দানিয়েল পুরনো কাপড়ের স্তূপ খুঁজে দুটো জামা কেনে আর নীলা অবাক তাকিয়ে এই বিচিত্র জগৎ দেখে। কালো চশমায় ঢাকা মুখের কিছু লোক, সেতুর তলায় দাঁড়িয়ে আছে, পায়ের কাছে কালো ব্যাগ তাদের, ব্যাগের ভেতর জিনিসপত্র, পুলিশ আসছে, এরকম একটি রব শুনে ব্যাগ গুটিয়ে মুহূর্তে সব সরে গেল সেতুর তল থেকে। নীলা জিজ্ঞেস করে দানিয়েলকে, এসব কী হচ্ছে ওখানে?
অবৈধ ব্যাবসা।
নীলা বুঝে পায় না এই চমৎকার সাজানো গোছানো সব ভালর শহরে অবৈধ ব্যবসা করে কেন লোকেরা। তার উৎসুক চোখ ভিড়ের দিকে যায়। ভিড় ঠেলে খেলা দেখানো লোকটির দিকে, কালো মাথার লোকটি ম্যাচবাক্সের মতো ছোট্ট দুটো বাক্সে ছোট্ট একটি বল নাড়ছে, খুব দ্রুত নাড়ছে, নাড়তে নাড়তে বাক্সে বলটি ঢেকে ফেলল, এবার বলতে হবে কোন বাক্সের নীচে বলটি। বাজি খেলা। একশো ফ্রাঁ হাতে দাও কালো মাথার, উত্তর সঠিক হলে একশো ফ্রাঁ সে দিয়ে দেবে, সঙ্গে আরও একশো ফ্রাঁ, দুশো। আর উত্তর বেঠিক হলে কালো মাথা সেই একশো ফ্রাঁ নিয়ে নেবে। দাঁড়িয়ে থাকতেই দুটো বাজি হয়ে গেল, দুজন পেল একশো ফ্রাঁ করে, একজন হারল। কালো বল যখন নড়ছে, নীলা স্পষ্ট দেখতে পেল বলটি কোন বাক্সের নীচে কালো মাথা ঢুকিয়েছে, নীলা চেঁচিয়ে ওঠে, ওই বাক্সে বল, আমি জানি। ঠিক আছে বাজি ধরো। দানিয়েল বলল, বাজি ধোরো না নীলা, হারবে।
হারব কেন, আমি দেখেছি কোথায় বল। জিতবই।
নীলা একশো ফ্রাঁ দিল কালো মাথাকে, লোকটি বাক্স ওঠাল, বাক্সের তলে কালো বল নেই। কালো বল অন্য বাক্সের তলে। আবার সে বাজি ধরল, আবার হারল। আবার ধরল, আবার হারল। দু মিনিটে চারশো ফ্রাঁ ফুরিয়ে নীলা যখন ভিড়ের বাইরে এল, দানিয়েল একটি দোকানের দেয়ালে হেলান দিয়ে সিগারেট খাচ্ছে।
বলল, হেরেছ, ঠিক না?
করুণ চোখে তাকাল নীলা।
আমি জানতাম।
কী করে?
কারণ এরা সব ভণ্ড। লোক ঠকানোর ব্যবসা করে এরা। অবৈধ ব্যবসা।
হঠাৎ বাজিখেলার ভিড় থেকে কিছু লোক চোখের নিমেষে হাওয়া হয়ে গেল। ভিড় ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল।
দানিয়েল বলল, দেখো, পুলিশের ভয়ে কেমন পালিয়ে গেল।
তা ঠিক, পালিয়েছে। ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর মধ্যে কালো মাথার সঙ্গী ব্যবসায়ীরা ছিল, যখন কেউ জেতে, ওরা জেতে। যখন কেউ হেরে যায়, হারে নীলার মতো মানুষ, লোভী তো বটেই, বোকাও, যারা জানে না, প্রতারক তার জাল কী করে ছড়িয়ে বসে।
নীলা দেখে, বাদামি আর কালো রঙের লোকেরা লোক ঠকাচ্ছে, পুলিশের ভয়ে দৌড়াচ্ছে, দোকানের জিনিস চুরি করছে।
কোন দেশের লোক এরা? নীলা নাক কুঁচকোয়।
আফ্রিকার। এশিয়ার। দক্ষিণ আমেরিকার।
ভারতের কেউ আছে বলে আমার মনে হল না। নীলা বলে।
বেশির ভাগই মধ্যপ্রাচ্যের।
তাই হবে।
.
