কেন আমাকে দেখে বোঝোনি?
নাহ।
ধাঁধা কাটে না নীলার। চোখের সামনে ঘরটি পাক দিয়ে ঘুরতে থাকে, ঘরটি শূন্যে ভাসে, ঘরটি ওড়ে। বিছানায় ফিরে এলে, দানিয়েলের আগ্রাসী জিভ নীলাকে লেহন করে বাকি রাত। নীলা বাকরুদ্ধ শ্বাসরুদ্ধ পড়ে থাকে বিছানায়।
এক লজ্জায় শত লজ্জা ঢাকে নীলা।
.
প্যারিসে স্বপ্নের ঘোরে
নীলার বিশ্বাস হয় না এ জীবন সে যাপন করছে। যেন স্বপ্নের ভেতর ঘটে যাচ্ছে এক এক করে ঘটনাগুলো। স্বপ্ন ভাঙলেই সে দেখবে কলকাতায় সে তার নিজের ঘরে, সেই বিছানায়, জানালায় বসে ভোরের আলো খুঁটে খাচ্ছে দুটো চড়ুই, চড়ুই দুটোর সঙ্গে তার মনে মনে কথা হবে। সুশান্তর সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হবার পর নীলা নিদ্রাহীন রাত পার করত, আর দিনের বেলা ঝিমোত, কখনও আবার পুরো দিন জুড়ে ঘুমোত, অদ্ভুত অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে জেগে উঠত। একবার দেখল, কোনও এক জঙ্গলে হাঁটছে সে, আর তার দিকে দৌড়ে আসছে একটি সিংহ, দৌড়োচ্ছ সে, হঠাৎ পেছন ফিরে দেখে যে সিংহ নয়, একশো সাপ আসছে ধেয়ে, দৌড়াতে দৌড়োতে বিশাল এক সমুদ্রের মধ্যে পড়ে নীলা, একেবারে তলে গিয়ে দেখে সেই সিংহটি বসে আছে। নীলাকে কিছু বলল না, খেতে এল না। সিংহের পেছনে একটি গাছ, সেই গাছের ওপর একটি বাড়ি। বাড়িতে ঢুকে দেখে মলিনা ঘুমোচ্ছেন। মলিনার ঘরের বন্ধ জানালা খুলে দিতেই সামনে রোদে ফাটা চৌরঙ্গির ব্যস্ত রাস্তা। সেই রাস্তায় ত্রস্ত পায়ে নেমে দেখে রাস্তার ওপর একশো সাপ ফণা তুলে আছে। মুহূর্তে কোনও আর মানুষ নেই সে রাস্তায়। কেবল সাপ, আর একা নীলা। নীলা সে দিন ঘুম থেকে জেগে লক্ষ করে তার সারা গা ঘামে ভিজে গেছে, আর বুকের ভেতর ধুকপুক। জেগে ওঠার দু এক মুহূর্ত অব্দি ভয়ে সে নীল হয়েই ছিল। স্বপ্নটির কথা যখনই পরে তার মনে হয়েছে, বুক ধুকপুক করেছে।
রোববার সকালে ঘুম থেকে জেগে নীলা দেখে গায়ে কোনও জামা নেই, দানিয়েল দাঁত মাজছে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে। শুয়ে শুয়ে দানিয়েলের শরীরটি দেখে মনে হয় তার, রোদ্যাঁর জীবন্ত ভাস্কর্য। এরকম শরীর হাতের কাছে পেলে যে কোনও পুরুষই উতলা হবে। কিন্তু দানিয়েল কোনও পুরুষের হাতে তার শরীর কোনওদিন দেয়নি, দেবেও না। পুরুষের শরীর, ও বলে, বড় কুৎসিত, ওকে মোটেও উত্তেজিত করে না। নারীর শরীর করে। নীলার শরীর করে। দানিয়েলের শরীরের দিকে তাকিয়ে নীলার মনে হয় না এই শরীরটিকে সে কাছে পেতে চায়, চুমু খেতে চায়। দাঁত মেজে যখন ও দাঁতন রাখে বেসিনের কিনারে, নীলা দেখে মাজনটি গোলাপি রঙের। তার মাজনের রং।
দানিয়েল, তোমারও একই রঙের মাজন? গোলাপি?
