নীলা কী বলছে তা বোঝার ক্ষমতা কারও নেই। তাকে ইংরেজিতে বলতে হল সে কী বলতে চাচ্ছে। আমি লাল ওয়াইন খেতে চাই।
উথলে ওঠে হাস্যরসফেনা। দানিয়েল শুধরে দেয় জ পু আভোয়া দু ভা রুজ সিল ভু প্লে।
ঠোঁট বিযুক্ত করলেই গোল বাঁধছে। ঠোঁট জোড়া চেপে রাখে নীলা। নিকল ভাল ইংরেজি জানেনা বলে নীলা ভেবেছিল, এ কদিনে শেখা তার ফরাসি যথাসম্ভব আওড়াবে সে। অন্তত ঘরে ঢুকেই নিকলের দিকে হাত মেলাতে মেলাতে, কমেন্ট তালেজ ভাউজ? আর তাকে একই প্রশ্ন করলে, উত্তর, এত্রে বিয়েন। ভাল যে কুকুরের ঝাঁপিয়ে পড়া নীলাকে ফরাসি বলতে বিরত করেছিল।
ওই হাসির স্রোতে সীল মাছের মতো মাথা ভেসে ওঠে নিকলের। আজ রাতে ভোজের আয়োজন নিয়ে তার যে পরিকল্পনা আছে, তার বর্ণনা। রেফ্রিজারেটরে শুয়োরের মাংস আছে, সে চাচ্ছে, একে রসুন দিয়ে রান্না করতে।
মমমম মমমম শব্দ উঠল।
আলু সেদ্ধ। আর হল সালাদ। আর পনির। আর আছে তার্ত। নিকল।
মমমম মমমম। বাকিরা।
শেষে কফি। নিকল।
মমমমম। বাকিরা।
নিকল রান্নাঘরে চলে গেল রেফ্রিজারেটর থেকে শুয়োর বের করতে। পেছন পেছন দানিয়েল, দানিয়েলের পেছন পেছন রিতা। দেখে নীলা নিশ্চিত যে রান্না শেষ হতে রাত পার হবে। কিন্তু পাঁচ কি ছ মিনিটের মতো পার হয়েছে কি হয়নি, টেবিলে রান্না করা শুয়োর এনে রাখে নিকল, এত শিগরি কী করে শুয়োর গলেছে, তা আর সবার মাথায় ঢুকলেও, নীলার মাথায় ঢোকে না। নিকল ঝটপট বলে দেয় কে কোন চেয়ারে বসবে। যার যার পানীয়ের গেলাস হাতে নিয়ে টেবিলে চলে এসো। আলুসেদ্ধ তুলে নাও, আর শুয়োরের টুকরো।
কী করে রান্না হয়েছে এটি?
মাখনে ভাজা হয়েছে, ভাজার সময় এক কোয়া রসুন চটকে দেওয়া হয়েছে, ব্যাস।
এটির নাম, রসুনে শুয়োর।
ডান হাতে ভাত ডলে খাওয়ার মেয়ে নীলার হাতে কাঁটা চামচ, আর ছুরি। ডান হাতে কাঁটা চামচ, বাঁ হাতে ছুরি নিয়ে মাংস কাটতে গিয়ে ছিটকে পড়ে ছুরি, ছুরি তুলে আবার কাটতে গিয়ে ছিটকে পড়ে কাঁটা। এবার তুলে আর কাটাকাটিতে যায় না, শক্ত হাতে কাঁটা ছুরি ধরে রাখে, ভয় হয় মাংসে ছোঁয়ালেই হাত থেকে খসে পড়বে সব। আড়চোখে অন্য হাতগুলো দেখে সে, ডান হাতে ছুরি, বাঁ হাতে কাঁটা। কেউ যেন না দেখে, লুকিয়ে নিজের কাঁটা ছুরির হাত বদল করে নীলা। ছুরি বাঁ হাত থেকে ডানে নেয়, আর কাঁটা ডান থেকে বাঁয়ে। হাত বদলের পর নির্ভাবনায় ছুরি কাঁটা ফের মাংসে ছোঁয়াতেই পড়ল হাত খসে আবার।