তাই হবে।
নীলা স্বস্তি পায়। স্বস্তি পায় বলে মনে করে, আসলে পায় না। নীলা জানে, বেশ ভাল করেই জানে যে ভারতে প্রতারকের অভাব নেই, রাস্তাঘাটে, আপিসে আদালতে, এমনকী সংসদেও বসে লোকেরা লোক ঠকাচ্ছে।
রোববার, প্যারিসের নানা ফুটপাত ভরে ওঠে বাজারে। মাছ মাংস থেকে শুরু করে কাপড় চোপড়, থাল বাসন, এমনকী খাট পালঙ্ক। চারশো ফ্রাঁ গচ্চা দেওয়ার পর, ও এলাকা যত শিগরি সম্ভব ত্যাগ করে দুজন।
মোঁপারনাসের এক গলিতে, দানিয়েলের ইচ্ছে, ছবি বিক্রি করতে লোক বসে প্রতি রোববার, দেখবে। রাস্তার দুপাশে ছোট ছোট তাঁবু ফেলে নিজের আঁকা ছবি নিয়ে বসে আছে তত বেশি না বিক্রি হওয়া চিত্রকরেরা। ছবি দেখতে দেখতে নীলা অতীতে ফেরে, সেও শখের ছবি আঁকত এককালে।
দানিয়েল নীলার উদাস চোখে তাকিয়ে সস্নেহে বলে, আবার রং তুলি হাতে নাও।
ধুৎ। খামোকা।
চেষ্টা তো করো। প্যারিসে কি শ্রমিকের জীবন কাটাতে এসেছ? এ ছবির শহর তোমাকে যদি শিল্পী না করে তবে পৃথিবীর আর কোন শহর করবে?
শিল্পী হবার কোনও গুণ আমার নেই দানিয়েল।
কী করে জানো যে নেই?
জানি।
কার যে গুণ আছে, কার যে নেই, নীলা। কার ভেতরে কোন সম্পদ লুকিয়ে আছে, তার আমরা কতটুকু জানি। ভ্যানগগের ছবি আজকাল কোটি ফ্রাঁয়ে বিক্রি হয়, বেঁচে থাকতে তার ছবি কেউ কেনেনি। অভাবে অসুখে লোকটা আত্মহত্যা করেছে।
মিউজি দর্সের দিকে হাঁটতে হাঁটতে দানিয়েল নিজের জীবনের কথা বলে। মন্ট্রিয়ালে সে আইন পড়তে শুরু করেছিল, ফেলে ঘোড়ার পেছনে দৌড়োল। ঘোড়া চালাত, আর অবসরে লোকদের ঘোড়া চালানো শেখাত। সেও একসময় আর ভাল লাগেনি। সব ছেড়ে, প্যারিস চলে এল, প্যারিসে এসে লেভাই কাপড়ের কারখানায় প্রথম চাকরি নিয়েছিল, তারপর লেভাই যখন এ দেশের শ্রমিকদের তত বেশি শোষণ করতে পারে না বলে চলে গেল গরিব দেশে গরিবদের শোষণ করতে, দানিয়েল ফুটপাতে পা ছড়িয়ে বসে প্যারিসের আশ্চর্য রূপ দেখত প্রতিদিন আর শহরে ঘুরে পুরনো বইয়ের দোকান থেকে সস্তায় বই কিনে মাঠে রোদের তলে শুয়ে শুয়ে পড়ত। বই পড়তে পড়তেই তার লেখার ইচ্ছে হয়। লিখতে লিখতেই এখন লেখা ছাপা হয়। আর ছাপা যেহেতু হয়, দানিয়েল একটি বইও লিখে ফেলেছে। বইটি তার বাবাকে নিয়ে। বাবা পিয়ের লরু। পাণ্ডুলিপি কিছু প্রকাশকের কাছে ডাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। একজন প্রকাশকের উত্তর এসেছে, লিখেছে এদিক ওদিক খানিকটা বদলালে বইটি ছাপা যায়।
