দানিয়েল একাই নেচে এল। এসে মুখ ভার করে বলল, তুমি আমাকে এত অপছন্দ করো?
কেন?
আমার সঙ্গে নাচলে না যে।
নীলা লজ্জায় কুণ্ঠায় মাথা নিচু করে বলল, আমি যে নাচতে জানি না।
এ আবার না জানার কী আছে।
ছোটবেলা থেকে না নাচলে নাচ হয় না, তাই নীলা জানে। তার খুব নাচের শখ ছিল, অনির্বাণ মেয়েকে নাচ শেখাতে রাজি হননি বলে নীলার নাচও হয়নি। হারমোনিয়াম কিনে দিয়ে নাচের বদলে গান শিখতে বলেছিলেন। ওস্তাদ রেখে দিয়েছিলেন, বড় গাইয়ে হয়নি নীলা, তবে ভাল গাইতে জানে, ছোটখাটো আসরে আবদার করলে নীলা শরম না করে গেয়ে দেয়। ভারতে যারা নাচে, ভরতনাট্যম, কথক বা মণিপুরি, তারা সেই ছোটবেলা থেকেই নেচে আসছে। শরীর ওদের একতাল কাদার মতো, বেঁকে ধনুকের মতো হতে পারে।
.
দানিয়েল পথে বেরিয়ে বলে, তুমি যে আমাকে অপমান করেছ, তা আমি আগেই বুঝতে পেরেছি অবশ্য।
নীলা চমকে ওঠে, কখন? কখন আমি তোমাকে অপমান করলাম। বলছ কী দানিয়েল!
আমি তোমার গেলাসে ওয়াইন ঢেলে দিলাম, আর তুমি কোনও ধন্যবাদ বলোনি। দানিয়েল বলে।
বলে কী মেয়ে। দানিয়েলকে ইতিমধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে মনে করছে নীলা। বন্ধুরা কখনও বন্ধুকে কোনও কারণে ধন্যবাদ বলে! নীলা অন্তত এ শিক্ষা পায়নি। কলকাতায় কোনও বন্ধু তার গেলাসে ওয়াইন ঢেলে দিলে, নীলা যদি ধন্যবাদ বলত, তা হলে সে বন্ধু নির্ঘাত একে অপমান বলে ভাবত। বাংলায় একটি কথাই আছে, ধন্যবাদ জানিয়ে আমাকে খাটো কোরো না।
ঠিক আছে, বন্ধুকে যদি ধন্যবাদ না বলো, তবে কাকে ধন্যবাদ বলো?
নীলা অপ্রতিভ কণ্ঠে বলে, অপরিচিত কেউ যদি হয়। আর সে যদি কিছু দেয় আমাকে বা কিছু করে আমার জন্য, তবে।
ক্যাফে জিমমারের লোকটি তো তোমার বন্ধু ছিল না, তাকেও তো ধন্যবাদ বলোনি।
তাকে কেন ধন্যবাদ বলব?
তুমি জল চাইলে, সে তোমাকে জল এনে দিল। সে কারণে তাকে ধন্যবাদ দেবে। আদেশ, বুঝলে নীলা, লোকটিকে তুমি আদেশ করেছ জল আনতে, অনুরোধ করোনি। ও লোক তো তোমার ক্রীতদাস নয়। ও ওখানে চাকরি করে। দানিয়েল এক দমে বলে যায়।
নীলা ঠিক বুঝে পায় না কী বলবে। সে সাধারণত যেভাবে রেস্তোরাঁয় কিছু চায়, এক গেলাস জল দিন তো, সেভাবেই চেয়েছে। আদেশ করলে স্বরটি রুক্ষ হয়, অনুরোধ হলে স্বরটি নরম, ঠোঁটে এক চিলতে হাসি দোলে, এই পার্থক্য। দানিয়েলের আপত্তি নীলা দয়া করে শব্দদুটো বলেনি। আপনি কি দয়া করে আমাকে এক গেলাস জল দিতে পারেন এভাবে চাইতে হত।
আসলে কী জানো দানিয়েল, নীলা ধীরে বলে, স্বরটি ভাঙা, ধন্যবাদ দেবার অভ্যেস নেই বলে সম্ভবত দিইনি, তবে ওই লোককে আমি মোটেও ছোট করে দেখিনি।
অভ্যেস নেই? কেন অভ্যেস নেই? অভ্যেস নেই, কারণ তোমরা মানুষকে মানুষ বলে জ্ঞান করো না। দানিয়েল বলে।
তাই কি!
