নীলার ওই অস্থিরতা গুঁড়িয়ে দিয়ে নিকল গেলাস উঁচিয়ে ধরে, নীলার উদ্দেশ্যে। কী ঘটনা? আরতে টেলিভিশনে ভারতের ওপর এক্ষুনি একটি তথ্যচিত্র দেখানো হবে। ব্যাস চেয়ার ঘুরিয়ে বসল সবাই। নীলাকে ঠেলে দেওয়া হল সবার সামনে, পিয়ানোর পাশে, কুকুর বেড়াল সোফায়, ওদের চোখও তথ্যচিত্রে।
টেলিভিশনের পর্দা জুড়ে শুন্য একটি টিনের থালা, ফুটো থালা। ক্যামেরা পেছন দিকে সরছে, থালা ছোট হচ্ছে, পর্দা জুড়ে খালি পা, হাঁটছে। এবার ক্যামেরা আরও দূরে সরল, খালি পায়ে, খালি গায়ে, মাথায় রুক্ষ চুল, নাকে সর্দি ঝুলছে এক আট বছরের ছেলে হাঁটছে রাস্তায়। হাতের ফুটো থালা এগিয়ে ধরছে রাস্তার লোকের দিকে, ভিক্ষে চাইছে। কেবল একটি ভিখিরিই নয়, এক ভিখিরির পেছনে আরও ভিখিরি। আর রাস্তায় মানুষের গিজগিজ ভিড়, ভাঙা ট্রাম ঘটঘট শব্দ করে এগোচ্ছে, আধভাঙা বাস ট্রাক ভিড়ের মধ্যে গলা ঢুকিয়ে দিচ্ছে ভয়াবহ শব্দে ভোঁ বাজাতে বাজাতে, আর এর মধ্যে শীর্ণ কটি গোরু হাঁটছে, ভিড়ের রাস্তায় কিছু গোরু বসে জাবর কাটছে, কিছু গোরুরগাড়ি হেই হেই করতে করতে ছুটছে। ভিখিরিতে উপচে গেছে ফুটপাত। আর সেই ছেলেটিই ফুটো থালা হাতে ঘরে ফিরছে, ঘর বলতে একটি ভাঙা ঝুপড়ি। ঝুপড়িটি একটি জলাশয়ের ওপর, সরু বাঁশে হেঁটে তবে ঢুকতে হয় ঝুপড়িতে, শুকনো পাতায় বানানো ঝুপড়িতে। ভেতরে এক দঙ্গল ভাইবোনের কিচির মিচির। ভাইবোনগুলো ভাতের হাঁড়ির ওপর হামলে পড়ছে।
নীলা এক ঘর স্তব্ধতা ভেঙে বলল, নিশ্চয়ই খুব গরিব ঘরের কাহিনী দেখাচ্ছে।
শশশশশ। নীলাকে ঠোঁট যুক্ত করতে বলা হচ্ছে।
পর্দায় তখন ভাতের হাঁড়ি, শূন্য হাঁড়ি। সাঁকো পেরিয়ে মা যাচ্ছে কলসি ভরে জল আনতে নীচের জলাশয়টি থেকে। জল এনে চুলো ধরালো রেললাইনের ধারে। রেলগাড়ি যায়, আর চুলোর আগুন যায় নিভে। ধোঁয়ায় চোখ ঢাকতে ঢাকতে মা ভাত ফুটোচ্ছে। ক্যামেরায় আবার ভাতের হাঁড়ি। হাঁড়ির ওপর হামলে পড়ছে ছেলেমেয়েগুলো। মা ঠেলে সরাচ্ছে ওদের। এর পরের দৃশ্য, সেই ভিখিরি বালক বাইরে সাঁকোয় বসে খোলা আকাশের নীচে বসে মলত্যাগ করছে, নীচে বদ্ধ জলাশয়।
তথ্যচিত্র শেষ হতেই রিতা প্রথম মুখ খুলল, আহ, কী চমৎকার ক্যামেরার কাজ।
নীলা সোফার পাশ-টেবিল থেকে একটি ম্যাগাজিন টেনে ঝুঁকে রইল তার ওপর, যেন খুব মন দিয়ে সে পড়ছে ওটি। নীলা জানে,নীলা মুখ লুকোচ্ছে। কান খোলা, সে কানে ঢুকছে রিতার উচ্ছ্বাস।
মিশেলের কণ্ঠ, আরতের তথ্যচিত্রের মতো তথ্যচিত্র হয় না।
আর ক্যামেরা যখন জুম করল হাঁড়িতে, নেপথ্যসংগীতটা খেয়াল করেছ? এডিথ পিয়াফের ওই গানটার সুরটা না?
