সেই ঠোঁটের গায়ে ভ্রমর ঘুমোয়, জাদুর ভ্রমর, ভ্রমর ছুঁলেই ফোয়ারায় জল ওঠে, সেই জলে ভেসে যায় সব। সব।
নীলা সাঁতার জানে না। তুখোড় সাঁতারু দানিয়েলকে আঁকড়ে ধরে সে উতল নদী পার হয়।
দানিয়েল পাড়ে উঠে নীলার কানে কানে বলে, আমার জাদুর ভ্রমরকে জাগিয়ে দাও।
নীলা জাগায় না, ভ্রমরে বড় ভয় নীলার। ঘেন্না নীলার।
.
নীলার খুব জানতে ইচ্ছে করে দানিয়েল কবে নিজেকে বুঝল যে সে সমকামী। দানিয়েল বলে যখন সে ইস্কুলে পড়ত, বারো বছর বয়স, ইস্কুলের এক মেয়েমাস্টারের প্রেমে পড়েছিল প্রথম। ক্লাসে বসে হাঁ করে মাস্টারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত।
তারপর?
জোসেলিনের স্বামী ছিল, তিনটে বাচ্চা ছিল। ইস্কুলের পর প্রতিদিনই দানিয়েল চলে যেত জোসেলিনের বাড়ি। পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকত আর জানালা দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখত জোসেলিনকে।
তারপর?
একদিন জোসেলিন টের পেল জানালায় দুটো ব্যাকুল চোখ। সেদিন বাড়িতে সে ছাড়া আর কেউ ছিল না। দানিয়েলকে ভেতরে ডেকে আনে জোসেলিন। সারা গা তার কাঁপে যখন জোসেলিন তাকে স্পর্শ করে। সারা গা কাঁপে যখন জোসেলিন তাকে চুমু খায়। সারা গা কাঁপে যখন জোসেলিন তার গায়ের জামা খুলে দেয়, নিজেরটিও খোলে।
তারপর? তারপর কী ঘটেছে দানিয়েলের মনে নেই। কেবল মনে আছে অসম্ভব এক আনন্দে সে জোসেলিনের বিছানায় গড়াগড়ি খেয়েছে। হাত পা ছুঁড়েছে আনন্দে।
ইস্কুল ছাড়ার পর জোসেলিনের সঙ্গে সম্পর্কটিও যায়। চৌদ্দ বছর বয়সে দানিয়েল বাড়ি ছেড়ে এক কমিউনে থাকতে শুরু করে। কমিউনে ছিল পাঁচটি মেয়ে আর দুটি ছেলে। সম্মিলিত সংসার যাকে বলে। পাঁচটির মধ্যে দুটি মেয়ের সঙ্গে তার যৌনসম্পর্ক ছিল। কমিউনে থাকাকালীনই দানিয়েল সমকামীদের বারে যেত, মদ খেতে খেতে যার সঙ্গে চোখাচোখি হত, ইঙ্গিত হত, তার সঙ্গে চলে যেত তার বাড়িতে অথবা নিয়ে আসত তাকে কমিউনে। রাত শেষ, সম্পর্ক শেষ। সকালে আবার যে যার জীবনে। পরদিন দেখা হলে, এমনও হত যে সে মনে করতে পারত না যে গতরাতে এর সঙ্গে রাত কাটিয়েছে।
তারপর?
পিয়ের লরু মারা গেল। দুমাস পর ক্লারা, দানিয়েলের মা। বাপ মায়ের টাকা দু ভাই বোনে ভাগ হল, নিজের ভাগের টাকায় সে বাড়ি কিনল মন্ট্রিয়ালে। একা জীবন। পরিবারের কারও সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক থাকেনি। নিজের দাদা ফিলিপের সঙ্গেও না।
তারপর?
তারপর প্রেম হল গোটা চারেক। একসঙ্গে থাকাও হল, ছাড়াছাড়ি হল। আবার প্রেম হল, আবার থাকা হল। আবার ছাড়াছাড়ি। আর প্রেমিকার যখন অভাব, তখন বার থেকে রাতের সঙ্গী তুলে আনা। এভাবেই জীবন চলছিল দানিয়েলের। ব্যক্তিগত জীবন। আর বাইরের জীবনে ছিল ছোট চাকরি ছোট বেতন, কিন্তু অন্য উত্তেজনা, আন্দোলনের উত্তেজনা। সমকামীদের অধিকার আন্দোলনে নানা সভা সমিতি করে বেড়াত। মিছিলে গলা ফাটাত।
তারপর?
তারপর নিকল। ও কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিল মেয়েদের সামাজিক ইতিহাস সম্পর্কে বক্তৃতা করতে। কদিন ছিল। আর ও কদিনের মধ্যে দানিয়েলের সঙ্গে সখ্য, সঙ্গম সবই হয়। নিকল প্যারিসে চলে আসার পর দানিয়েলের মন পড়ে থাকে নিকলে। বুঝল এ কেবল যৌন সম্পর্ক নয়, এ প্রেম। সেই প্রেমেরই আকর্ষণে প্যারিস আসা। নিকলের বাড়িতেই ছিল পুরো চার বছর। চার বছরে প্রেমও গেছে, যৌনসম্পর্কও গেছে। কিন্তু বন্ধুত্ব রয়ে গেছে।
গুলোয়াজের কড়া ধোঁয়া ছড়িয়ে দানিয়েল আরেকটি সিগারেট ধরায়। বলে, তোমার কি কখনও এমন হয়েছে, স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়া কোনও ঘটনা, ধরো কুড়ি বছর আগে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনা, আচমকা একদিন মনে পড়ে?
নীলা মাথা নাড়ে, এরকম হয়নি তার।
আমার যখন ছবছর বয়স, আমার বাবা আমাকে ধর্ষণ করেছিল। ঘটনাটি, এই আট বছর আগে, মন্ট্রিয়ালে, একা বসে আছি ঘরে, বরফের ঝড় হচ্ছে, দেখছি, আলটপকা মনে পড়ল।
নীলা চকিতে উঠে বসে। চোখের মণিতে, চোখের পাতায় অবিশ্বাস।
আসলেই ঘটেছিল না কি অন্য কারও গল্প শুনে তোমার মনে হয়েছে, এ তোমার নিজের জীবনে ঘটেছে। নীলা দানিয়েলের কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে।
আসলেই ঘটেছিল। আমার স্পষ্ট মনে পড়েছে, মা গেছে বাইরে কাজে, একা বাড়িতে আমি, কুকুরকে নিয়ে খেলছি, বাবা আমাকে কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর ধর্ষণ করল। আমার মুখের ভেতর তার পরনের শার্ট গুঁজে দিয়ে আমার চিৎকার বন্ধ করেছিল।
তোমার আপন বাবা?
আমার আপন বাবা।
.
প্যারিসে স্বপ্নের ঘোরে নীলা ঠিকই একদিন ছবি আঁকতে শুরু করল। তেলরঙে। এক দল মেয়ে সবুজ মাঠে নাচছে, আকাশ জুড়ে মেঘ। পশ্চিমে কালো মেঘ।
দানিয়েল ছবিটিকে বসে দাঁড়িয়ে শুয়ে ডানে হেলে বাঁয়ে হেলে দেখে বলল, বড় মাতিসের প্রভাব।
মোটেই না, মাতিস কাগজ কেটে সেঁটেছেন, আর এ আঁকা। আর এরা হাতে হাত ধরেও নাচছে না।
