চোখ আছে যেমন ওদের, চোখের লজ্জাও আছে। আর সে চোখের লজ্জার কারণে, ওরা বলে, সোফার এককোণে বসে খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে নখ খুঁটতে থাকা নীলাকে, আচ্ছা তোমাদের ভারতে এখন কী কাল?
দানিয়েলই জিজ্ঞেস করে। তার বন্ধুটি যে একেবারে ফেলনা নয়, ভারতে কী কাল চলছে, শীতকাল না গ্রীষ্মকাল এই সহজ প্রশ্নটির উত্তর অন্তত দিতে পারবে, সে ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চিত হয়েই দানিয়েল প্রশ্ন করল, আর নীলাকে একাকিত্ব থেকে উদ্ধার করতেও।
নীলা আসলে একা বোধ করছিল না, এখনই বরং সে একা বোধ করে।
ম্লান কণ্ঠে উত্তর দেয়, বসন্তকাল।
বসন্তকাল?
নিকলের ভুরুতে অবিশ্বাস।
ভারত কি বিষুবরেখার উত্তরে না দক্ষিণে? প্রশ্ন।
রিতা বলে, উত্তরে।
নিকল বলে না না দক্ষিণে।
দানিয়েল বলে, বসন্তকাল হলে এ নিশ্চয়ই উত্তরে।
নিকল উঠে গেল, ফিরে এল হাতে একটি ঢাউস বই নিয়ে। পাঁচটা মাথা পৃথিবীর মানচিত্রে উপুড় হয়ে আছে। লাল (নিকলের), সোনালি (মারিয়ার), কালো (রিতার), বাদামি (মিশেলের), গাঢ় বাদামি (দানিয়েলের)।
.
মাথাগুলো দূর থেকে দেখে নীলা।
এবার রিতা, সঠিক উত্তরের রিতা, নীলার দিকে ঝুঁকে বলে, কী নাম ওই পরিচালকের? ওই স্যালন দ্য মুজিক যে বানিয়েছে…সত্যজিৎ রায়। ওর ছবি দেখেছি আমি। আকৰ্ণবিস্তৃত হাসি রিতার মুখে।
নীলার মুখে হাসি ফোটে। কথা ফোটে।
ওঁর আর কী ছবি দেখেছ?
প্রায় সব ছবিই।
পথের পাঁচালি দেখেছ? নীলা উদগ্রীব।
দেখেছি। তত ভাল লাগেনি।
ভাল লাগেনি? নীলা অবাক।
চারুলতা?
তাও দেখেছি। ওর সবচেয়ে ভাল ছবি হল স্যালন দ্য মুজিক, জলসাঘর।
রিতার রায় শুনে নীলা, যেহেতু তার মতে পথের পাঁচালিই সত্যজিৎ রায়ের শ্রেষ্ঠ ছবি, দমে যেতে গিয়েও যায় না, কারণ এক রিতাই একজন ভারতীয় তার ওপর বাঙালি সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞান ধারণ করে আছে।
জলসাঘর কেন, রিতা যদি মহাপুরুষ বা কাপুরুষও পছন্দ করে, নীলার মনে হয় না সে এতটুকু চুক চুক করবে।
রিতাই আসলে একরকম নীলাকে উদ্ধার করে, নত মস্তক থেকে নখ খোঁটা থেকে সত্যিকার মুক্তি দেয়। নীলার কণ্ঠ থেকে কুণ্ঠা বিদেয় করে।
আর কোনও ভারতীয় পরিচালকের ছবি দেখেছ? নীলা জিজ্ঞেস করে।
দেখেছি আর দুএকটা। তবে তোমাদের ছবিতে খুব নাচ গান থাকে।
তা থাকে, সস্তা মারদাঙ্গা, রুচির ছিটেফোঁটা নেই। হিন্দি ছবিগুলোকে নীলার অস্বীকার করার উপায় নেই যে এ তার বা তাদের ছবি নয়।
ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, অপর্ণা সেন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এদের ছবি দেখেছ? না দেখেনি। নাম শুনেছ? শোনেনি।
রিতা নিজে এখনও কোনও বড় ছবি, যাকে বলে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, বানায়নি। এ অব্দি যা করেছে, সব ছোট। ছোট বলতে দু মিনিটের, পাঁচ মিনিটের, পনেরো মিনিটের। তিনটে তথ্যচিত্র করেছে কুর্দ মেয়েদের জীবন নিয়ে, আর একটি করেছে তুরস্কে রুশ মেয়েদের পতিতাবৃত্তি নিয়ে। পূর্ণদৈর্ঘ্য? ও বানানো সহজ, কিন্তু সহজ নয় প্রযোজক পাওয়া।
দানিয়েল বলে, মেয়েদের পণ্য করে আজ বানাতে চাও কোনও ছবি, দেখবে প্রযোজকেরা লম্ফ দিয়ে আসবে ছবির খরচ দিতে।
নিকল সংশোধন করে দেয়, পুরুষ প্রযোজক।
টেবিলে বিভিন্ন মদের বোতল। শ্যাম্পেন আছে, পরতো আছে, মার্টিনি, ভদকা, হুইস্কি আছে, যে যা পান করো।
নিকল গেলাসে ঢেলে দেয়, যে যা চাচ্ছে। মারিয়া সবেগে মাথা নাড়ে, সে মদ্যপান করবে না আগেই বলেছে, কারণ সে গাড়ি চালাবে।
প্যারিসে এ দুদিনের জন্য গাড়ি?