নীলার দিকে কেউ তাকাচ্ছে না নীলা লজ্জা পাবে বলেই সম্ভবত, তার চেয়ে যদি হইরই করে উঠত সব, বলত কী ঘটনা কী, তুমি বুঝি কাঁটা ছুরি ধরতে জানো না? মুঠো করে নয়, কাঁটার গায়ে তর্জনী রাখো, ছুরির গায়েও, কাঁটা ঢুকিয়ে দাও মাংসের পেটে, তারপর ডান হাতের ছুরিতে কাটো, বাঁ হাতের কাঁটায় তুলে নাও টুকরো। নীলা অন্তত হেসে বলতে পারত, কী জানো, আমাদের হাতে খেয়ে অভ্যেস। হাতে খাওয়ার স্বাদই আলাদা। হাতে খাবার ছুঁলে খাবারের সঙ্গে একরকম ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়, আত্মীয়তামতো। টেবিলের নীরবতা, নীলার ছুরিপতন, কাঁটাপতন দেখেও না দেখা, তাকে দ্বিগুণ লজ্জায় ফেলে। লজ্জা থেকে নীলার মুক্তি নেই।
দানিয়েলের দিকে আড়চোখে তাকায় সে, নীলার হাতখসা কাঁটা ছুরির শব্দ ওকে কতটা অস্বস্তিতে ফেলছে, অনুমান করার চেষ্টা করে। সম্ভব হয় না। নীলার পক্ষে সম্ভব হয় না মশলাহীন মাংস চিবোতে। আর সবার মতো নুন আর কালো লঙ্কার গুঁড়ো ছিটিয়েও নীলা লক্ষ করে কাজ হচ্ছে না। মাংস বিস্বাদই লাগছে তার জিভে। শুয়োরের শরীরের গন্ধ পাচ্ছে সে মাংসে। সারা টেবিল তখন উমমমমম উমমমমম করছে, নীলা একটি আলুসেদ্ধর কণা মুখে দিয়ে সালাদের আধখানা পাতা চিবিয়ে মুখের শুয়োরের গন্ধ দূর করল খানিক। তারপর পনির এসে মুখকে আবার বিনাশ করে দিল। এদিকে বড় বাগেত রুটি ছিঁড়ে যে যার থালার পাশে টেবিলের ওপর রেখেছে, দ্রুত, অভ্যস্ত এবং অবশ্যই সভ্য হাতে ছুরির মাথায় পনির নিয়ে রুটির ওপর লাগিয়ে রুটিপনির সোজা মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিচ্ছে। বাগেত গড়াচ্ছে টেবিলের ছাইয়ে ধুলোয়। ও খাওয়া নীলার পক্ষে সম্ভব হয় না, পনিরের দুর্গন্ধ দূর করতে তার্তের আশ্রয় নিতে হল তাকে। তার্ত তাঁতা, সাদামাটা আপেল পাইএর নাম। কোনও এক বাড়ির কোনও এক দুবোন আপেল পাই বানিয়ে ভুল করে উপুড় করে ঢেলেছিল থালায়। তলার আপেল উঠে এল ওপরে, আর ওপরের আটাগোলা ভাজা চলে গেল তলে, তাই মনে ধরল লোকের, সেই থেকে আপেল পাইএর নাম গেল বদলে, তার্ত পম(আপেল) না হয়ে তার্ত তাঁতা। তাঁতা ছিল দুবোনের পদবি।
নীলা কফি খাবে না। চা আছে? না চা নেই। সুতরাং জল গিলতে হয় নীলাকে। খাওয়া শেষ হয়ে যাওয়ার পরও খাবার টেবিলে বসে থাকার অভ্যেস নীলার নেই। ছটফট করে সে, কিন্তু উঠে ওই সোফায় গিয়ে বসতে পারে না, কারণ নিয়ম নেই। নিয়ম খাওয়া শেষে খাওয়ার টেবিলেই সময় কাটানো। অভিজাত ইংরেজ অবশ্য এক ঘরে মূল খাবারটি খায়, তারপর হাতে ন্যাপকিন নিয়ে উঠে যায় অন্য ঘরে মণ্ডা মিঠাই খেতে, খেয়ে আরেক ঘরে যায় চা বা কফি খেতে। রীতিমতো দৌড়োদৌড়ি করে খাওয়া। নীলা হিসেব করে দেখে নিকলের বাড়িতে খাবার টেবিলেই পার হয়েছে পুরো পাঁচ ঘণ্টা। বাঙালি আর ফরাসিতে পাঁচের একটি মিল লক্ষ করে সে। বাঙালির খাবার বানাতে সময় খরচা হয় পাঁচ ঘণ্টা, আর খাওয়া শেষ হয় পাঁচ মিনিটে। আর ফরাসিরা খাবার বানাতে সময় নেয় পাঁচ মিনিট, আর খায় সে খাবার পাঁচ ঘণ্টায়।
