নীলাকে মানসিক রোগী হওয়ার যন্ত্রণা থেকে উদ্ধার করে দানিয়েল বলল, সম্ভবত ও আগে কুকুর দেখেনি। ওদের দেশে কুকুর নেই।
নীলা পাঁচ জোড়া চোখের সামনে যদি বলতে পারত যে ঠিক তাই, নেই, তবে একরকম বাঁচত। বলল, আছে।
আছে?
নিকল চমকাল।
থাকলে ভয় পেলে কেন? পাঁচজোড়া চোখে একটিই প্রশ্ন।
নীলা উত্তর দেবার সাহস পেল না।
পাঁচ মানুষের চোখ এবার অন্যদিকে ফিরল। ফ্লুনের চোখও। নিকলের কোলেরটিরও, ফিফিরও। কালো চারটে বেড়ালেরও।
এরপরের দীর্ঘ আলোচনায় নীলার অংশগ্রহণ মোটে জরুরি নয়। শ্যাম্পেন পান করতে করতে যে আলোচনাটি চলে, তা কুকুর বেড়াল বিষয়ে, সকালে চোখ মেলতেই কাকে নিকল দেখেছে তখনও ঘুমোচ্ছে, আর কোনটি লাফিয়ে তার বুকের ওপর বসেছে, কে ঘাড় কাত করে নিকলকে একবার দেখে সরে গেছে অন্য ঘরে, সকালের কোন খাবার কার পছন্দ হয়নি, কে সোফায় শুয়ে টেলিভিশন দেখতে দেখতে খাবার খেতে ভুলে গেছে, আর খেতে গিয়ে কোনটির কোন খাবার পছন্দ হয়নি, কোনটি অভিমান করে লেপের তলায় সারা বিকেল শুয়ে ছিল, কার আজ দুদিন ধরে মন খারাপ এসব। নীলা লক্ষ করে, সবাই বিষম আগ্রহ নিয়ে শুনছে এসব, মাঝে মাঝে আহা আহা করছে, মাঝে মাঝে হাতে হাসতে বেড়াল বা কুকুর কোনও একটিকে বুকে জাপটে ধরে নাক মুখ ডুবিয়ে দিচ্ছে লোমে। বেড়ালের গায়ের বোটকা গন্ধে নীলা প্রথম থেকেই নাক চেপে আছে, হঠাৎ হঠাৎ শ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকার ব্যাপারটি নিশ্চিত করে বাকি সময় শ্বাস বন্ধই করে রাখছে। একটি ব্যাপার সে লক্ষ করছে, এত সোফা চেয়ার খালি পড়ে আছে, তবু দাঁড়িয়ে পান করছে সবাই। কী জানি, কার শরীরের মাপ কী, কে কার চেয়ে কত উঁচু, কার জুতো কোথা থেকে কেনা নাকি কার জামাটি দেখতে কত চমৎকার তা বোঝাতেই। নীলা তার জিনস, তার কড়া হলুদ রঙের একটি না-ইস্ত্রি শার্ট, তার সবুজ রঙের জ্যাকেটের দিকে তাকিয়ে টের পায় তাকে উৎকট লাগছে দেখতে, অন্য কারও যেন চক্ষুপীড়া, নাসিকাপীড়া না হয় তাকে দেখে, আলগোছে সে বৃত্ত ভেঙে সোফার একটি কোণে গিয়ে জবুথবু বসে, বসে টের পায় এ নিয়ম নয়, নিয়ম দাঁড়িয়ে থাকা। বৃত্তে দাঁড়িয়ে থাকো, যতক্ষণ না তোমাকে বসতে বলা হচ্ছে, বৃত্তে দাঁড়িয়ে, তুমি যদি জংলি কিছু পরা থাকে, তাই দেখাও, তুমি যে গেঁয়ো ভূত, তুমি যে সংস্কৃতির স-ও জানো না, কোথায় কোন পোশাক পরতে হয়, কী করে মেরুদণ্ড লোহার মতো শক্ত করে দাঁড়াতে হয় তা জানো না, তা বোঝাও। নীলা বসেই থাকে, কুলকুল করে ঘামে, লক্ষ করে কারও গায়ে কোনও গরম কাপড় নেই, দরজার কাছে হুকে ঝুলিয়ে তবে ঘরে ঢুকেছে সবাই, কারণ ঘরের ভেতরটা ঠাণ্ডা নয়, ঘরের ভেতর ওম আছে, মানুষের ওম, কুকুর বেড়ালের ওম, উষ্ণ সংস্কৃতির ওম, দম্ভের ওম।
