দানিয়েল উঠে বসল, কী হচ্ছে কী? একটা ভাল জায়গায় গেলে, কোথায় তোমার মন ভাল হবে, আর তুমি কিনা অনুযোগ করছ!
নীলা তেমন বিষণ্ণ গলায় বলে, আচ্ছা, তোমার কি ওই তথ্যচিত্রটা ভাল লেগেছে?
নিশ্চয়ই। তোমার লাগেনি?
নাহ্।
বাহ আরতের মতো এত ভাল একটা চ্যানেল ভারতের ওপর ছবি দেখাচ্ছে, এর মূল্য অনেক, সে জানো?
দানিয়েল, নীলা ধরা গলায় বলে, ভারতে ওরকম দারিদ্র্যই কেবল আছে তা নয়। প্রচুর ধনী লোক আছে ওখানে, প্রচুর মধ্যবিত্ত…
দানিয়েল সশব্দে হেসে উঠে বলল, আরতে টেলিভিশন কি ভারতের ধনীদের ছবি তুলতে যাবে! ধন দেখালে বিল গেইটসের ধন দেখাবে। আর দারিদ্র্য দেখানোই তো ভাল। ভারতের জন্য লাভ, আর্থিক সাহায্য পাবে।
দানিয়েল পিঠের পেছনে দুটো বালিশ রেখে আরাম করে বসে গুলোয়াজের গুঁড়ো পাতলা কাগজে পুরে সিগারেট বানিয়ে ধরাল। লম্বা একটি টান দিয়ে ধোঁয়া ছড়িয়ে ঘরে, নীলার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, এ তো তুমি অস্বীকার করতে পারো না যে ভারত একটি গরিব দেশ। এ কি তুমি অস্বীকার করতে পারো যে পরিবারটিকে দেখাল আজ, সেরকম পরিবার নেই ভারতে? আছে। নিশ্চয়ই আছে। পৃথিবীর কত কোথাও মানুষ এমন মানবেতর জীবন যাপন করছে নীলা! এদের জন্য কিছু করা দরকার সবার। বিশেষ করে এই ধনী দেশগুলোর। ভারতে ধনী আছে, ঠিক আছে। কিন্তু ধনীদের জীবনযাপন তো আমরা জানিই। বরং এসব দরিদ্রের জীবন দেখলে আমরা উঠে বসি, ভাবি। সবাই না, যারা ভাবার, তারা ভাবে। যাদের হৃদয় আছে, তারা। এ অনেকটা, জানো নীলা, চাবুকের মতো আমাদের পিঠে পড়ে।
নীলার কুণ্ঠিত কুঞ্চিত মন হঠাৎ ভিখিরির ভাঙা ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। দানিয়েলের হাতটি টেনে নিয়ে বলল, তুমি কী যে ভাল! তোমাকে যত দেখি, মুগ্ধ হই।
দানিয়েল নীলার হাতটি আঙুলে বুলোতে থাকে।
নীলার ভাল লাগে।
এই, এত কাপড় চোপড় পরে ঘুমোতে এসেছ যে, আরামে ঘুমোতে পারবে না।
পাশ ফিরে বলে নীলা, ন্যাংটো ঘুমোনোয় আমার অভ্যেস নেই।
গায়ে লেপ টেনে গুটিসুটি শুয়ে থাকে সে। দানিয়েলের আঙুল নীলার বাহু থেকে ঘাড়ে, ঘাড় থেকে চুলে পৌঁছে। মাথায় কোনও নরম আঙুল ঘুরে বেড়ালে, নীলার ঘুম নেমে আসে চোখে। মলিনা প্রায়ই চুলে বিলি কেটে দিতেন, নীলা ঘুমোত। এই মা-হীন দেশে, দানিয়েল অনেকটা মায়ের মতো। নীলার ঘুম ছুটে যায় যখন দানিয়েলের আঙুল ওর বুকের ওপর হেঁটে বেড়ায়।
ওর হাত সরিয়ে দিয়ে হেসে ওঠে, কাতুকুতু, না?