দুদিন পর সে যাচ্ছে দক্ষিণে, কান-এ।
ওখানেও বক্তৃতা?
না, ওখানে সমুদ্র। দক্ষিণী উষ্ণতা।
ও সুইডিশ, আর কিছু না জানলেও আইন মানতে জানে, মিশেল কজ চোখ টিপল বোলে। আমরা ফরাসিরা দুএক গেলাস পেটে না ফেলে স্টিয়ারিঙে হাত দিই না। নাকি এবসলুত লাগবে?
এবসুলেটলি নট।
নীলা পরতো নেবে বলল। নেবে কারণ বোতলটি দেখতে অন্য বোতলের চেয়ে ভাল। আর পান করতে যেহেতু হবেই, যেহেতু পান না করলে ভাবা হবে সে এক গেঁয়ো ভূত। আর নিকল যখন হাতে দেয় গেলাস, নীলা ধন্যবাদ বলে।
ম্যা(গ)সি বকু।
এটির উচ্চারণ শিখতেই তার অনেকদিন লেগেছে। এম ই আর সি আই মেরসি, বি ই এ সি ও ইউ পি বিয়াকুপ। মেরসি বিয়াকুপ। তাই বলত। যেরকম বানান সেরকম উচ্চারণ। কিন্তু শুনে লোকে অবাক হয়, এ আবার কী আজব ভাষায় কথা বলছে এ মেয়ে! ফরাসিরা র উচ্চারণ করতে গেলে গ-এর মতো এক শব্দ বেরোয়, আর শব্দের লেজ বেশির ভাগ সময়ই এরা উচ্চারণ করে না। এ দেখে নীলার বদ্ধ ধারণা, বই পড়ে আর যে ভাষাই শেখা যাক, ফরাসি ভাষা নয়।
নীলার মাথা খারাপ হবার জোগাড় হয় যখন দেখে ফরাসি সব জিনিসেরই, সব পদেরই লিঙ্গ আছে। বড় লিঙ্গপ্রেমী এরা। টেবিল চেয়ার দরজা জানালা খাতা কলম থাল বাসন সবকিছুরই লিঙ্গ আছে। টেবিল পুংলিঙ্গ তো চেয়ার স্ত্রীলিঙ্গ, বই পুংলিঙ্গ তো কলম স্ত্রীলিঙ্গ। দরজা কি পুংলিঙ্গ না স্ত্রীলিঙ্গ? স্ত্রীলিঙ্গ। কী কারণ? কোনও কারণ নেই। ব্রেসিয়ার কী লিঙ্গ। পুংলিঙ্গ। এ মেয়েদের জিনিস, এ পুংলিঙ্গ কেন? কারণ নেই। প্যান্টি? পুংলিঙ্গ, লিপস্টিক? এও পুংলিঙ্গ। মন্ত্রী কী লিঙ্গ? মন্ত্রী পুংলিঙ্গ। তবে মেয়ে মন্ত্রীদের উপায় কী? পুংলিঙ্গই ব্যবহার করছে, কেউ আবার দাবি তুলছে শব্দ বদলাবার। নীলার জানতে ইচ্ছে করে, পুংলিঙ্গটি কোন লিঙ্গ, পুংলিঙ্গ তো? না কি স্ত্রীলিঙ্গ।
