ও যখন ফিরে এল ঘরে, নীলা তখনও শুয়ে, এ মুভেবল ফিস্ট পড়ছে।
কী ব্যাপার তুমি এখনও তৈরি হওনি? দানিয়েল বোকা বনে যায় ঘরে ঢুকে।
নীলা আড়মোড়া ভেঙে বলে, এখনই? বাজে কটা?
সাতটা।
এ আর এমন কী!
আমি তোমাকে সাতটায় তৈরি হয়ে থাকতে বলেছি।
আমার তো এখনও স্নান করাই হয়নি। নীলা উঠে বসে।
বলো কী? দানিয়েলের ছোট চোখে ছোট চিবুকে দু টুকরো বিস্ময় এসে বসে।
আমার তো কাপড় ইস্ত্রি করাই হয়নি।
দানিয়েল ধুপ করে শরীর ছেড়ে দিল চেয়ারে। ঠিক সাড়ে সাতটায় আমাদের পৌঁছতে হবে নিকলের বাড়িতে। তোমাকে তো আগেই বলেছি।
সাড়ে সাতটার জায়গায় আটটা বা সাড়ে আটটা হলে কী ক্ষতি নীলা বুঝে উঠতে পারে না। কলকাতায় কোথাও নেমন্তন্ন থাকলে ঘণ্টা দেড়ঘণ্টা দেরি করেই সে যায়, সে কেন, সবাই যায়। একেবারে কাঁটায় কাঁটায় পৌঁছোনো কেমন অস্বস্তিকর, দানিয়েলের কাছে অবশ্য কাঁটায় কাঁটায় না পৌঁছোনোই অস্বস্তির ব্যাপার। স্নান করতে আবার কাছের গণ স্নানাগারে যেতে হবে নীলার, ও সেরে আসতে গেলে দানিয়েল আত্মহত্যা করবে। দানিয়েলের স্নানের ঝামেলা নেই, ও মাসে একবার যায় স্নানাগারে, আর সপ্তাহে সপ্তাহে ঘরের তোলা জল মুখে গলায় ঘাড়ে হাতে ছিটিয়ে স্নান সারে।
পরনে ওর কালো লম্বা জামা, আর নীলা তড়িঘড়ি হাতের কাছে যা পায়, ইস্ত্রি ছাড়াই, পরে নেয়। নীলা লক্ষ করেছে, ইস্ত্রি করা কাপড় জামা খুব কম লোকেই পরে। শীতের দেশ, বছরের বেশির ভাগ সময়ই সোয়েটার বা কোটের তলায় ঢাকা পড়ে থাকে না-ইস্ত্রি জামা।
জিনস পরলে? নেমন্তন্ন খেতে যাচ্ছ।
খারাপ দেখাচ্ছে?
জিনস তো দিনের বেলায়। কাজের জায়গায়।
দানিয়েল সময়ের অভাবে নীলার জিনস মেনে নেয়। নীলা তড়িঘড়ি একটি লাল টিপ পরে নেয় কপালে, অন্তত এ যদি কিছু সৌন্দর্য রক্ষায় সাহায্য করে।
দানিয়েলের ঘর থেকে গার দ্য অস্তারলিজ মেট্রোতে যেতে আড়াই মিনিট, গার দ্য অস্তারলিজ থেকে নিকলের বাড়ির কাছের মেট্রোতে পৌঁছোতে লাগে বাইশ মিনিট, আর সেই মেট্রো থেকে হেঁটে নিকলের বাড়িতে যেতে পাঁচ মিনিট। হাতে দেড় মিনিট থাকে। এক মিনিট হাতে রাখো, রাস্তা পার হওয়ার সময় যদি ট্রাফিকের লাল বাতি জ্বলে, তবে গেল এক, আর নিকলের বাড়ির লিফটে যদি লোকের ভিড় থাকে, তবে সিঁড়ি পেরোতে হবে, সিঁড়িতে যাবে আধ মিনিট। নীলার কারণে দানিয়েলের এই হিসেবে গোল বাধে। লাল বাতির ঝামেলা ছিল না, লিফটেও কোনও লোকের ভিড় ছিল না, তার পরও নিকলের বাড়িতে ঢুকতে বাজল সাতটা সাঁইত্রিশ।
দানিয়েল প্রথমেই এই দেরির জন্য ক্ষমা চেয়ে নিল।