এক কোণে ফায়ারপ্লেসে কাঠ পুড়ছে, আরেক পাশে বড় এক পিয়ানো। ধনীর বাড়িতে এ দুটো জিনিস না থাকলে চলে না। ঘর গরম করার যন্ত্র থাকলেও ফায়ারপ্লেসে আগুন ধরিয়ে ঘর গরম করার মধ্যে আভিজাত্য আছে, আর পিয়ানো কেউ বাজাক না বাজাক, এটি থাকলে সম্ভ্রম থাকে। সবুজ জ্যাকেটখানা খুলে ঝুলিয়ে আসে হুকে, কারও যেন চোখ না পড়ে তার দিকে, এমন সন্তর্পণে। ও খুলেও সংস্কৃতি রক্ষা তার পক্ষে সম্ভব হয় না, কারণ তার কড়া হলুদ শার্ট থেকে অসংস্কৃতির আলো ছিটকে বেরোচ্ছে, সে আলো অন্যের চোখকে আঘাত তো করেই, অন্ধ করতেও ছাড়ে না।
ফ্লুন বসন্তকালটা আবার খুব পছন্দ করে, বলতে বলতে নিকল সোফার দিকে এগোল। পেছন পেছন বাকিরা। বাকিদের বসতে অনুরোধ করে নিকল নিজেও বসল।
বসন্তের ঘ্রাণ পাচ্ছ বাতাসে?
সবাই এক বাক্যে সায় দেয়, ঘ্রাণ পাচ্ছে, নতুন পাতার ঘ্রাণ, নতুন কুঁড়ির ঘ্রাণ। জানালা সামান্য খোলা, ওতেই হুড়মুড় করে ঢুকছে বসন্তের ঘ্রাণ। নীলাও সে ঘ্রাণ পেতে শ্বাস নেয় লম্বা করে, তার ওই শ্বাসে বেড়ালের গায়ের ওই বোটকা গন্ধ ছাড়া কিছু ঢোকে না। বেচারা নীলা।
কী ভীষণ ঠাণ্ডাই না গেছে এবারের শীতে! রিতা বলল।
খুব ঠাণ্ডা গেছে বলে মারিয়া আর দানিয়েল মানল না, থাকতে মন্ট্রিয়ালে, থাকতে উপসালায়, দেখতে ঠাণ্ডা কাকে বলে।.দানিয়েল ছ বছর আগে কানাডা ছেড়ে এসেছে, ওই ঠাণ্ডা দেশে তার আর ফেরার শখও নেই, আর সে দেশের নামও সে নিতে চায় না, নাম নিলেই নাকি স্মৃতির এক পাহাড় বরফ তার গায়ের ওপর ধসে পড়ে। রীতিমতো আভালাঞ্জ।
শীতকালের প্রসঙ্গ যে যত দ্রুত সম্ভব দূর করে। যে বিষয়টির দিকে মারিয়া হাত বাড়িয়ে আছে, সে সূর্য। কী অভাবনীয় এর কিরণ, কী মধুর এর তাপ, কী যে আশ্চর্য জাদু এর আলোয়। নীলা শ্বাস বন্ধ করতে ভুলে যায়, বেড়ালের বোটকা গন্ধও যেন নিমেষে উবে গেছে, বসন্তের এমন রূপ বর্ণনা শুনে। নীলা বরং ঘন ঘন শ্বাস নেয়। শ্বাস নেয়, কারণ স্মৃতিতে এখন তার চাঁদি ফাটানো সূর্য। সূর্যের কোনও মোহনীয় রূপ তার কোনওকালে দেখা হয়নি, দেখা হয়েছে এর রুক্ষতা, তিক্ততা, এর রোষ, ক্ষোভ, এর গা পোড়ানো চরিত্র। ভ্যাপসা বিচ্ছিরি গরমে নীলার বরাবরই ঘন ঘন শ্বাস পড়ে, এখনও তাই পড়ছে। জল তেষ্টাও পায়, এখনও তাই পাচ্ছে। জলতেষ্টাকে সে দাবিয়ে রাখে, যতটা অপাঙক্তেয় অবজ্ঞাত হওয়া যায়, সে হতে চায় এ আলোচনায়। কারণ, কোনও কারণে কেউ যেন আবার না ভাবে, নীলা কুকুরকেই নয় কেবল, সূর্যকেও ভয় পায়। আর তা শুনে দানিয়েলকে যেন এগিয়ে আসতে না হয় নীলাকে উদ্ধার করতে এই বলে যে ও সম্ভবত সূর্য দেখেনি বা ওদের দেশে সূর্য ওঠে না।