আমার মাজন নেই। দানিয়েলের সরল উত্তর।
তবে কী দিয়ে দাঁত মাজো তুমি?
মাজি না।
এটি কার মাজন তবে?
এটি তোমার।
নীলা উঠে বসে।
তুমি আমার মাজন ব্যবহার করেছ?
দানিয়েল কলের তলে মাথা ঢুকিয়ে মুখ হাঁ করে, সেই হাঁয়ের ওপর জল পড়ে।
মুখের জল ফেলে বলে, হ্যাঁ, তোমার মাজন। অসম্ভব নির্লিপ্ত স্বরে।
তুমি অন্যের মাজন দিয়ে দাঁত মেজেছ? জেনেই মেজেছ? নাকি ভুল করে?
জেনে। দানিয়েলের কণ্ঠ শান্ত। যেন এ খুবই স্বাভাবিক এক ঘটনা। বরং তার অবাক লাগে, নীলা এ নিয়ে এত প্রশ্ন করছে কেন!
জানো, দানিয়েল, আমার জীবনে এই প্রথম দেখলাম, অন্যের দাঁতন কেউ ব্যবহার করে।
বলে নীলা আবার ঢুকে যায় লেপের তলে, গা মাথা ঢেকে।
দানিয়েল কফির জল বসায় চুলোয়।
দানিয়েল যখন কফি বানিয়ে, গায়ে একটি টিশার্ট চড়িয়ে, চেয়ারে বসে কফি খাচ্ছে, নীলা লেপের তল থেকে মুখ বের করে বলে, তুমি কি কোনওদিন দাঁত মাজো না?
দানিয়েলের আবারও শান্ত গলা, মাজি হঠাৎ হঠাৎ। ইচ্ছে হলে।
শেষ কবে মেজেছিলে?
মনে নেই।
নীলার একবার ইচ্ছে হয়, হাসে। আরেকবার ইচ্ছে করে লেপের তলে ঢুকে সে অনেকক্ষণ কাঁদে। নিজের জন্য কাঁদে। নীলার হাসাও হয় না, কাঁদাও হয় না। দানিয়েল বাইরে গেল, লিবারেশন পত্রিকা আর চারটে কোয়াসাঁ কিনে ফিরল। নীলা তখনও শুয়ে। কফি আর কোয়াসাঁ খেতে পত্রিকা পড়ছে যখন দানিয়েল, নীলা বলল, চা খাব।
খাও।
দাও।
কেন দেব, করে নাও।
উঠতে ইচ্ছে করছে না যে! নীলা আহ্লাদি ঠোঁট ফোলায়।
নীলার আহ্লাদ বোঝার ক্ষমতা দানিয়েলের নেই। নীলাকে উঠতে হয়, চা বানাতে হয়, চা পান করতে করতে ছোট জানালার বাইরে যেটুকু আকাশ, সেটুকু দেখতে হয় আর চা শেষ করে বাইরে বেরিয়ে দুটো মাজন কিনে আনতে হয়, একটি দানিয়েলের জন্য, একটি নিজের, আর পুরনোটিকে ময়লার ঝুড়িতে ফেলে, নিজেরটি দিয়ে দাঁত মাজতে হয়, আর দানিয়েল যখন বলে, পোর্ত দ্য সিনেকোর্তে বড় বাজার বসে রোববারে, যাবে নাকি? সেটি শুনতে হয়, এবং বলতে হয়, সে যাবে।
দানিয়েল বলে, ও জায়গাটা তোমার ভাল লাগবে।
কেন?
ওখানে অনেক কালোলোক বাদামি লোক আছে।
সস্তা, দু নম্বর, পুরনো জিনিসপত্রের খোলা বাজারে এসে লক্ষ করে নীলা, নানা রঙের লোকদের এই ভিড় মোটেও তার ভাল লাগছে না বরং বিষম অস্বস্তি হচ্ছে। নীলার চোখের সামনে এক কালো ছেলে একটি ঘড়ির দোকান থেকে একটি ঘড়ি উঠিয়ে পকেটে ভরে নিয়ে সোজা চলে গেল হেঁটে। আরেকটি ছেলে একটি রোদচশমা নিয়ে চোখে পরে আয়নায় কেমন দেখাচ্ছে দেখে ওটি ফেরত না দিয়ে, দাম না দিয়ে দিব্যি চলে গেল।