না। না স্বরটি বেশ গম্ভীর।
নীলা ঘাড় ফিরে তাকায় দানিয়েলের দিকে। বাদামি চোখদুটোয় কাতুকুতুর দুষ্টুমি নেই।
জানো, আমার মা এরকম চুলে হাত বুলিয়ে দিতেন, আমার কী যে ভাল লাগে কেউ এরকম দিলে।
তোমার ভাল লাগে? এই দেখো দিচ্ছি। কী সুন্দর কালো চুল তোমার। কী সুন্দর, তোমার গায়ের রং।
গায়ের রং সুন্দর হবে কেন! সাদা না তো! নীলা ভেংচি কাটে নিজেকে।
সাদা না বলেই তো সুন্দর।
তোমার বাদামি রং পছন্দ?
খুব। খুব।
দানিয়েল হাত বুলিয়ে দিতে থাকে নীলার চুলে, ওর দিকে ফিরে, ওকে জড়িয়ে শিশুর মতো শুয়ে থাকে নীলা। মলিনার বুকে মুখ লুকিয়ে নীলা এমন করে রাতের পর রাত ঘুমিয়েছে। নীলার অতীত হঠাৎ এই চিলেকোঠার খোলা জানালা দিয়ে এক ঝাঁক আলোর মতো ঢোকে।
কিন্তু আমার যে কোনও গুণ নেই দানিয়েল! নীলার ভাঙা স্বর।
কে বলল নেই। আমার সবচেয়ে ভাল লাগে তোমার সারল্য।
দানিয়েলের আঙুল নীলার চুল থেকে কপাল, কপাল থেকে নাক বেয়ে ঠোঁটে নামে।
তোমার ঠোঁট এত সুন্দর, বড় চুমু খেতে ইচ্ছে করে।
চুমু? ঠোঁটে?
নয় কেন?
উহুঁ।
উহুঁ মানে? চাও না?
নীলা মাথা নাড়ে। চায় না।
তোমার পা দুটো কী বিষম ঠাণ্ডা হয়ে আছে। দানিয়েল তার পা বাড়িয়ে নীলার দু পায় বুলোতে বুলোতে বলে।
দানিয়েলের আঙুল নীলার শরীর থেকে সরে না। দানিয়েলের পা নীলার পা থেকে সরে না।
নীলা আবার পাশ ফেরে। ঘুমকণ্ঠে বলে চলো ঘুমোই। অনেক রাত হয়েছে।
তাতে কী, কাল রোববার।
কাল কাজ নেই, সকালে ওঠার তাড়া নেই। তাই দানিয়েলের আঙুল ঘোরে নীলার শরীরে। আঙুল শরীরের অলি গলি ঘুরে উরুর ফাঁকে যায়। নীলা যতই উরু যুক্ত করে, দানিয়েল তা বিযুক্ত করে দেয়।
এবার সে এক লাফে বিছানা থেকে নেমে গিয়ে চেয়ারে বসে।
দানিয়েল এ কী করছ তুমি?
কেন! তুমি কি চাও না? দানিয়েলের কণ্ঠে বিস্ময়।
কী চাই না?
সঙ্গম।
মানে?
আমি তো জানি তুমি চাও।
কী করে জানো?
দানিয়েল বলে, কেন, তুমি আমার হাত ধরে রাস্তায় হাঁটোনি?
তো?
তুমি আমাকে পছন্দ করো, তাই বুঝেছি।
নীলা অবাক চোখে বলে, পছন্দ করি বলেই তো হাতে হাত ধরে হেঁটেছি। আর সঙ্গম… এসব কী বলছ, মেয়েতে মেয়েতে আবার ওসব হয় না কি?
দানিয়েল ঠোঁট চেপে হাসে, হয় না তোমাকে কে বলেছে?
আমি কখনও শুনিনি!
নীলা কেবল শোনেনি যে তা নয়, তার নিজের কল্পনাকে যতদূর বিস্তৃত করা যায় করে সে কোনও আবছা ছবিও খুঁজে পায় না, যা দেখে অন্তত অনুমান করবে যে মেয়েদের মধ্যে কোনও যৌনসম্পর্ক হয় বা হতে পারে।
দানিয়েল বলে, অবাক সেও, আমি যে সমকামী তা তুমি বোঝোনি?
কী করে বুঝবে নীলা দানিয়েল সমকামী। সমকামীরা দেখতে কেমন হয়। মানুষের মতোই তো। দানিয়েল দেখতে আর যে কোনও মেয়ের মতোই।
