নীলা অনেকটা আশা ছেড়েই দেয়, এ ভাষা শেখা তার দ্বারা হবে না। এত লিঙ্গ সামলাবার ক্ষমতা ওর নেই। আপাতত ম্যা(গ)সি বকু বলতে পেরে সে স্বস্তি পায়। অন্তত তাকে অসভ্য বলে এখন আর কেউ গাল দেবে না। অতি সতর্ক সে, চোখ কান নাক মুখ সব খোলা, কোনও কারণেই যেন ধন্যবাদ বলতে ভুল না হয়।
আলোচনা গড়িয়ে যাচ্ছে পুরুষ প্রযোজক থেকে নারী প্রযোজকে, নারী প্রযোজক থেকে নারী পরিচালকে, এরপর ব্যাক গিয়ারে একশো বছর পিছিয়ে যায়, সুসান বি এনথনি, এলিজাবেথ, কেডি স্ট্যানটন—ভোটের আন্দোলন। ভোট থেকে লাফিয়ে নারী শ্রমিক আন্দোলনে, ক্লারা জেটকিনের সভায়। সেই সভা থেকে আরও একটি লম্বা লাফে জন্মনিয়ন্ত্রণ। সেটির ফয়সালা হল। এখন কী? এই ফ্রান্সে, এই ইগালিতের সংসদে শতকরা দশজনও মেয়ে নেই। কী লজ্জা কী লজ্জা। সিমোন ভেইল, কী করেছে সংসদে বসে? কিচ্ছু না। আউসউইৎস থেকে বেঁচে এসে ডানপন্থী দলে ভিড়েছে, বোকামো ছাড়া আর কী! ক্যাথারিন ত্রতমেন? স্টারসবুর্গের মেয়র থাকাই ওর ভাল ছিল, সংস্কৃতিমন্ত্রী হয়ে কাজের কাজ কিছু করেনি। এলিজাবেথ গিগুকে বরং বাহবা দিতে হয়, পঞ্চাশ ভাগ মেয়েদের নাম থাকতে হবে দলের নমিনেশনে, এ একটা ঘটনা বটে। নমিনেশন পাওয়া মানে তো আর সংসদে বসা নয়। ভোটে আর কজন জিতবে!
মারিয়া তার উঁচু নাক আরও খানিকটা উঁচুতে তুলে বলে, অবশ্য আমাদের দেশে এই ঝামেলাটা নেই। সংসদে মেয়েরা চল্লিশের ওপর।
যা হবার ওই স্ক্যানডিনেভিয়াতেই হচ্ছে। নিকল বলে, মুখ মলিন তার।
মারিয়া পরক্ষণেই ঝাঁজালো করে স্বর, ছাই হচ্ছে। একাডেমিক পদগুলোয় দেখো গিয়ে, বড় পদে কারা আছে, সব পুরুষ।
মন দিয়ে বরফের দেশ থেকে আসা মেয়ে মারিয়াকে শোনে বাকিরা। বরফের দেশটি ছিল ভাইকিং জলদস্যুদের দেশ, জলদস্যুরা বিভিন্ন দেশে অতর্কিতে হামলা করত, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিত, শহর গুঁড়িয়ে দিত, দেদারসে মানুষ খুন করে রত্নরাজি ধনদৌলত লুট করত। জলদস্যুর উত্তরপুরুষ এবং উত্তরনারীরা এখন পৃথিবীর অন্যতম সভ্য পুরুষ এবং সভ্য নারী বলে পরিচিত, জলদস্যুর দেশ এখন সমতা সাম্য সুখ আর সমৃদ্ধির দেশ।
মারিয়া বলে, মোনা সালিনের ব্যাপারটা জানো তো? ও তো প্রধানমন্ত্রী হয় হয় করেও হচ্ছে না।
কারণ?