তাই।
নীলা মনে মনে শক্ত চাবুকে নিজেকে চাবকায় নিজের এই অসভ্যতার জন্য, মানুষকে মানুষ না ভাবার জন্য। এই সমতার দেশে, কোনও মানুষই বড় নয়, কোনও মানুষ ছোট নয়, সবাই সমান। কেউ ছোট কাজ করে, কেউ বড় কাজ করে, কিন্তু সবাই মানুষের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকে। নীলা মনে মনে বলে, তাই তো হওয়া উচিত। শ্রেণীবিদ্বেষ নেই তার, তাই সে জানত। দানিয়েল আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল, আছে।
বোধোদয় হয় নীলার। নিজেকে সে ঘৃণা করতে থাকে। দাঁতে ঠোঁট কামড়ায়। চোখ জ্বালা করে।
নীলা ছোটবেলায় দেখত, নিখিল রাত জেগে লাল বই পড়ছে। কী লেখা লাল বইয়ে? শ্রেণীসংগ্রামের কথা লেখা। নীলা তার উনিশ বছর বয়সেই মার্কস এঙ্গেলস পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েছে, কলেজে কমুনিস্ট দলে ভিড়েছে, মিটিং মিছিল করেছে, আর আজ কিনা সে নিজেই প্রমাণ করল সে শ্রেণীভেদ মানে, সে মানে যে লোকটি খাবার এনে দেবে ক্যাফে রেস্তোরাঁয়, সে ছোটলোক! এই সভ্য সমাজে এসে, এই সাম্যের দেশে এসে এই লিবার্তে, ইগালিতে আর ফ্রাতারনিতের দেশে, যেখানে নারী পুরুষে ভেদ নেই, ধনী গরিবে ভেদ নেই, সেখানে এসে নীলার শ্রেণীবিদ্বেষী মন এমনই প্রকট হয়ে উঠেছে যে দাঁতকপাটি মেলে নীলার দিকে তেড়ে আসছে। ছি!
দানিয়েল, আমি জানি আমি অন্যায় করেছি। এরকম ভুল আর হবে না। আমাকে ক্ষমা করে দাও। বিনত স্বর নীলার।
দানিয়েল শোনে, শুনে স্বস্তি পায়।
দানিয়েলকে আরও স্বস্তি দিতে নীলা বলে, আমাদের পশ্চিমবঙ্গে তিরিশ বছর ধরে কোন দল ক্ষমতায়, জানো? কমুনিস্ট। জ্যোতি বসুর নাম শুনেছ? তাঁর মতো জনপ্রিয় নেতা ভারতবর্ষে আর একজনও নেই।
দানিয়েল হাঁটা বন্ধ করে দাঁড়ায়।
মুখ হাঁ।
চোখ হাঁ।
দম নাও মেয়ে, দম নাও। বানের জলে ভেসে এসেছি ঠিকই, সাম্যের অঞ্চল থেকেই এসেছি।
তিরিশ বছর? হাঁ মুখ থেকে বেরিয়ে আসে দুটো কেবল শব্দ আর সাদা ধোঁয়া।
হ্যাঁ তিরিশ বছর!
কেন?
কেন মানে, ভাল বলে। আমরা ভোট দিই বলে!
কমুনিস্টকে ভোট দাও?
নিশ্চয়ই।
ছি ছি।
দানিয়েল সারা পথ ছি ছি করল।
সারা পথ দানিয়েল বলতে বলতে এল, স্তালিন যত লোক খুন করেছে, হিটলার তার চেয়ে অনেক কম করেছে। বলতে বলতে এল, মার্কস ভুল, এঙ্গেলস ভুল। বলতে বলতে এল, লেনিন ছিল আপাদমস্তক ভণ্ড। আস্ত সন্ত্রাসী।
.
নেমন্তন্ন
নিকল নেমেরের বাড়িতে সন্ধেয় নেমন্তন্ন দানিয়েলের আর দানিয়েল যে ভারতীয় মেয়েটিকে আশ্রয় দিয়েছে, তার। নতুন এক পত্রিকার সাংবাদিকের সঙ্গে বিকেলে দানিয়েলের ক্যাফে কায়রোতে রাদেভুঁ, সেই রাদেভুঁতে যাবার আগে সে বলে যায় নীলা যেন নেমন্তন্নে যাবার জন্য তৈরি হয়ে থাকে, সন্ধে সাতটায়।