নিকল, তারও পরনে লম্বা কালো জামা, লাল চুলের সবুজ চোখের মেয়ে, নীলার চেয়ে লম্বায় দুবিঘত, বয়সে দুবিঘত বড়, দানিয়েলকে ক্ষমা করল।
বাড়িতে আরও তিনজন অতিথি, মারিয়া সুয়েনসন, মিশেল কজ আর রিতা সিকসুস। সবাই দাঁড়িয়ে, সবার হাতে সরু শ্যাম্পেনের গেলাস, এক মারিয়া ছাড়া, তার গেলাসে কমলার রস। সবার পরনে কালো লম্বা জামা, নেমন্তন্নের সঙ্গে কালো লম্বা জামার একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে, নীলা অনুমান করে। ঢোকার পরই নিকল সহ অতিথি তিনজন নীলা আর দানিয়েলের দুগালে চকাস চকাস চুমু খেল।
মারিয়া সুইডেনের মেয়ে, ফ্রেডরিকা ব্রেমের ফরবুনডেট নামের একটি নারী সংগঠনের নেত্রী, প্যারিসে এসেছে মেয়েদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বিষয়ে একটি সভা হচ্ছে, ওতে বক্তৃতা করতে, মিশেল কজ প্যারিসের নয়, থাকে ফ্রান্সের দক্ষিণে, ফিজাক নামের এক শহরে, প্যারিসে এসেছে এই সভা শুনতে আর রিতা সিকসুসের কোনও সভা সমিতি নেই, জন্মেছে আলজেরায়, ইহুদি পরিবারে, প্যারিসেই বাস, ছবি পরিচালনা করে, নিকলের দীর্ঘদিনের বন্ধু, এ বাড়ির যে কোনও আড্ডায়, বিশেষ করে শনি রোববারে রিতার উপস্থিতি অনেকটা মাছের ঝোলে নুনের মতো, থাকা চাই। আর নিকল, মাস্টারি করে কলেজ দ্য ফ্রান্সে, দানিয়েলেরও পরিচয় আছে বলার, সে সাংবাদিক। নীলার পরিচয় সে ভারতের মেয়ে। কী করো? কিছু না। ভেরেন্ডা ভাজি।
তাই তো নীলা ভাবে, এই প্যারিসে তার পরিচয় হয় কিষানলালের বউ নয়তো নীলাঞ্জনা মণ্ডল, শ্রমিক।
ভেরেন্ডাভাজনেঅলা। দানিয়েল করুণা করে নীলার আরও এক পরিচয় উল্লেখ করল, তার বন্ধু।
নীলা হাঁফ ছাড়ল।
হাঁফ ছাড়তে না ছাড়তেই দুটো বীভৎস কুকুর নীলার ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ও মাগো বাবাগো বলে তারস্বরে চিৎকার জুড়ল নীলা, আর হাসির রোল উঠল ঘরে। দানিয়েল ফ্লুন ফ্লুন বলে ভোঁতা নাকের একটিকে কোলে তুলে নিয়ে মাথাখারাপের মতো চুমু খেতে লাগল, আরেকটিকে নিকল তুলল কোলে, বাচ্চাদের মতো না কাঁদে না না কাঁদে না ভঙ্গিতে দুলতে লাগল।
তুমি কুকুরকে ভয় পাও? মারিয়া ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে।
নীলাকে ভয় পাচ্ছে মারিয়া, কারণ কুকুরকে জড়িয়ে ধরার বদলে নীলা চিৎকার করেছে। এরকম অদ্ভুত কাণ্ড মারিয়া কেন, এ বাড়ির কেউ দেখেনি এর আগে। নীলার আশঙ্কা হয়, পাঁচ জোড়া চোখ যেভাবে তাকে দেখছে, নিশ্চয় এদের সন্দেহ হচ্ছে যে তার মাথায় কোনও রোগ আছে।
রিতা জিজ্ঞেস করল, খুব কোমল কণ্ঠে যদিও, আচ্ছা তোমার কি কোনও অসুখ টসুখ আছে। এরকম হয়, কিছু অসুখ থাকলে বিশেষ করে কুকুর দেখলে…।