সরকারি ক্রেডিট কার্ডে কবে নাকি চকোলেট কিনেছিল, গেছে ফেঁসে। হত পুরুষ, দেখতে ক্রেডিট কার্ডের ব্যাপারটি নেহাতই তুচ্ছ।
নীলা প্রায় বলতে নেয়, মেয়েরা রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হলেই কি সব সমস্যা ঘুচে যায়। কই, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশে তো মেয়েরা পেয়েছে ও পদ, কিন্তু সমাজে মেয়েদের অবস্থা যা ছিল, তাই তো আছে। কিন্তু বলে না, বরং গিলে ফেলে, পরতোর মতো গেলে। নীলার ধারণা, এ বাক্যও গর্দভের মন্তব্য বলে বিবেচিত হতে পারে। পারেই তো, নীলা ভাবে, বাপ স্বামীর লেজ ধরে ওসব দেশে মেয়েরা ক্ষমতায় আসে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নয়।
ভারত হল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র। নীলা মনে মনে বলে।
বোলে, নীলা, মনে মনে শোনে ওরা বলছে, তোমার ওই সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র ধুয়ে খাও। নীলা ধুয়ে খেল। ফরাসি বরদিওক্স ওয়াইনে ধুয়ে ইয়া বড় গণতন্ত্র গিলল। বরদিওক্স, ভুল। দানিয়েল শুধরে দেবে, বরদো। নীলা ভারতের নিচু জাতের মেয়ে, বড় জাতে ওঠার কোনও সম্ভাবনা নেই তার। তবে ফরাসি জাতে উঠতে হলে কিছু জিনিস মকসো করলেই চলে। এদেশে জাতে ওঠার ব্যাপারটি অন্যরকম, জন্মপরিচয় তত দরকার হয় না, বরদো পান করাটা ভাল শিখে গেলে অনেকটা কাজ হয়, পান করা মানে যে গিলতে পারা তা নয়, গেলাস কী করে দু আঙুলে ধরতে হয়, কী করে প্রথম ছোট্ট চুমুকে জিভাগ্রে ভিজিয়ে মাথা ডানে কাত করতে হয়, তারপর সামনে পেছনে আলতো করে কী করে মাথা ঝাঁকাতে হয়, চুমুকে চুমুকে ছন্দময় বিরতি, এসব হচ্ছে শিল্প, এ শিল্প করায়ত্ত করতে পারলেই জাতে আশি ভাগ উঠে যাওয়া যায়, মই ছাড়াই।
মিশেল কজ অম্লান বদনে বলে, যাই বলো বাপু, জগৎ বদলাচ্ছে। মেয়েরা কী অবস্থায় ছিল, এই ইয়োরোপের কথাই ভাবো না কেন! গির্জার লোকেরা মেয়েদের জ্যান্ত পুড়িয়ে মারেনি? মেরেছে।
নিকল হাত তুলে থামতে বলল সবাইকে। থামলে, ধীরে সে বলল, কিন্তু প্রতিটি শব্দে জোর দিয়ে, বদলাচ্ছে ওপরে ওপরে, ভেতরে ঠিক তাই আছে, যা বরাবরই ছিল। নারীর ওপর পুরুষের শোষণ। শোষণের কাঠামোর কিন্তু কোনও বদল হচ্ছে না।
বরাবরই ছিল বলছ কী নিকল, মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা তো এককালে ছিল। নারীর হাত থেকে পুরুষ তো ক্ষমতা নিল অস্ত্রের জোরে।
নিকল জোর গলায় বলে, মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কোথাও কোনও কালেই ছিল না। ছিল যা, তা হল মাতৃলোকাল আর মাতৃলিনিয়ার সমাজ। সম্পত্তি মেয়েদের নামে হত, আর মেয়েদের পদবি বংশানুক্রমে গ্রহণ করা হত, এই যা। এ মাতৃতন্ত্র নয়।
যদিও দানিয়েল বলেছিল তোমার আর মারিয়ার কারণে, যেহেতু তোমরা ফরাসি জানো, আমরা ইংরেজিতে কথা বলব, যা কথা, যা আলোচনা ইংরেজিতেই হচ্ছে, আর নীলা বেশ ভাল বুঝতে পাচ্ছে, হচ্ছে মারিয়ার কারণেই, নীলার কারণে এ আলোচনা ইংরেজিতে হওয়ার কোনও কারণ নেই, কারণ সে অংশগ্রহণ করছে না এতে, তার পক্ষে সম্ভবও নয়। এক গেলাস পরতো শেষ করে, অপাঙক্তেয় নীলা, নারী আন্দোলনে না পারুক, ফরাসি ভাষায় দক্ষতা দেখাতে বলল, জে পুর আভোইর দু ভিন রোগি সিল ভোউস প্লেইট!