কোনটা, লা ভি লামোর…?
না না, দ লর বেইসের…
নীলার চোখ ভোগ ম্যাগাজিনের ছবিতে স্থির হয়ে থাকে। এক সুন্দরী দুচোখে থই থই কামনা নিয়ে সমুদ্রতীরে উলঙ্গ শুয়ে আছে, আর পায়ের কাছে বালুতে পড়ে আছে একটি সুগন্ধীর শিশি, অপিয়াম।
ম্যাগাজিন থেকে নীলা চোখ সরাল, অথবা মুখের সামনে থেকে ম্যাগাজিন সরাল যখন চেয়ার সরানোর শব্দ পেল কারও। ওঠার উদ্যোগ। ঠিক এটিই প্রাণপণ চাইছিল সে, উঠতে। প্রায় লাফিয়ে উঠে সবুজ জ্যাকেটখানা পরে নিল। দানিয়েল আবার অসভ্যতার দোষ না দেয়, মাথা নিচু, কিন্তু মুখে বলল, এ বিয়েনটট।
ও বললেই বিদায়ের পাট শেষ হবে, তা নয়। নিকল, মিশেল আর রিতার গালে তিন দুগুণে ছটি চুমু খেতে হল নীলাকে। মারিয়াকে খেতে হল না কারণ নীলা আর দানিয়েলকে সে গাড়িতে অনেকটা পথ পৌঁছে দেবে, পথে নেমে যাবে দুজন, মারিয়ার সঙ্গে তখন হবে চুমোচুমি।
দানিয়েলও তিনজনকে চুমু খেয়ে বলল, আবিয়াঁতো।
রিতা বলল, এ আমার সৌভাগ্য ভারতের ওপর তথ্যচিত্র দেখলাম একজন ভারতীয়কে সঙ্গে নিয়ে।
নীলা হাসল, হাসতে হয় বলে হাসল। তা না হলে অবিনয়ী অথবা ধৃষ্ট বলে তার দুর্নাম হবে।
মারিয়ার গাড়িতে নীলা পেছনে বসল, সামনে দানিয়েল। মারিয়া মন্দ্রগম্ভীর স্বরে বলল, সিটবেল্ট। সিটবেল্ট।
সুইডিশ কানুন। পেছনের অন্ধকারে হাতড়ে সিটবেল্ট পেল বটে নীলা, তা বাঁধার কোনও উপায় পেল না।
.
যখন ঘরে পৌঁছল, অনেক রাত। দানিয়েল জামা কাপড় খুলে সোজা বিছানায়।
নীলার ঘুম পাচ্ছে না। তবু সে শুয়ে রইল, জামা কাপড় না পালটেই।
দানিয়েল বলে, কী দীর্ঘশ্বাস ফেলছ যে! কী হয়েছে?
না কিছু না।
কথা বলছ না যে।
কী বলব, বলো!
কেন কিছু কি বলার নেই! দানিয়েল নীলার কাঁধে হাত রেখে বলল। কেমন লেগেছে। নিকলকে, নিকলের আর বন্ধুদের?
ভাল।
উঁহু, তোমার মন ভাল নেই নীলা। স্পষ্ট বুঝতে পারছি।
আসলে কী জানো, আমার নিজের ওপর খুব রাগ হচ্ছে।
এবার দানিয়েল নীলাকে নিজের দিকে ফেরাল।
কেন রাগ হচ্ছে?
নিকলের বাড়িতে আমার যাওয়াই উচিত হয়নি।
কেন উচিত হয়নি?
দানিয়েলের প্রশ্নের উত্তরে অনেকক্ষণ নৈঃশব্দ্যের জলে নীলা ডুবে থাকে, প্রশ্নটি বারবার যখন তার কানের কাছে ঝিঁঝি পোকার মতো ডাকতে থাকে, নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, দেখলে না কেমন গাধার মতো সারাক্ষণ ছিলাম। আমাকে এসব জায়গায় মানায় না। কিষানের ঘরের বউ হয়ে থাকাই বোধহয় ভাল ছিল, আপাদমস্তক গৃহবধূ। রাঁধব বাড়ব, ভারতীয় দু একজনের সঙ্গে কথা বলব, ব্যাস। আমি আসলে এই সমাজে চলার উপযুক্ত নই।
