দানিয়েল এসবকেও বলে, ইচ্ছে করেছে তাই করেছে।
কেন ইচ্ছে করেছে, জানার জন্য নীলার মন আঁকুপাকু করে।
সমাজের নিয়ম কানুন ওদের ভাল লাগে না, তাই করেছে। এক ধরনের প্রতিবাদ।
সমাজের অনেক নিয়ম নীলারও ভাল লাগে না। কিন্তু কখনও তার চুল রাঙানোর ইচ্ছে হয়নি। অত তাকত তার নেই। এত সুন্দর সুস্থ সমাজ এদের, এত চমৎকার নিয়ম কানুন, ভাল না লাগার মতো কী পেয়েছে রঙিনচুলো ছেলেমেয়েগুলো, জানার জন্য দানিয়েলের দিকে প্রশ্নচোখে তাকায় সে। দানিয়েলের দৃষ্টি তখন পমপিডুর উঁচু চুড়োয়, ওই চুড়ো থেকে প্যারিস দেখতে কেমন দেখায় তাই সে ভাবছে। নীলা এই এলাকায় আসেনি এর আগে। পমপিডু কি তেলের কারখানা? শুনে দানিয়েল এমন জোরে হাসে যে নীলা লজ্জায় মুখে হাত চাপা দেয়। হাসতে হাসতে দানিয়েল নীলার হাত ধরে ক্যাফে বো বোর ভেতর ঢোকে। ক্যাফেতে ভিড় উপচে পড়ছে, লোকের বসার জায়গা নেই, দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু আছে, বেরিয়ে যাচ্ছে না, দাঁড়িয়েই ওয়াইন পান করছে। দানিয়েলের পেছনে জড়সড় দাঁড়িয়ে নীলা দেখে, তার ঠিক পাশেই এমনিতে বাঁশের মতো লম্বা তার ওপর উঁচু জুতো পরে আরও লম্বা হওয়া একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে ওয়াইন খাচ্ছে, আর হেলেদুলে দুটো যুবকের সঙ্গে কথা বলছে। মেয়েটি বেশ সুন্দরী, পরনে লাল ফ্রক, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, জুতোর রংও লাল, মাথায় একটি টুপি পরা, সেটিও লাল। লাল ঠোঁটজোড়া পাখির ঠোঁটের মতো সরু করে যুবকদ্বয়ের একটিকে চুমু খায় মেয়েটি। চাপাচাপি ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছে বলেই চুমু খাওয়া বড় কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় নীলার। মেয়েটি যখন অন্য যুবকের ঠোঁটে চুমু খায়, দানিয়েলের কানে কানে বলে সে, দেখো দেখো, মেয়েটি দুটো যুবককেই চুমু খেয়েছে। কোনটি তার প্রেমিক তবে?
দানিয়েল নিস্পৃহ কণ্ঠে বলে, ও মেয়ে নয়। ও ছেলে।
নীলা অনেকক্ষণ কোনও শব্দ পায় না উচ্চারণ করার।
ছেলে হলে, মেয়ের মতো সেজেছে কেন?
ইচ্ছে, তাই।
ঠিক আছে, নীলা মেনে নিল ও ছেলে, কিন্তু সে ছেলেদের চুমু খাবে কেন?
নীলার গা শিউরে ওঠে যখন দানিয়েল বলে, ওরা সমকামী।
জীবনে এই প্রথম নীলার কোনও সমকামী দেখা। যখন যাকে জড়িয়ে ধরতে বা চুমু খেতে ইচ্ছে, এরা খায়। যখন যে পোশাক পরতে ইচ্ছে করে, এরা পরে। মানুষের এই অবাধ স্বাধীনতা নীলাকে মোহিত করে।
বসার জায়গা জোটে, ওয়াইনও আসে। দানিয়েল খেয়ে যায়, নীলা হঠাৎ হঠাৎ এক কি দু চুমুক।
কী ব্যাপার খাচ্ছ না যে!
ওয়াইন খেয়ে আমার অভ্যেস নেই।
অভ্যেস নেই? তোমাদের দেশের লোকেরা কী পান করে তবে?
হুইস্কি।
ও তো খাবারের আগে খেতে হয়। খাবার খেতে গিয়ে কী পান করো?
জল।
তোমার দেশের আর লোকেরা?
সবাই জল।
সবাই জল?
হ্যাঁ সবাই জল।
.
সবাই জল হলেও নীলা একটু একটু করে খেতে শিখছে ওয়াইন। একটি ব্যাপার সে চোখ কান নাক খুলে লক্ষ করে, সকাল সন্ধে ওয়াইন পান করা ফরাসিদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। কলকাতায় সে দেখেছে, লোকেরা মদ কিনে কাগজে মুড়িয়ে নেয়, যেন বাইরে থেকে দেখে কেউ বুঝতে না পারে বোতলটি মদের, যেন ভাবা হয় তেলের বা ফলের রসের বা ওষুধের বোতল। নিখিল যখন মদ খায়, নিজের ঘরে বসে খায়, ভেতর থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে, তবে। বাড়িতে অতিথি এলে মুখ সাতবার ধুয়ে মদের গন্ধ দূর করে তবে অতিথির সামনে আসে। মলিনা চিরকালই জানে, মদ খায় মন্দ লোকে। নীলাও তাই জানত, কিন্তু সুশান্তকে যখন মদ খেতে দেখল দু একদিন, মন্দ লোকে মদ খায় এ ধারণাটি দূর হল বটে, কিন্তু খেলে সুশান্তর মতো লুকিয়ে চুরিয়ে খাওয়াই নীলা মনে করত শোভন। এখন, এই আশ্চর্য স্বাধীন শহরে এসে নীলার বোধোদয় হয়, যদি কিছু করিই, তবে লুকিয়ে কেন গো! এ শহরে সে আরও লক্ষ করে, মদ না খাওয়াই বরং অন্যায়। লোকে খারাপ চোখে দেখে, ভাবে এর বুঝি কোনও সংস্কৃতি নেই, এসেছে কোনও ঝোপ জঙ্গল থেকে।
যেহেতু স্পাগেটি জিনিসটি নীলার পেটে ঢোকেনি, নীলা ক্যাফে বো বো-তে, মাংস খাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে, গোরু খাবে না, ভেড়ায় গন্ধ, গ্রিল করা মুরগি আছে, চলবে? চলবে। এর সঙ্গে পান করবে কী? কোকোকোলা। কোকোকোলা? বো বো-র যে লোক খাবার দিয়ে যায়, সে হেসে কুটিকুটি। এ কোন আজব জীব এসেছে, যে মাংসের সঙ্গে কোকোকোলা পান করে। নীলা লক্ষ করে লজ্জায় দানিয়েলের মাথা নিচু হচ্ছে।
এ লজ্জা। এ স্রেফ লজ্জা। ওয়াইন না খাওয়া। এ অন্যায়।
নীলা সিদ্ধান্ত নেয়, ওয়াইন পান করা দ্রুত করতে হবে তার, এই লজ্জা থেকে বাঁচতে তাকে হবেই।
বো বো থেকে বেরিয়ে নীলাকে আরও এক ক্যাফেতে নিয়ে গেল দানিয়েল, ওখান থেকে এক আইরিশ পাবে, আইরিশ পাব থেকে ডিসকোটেকে, আলো নিবছে জ্বলছে আর বিষম জোরে গান বাজছে, তালে তালে লোকেরা নাচছে। দানিয়েল ধুন্ধুমার উল্লাসে নীলার হাত ধরে টানে, চলো নাচব। নীলা না না করে ওঠে, সে যাবে না, সে নাচতে জানে না।
নাচতে না জানাও সে লক্ষ করে বিষম লজ্জার ব্যাপার। এক আজব জীবেরাই নাচতে জানে না। নাচ বলতে এখানে, নীলা লক্ষ করে সুরের তালে গা নাড়ানো। কেউ পা নাড়ছে, কেউ হাত, কেউ পিঠ, কেউ মাথা, কারও সঙ্গে কারও মিলছে না, তালে তালে শরীরের কিছু একটা নাড়ানোই নাচ।
