দানিয়েলের আট বর্গমিটার জায়গার ঘরটিতে একটি বিছানা, একটি টেবিল, তার ওপর ছোট একটি কম্পিউটার, এক কোণে ছোট একটি রেফ্রিজারেটর, তার ওপর একটি চুলো, চুলোর পাশে জলের কল, বেসিন, দেয়ালে বইয়ের তাক, বইয়ের ঘাড়ে বই, মাথায় বই আর একটি হাতলঅলা চেয়ার, একটিই চেয়ার।
আমার কিন্তু একটি বিছানা। দুটো বিছানা পাতার জায়গাও নেই। আর আমার দুটো তোশক নেই, দুটো লেপও নেই যে মেঝেয় বিছানা পাতব!
চাপাচাপি করে শোয়া যাবে, যাবে না। নিশ্চয়ই যাবে। নীলা বলে।
চাপাচাপি করে নীলা আগে অনেক শুয়েছে। গ্রামের কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে বিয়ে হলে শহর থেকে রাজ্যির লোক নেমন্তন্নে যায়, বিয়েবাড়ির মেঝেতে টানা বিছানা পেতে সাত আটজন করে ঘুমোয় রাত্তিরে। অভ্যেস যে তার একবারেই নেই, তা নয়। আর বালিগঞ্জের বাড়িতেও কোনও মাসি বা পিসি এলে তার বিছানাতেই শোবার জায়গা করা হত। মাসি পিসিদের গায়ে গা ঘেঁসে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেতে তার আনন্দও তো কম হয়নি, মঞ্জুষামাসির গা কাঁটা দেওয়া ভূতের গল্প তার এখনও মনে আছে।
রাতে, দানিয়েল বলল নীলাকে খুব ভাল এক রেস্তোরাঁয় খাওয়াবে।
তাহলে আমি ড্রেস পরে নিই কী বলো!
দানিয়েল দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। নীলা পরনের কাপড় পালটে নীল জিনসের সঙ্গে লাল একটি শার্ট পরল, আর ওপরে জিনসের জ্যাকেট। হয়ে গেছে জানালে দানিয়েল ঘরে ঢুকে চোখ কপালে তুলল, কই তুমি না ড্রেস পরবে বললে।
তা তো পরলামই। নীলা হেসে বলে।
এ তো জিনস পরলে। ড্রেস তো পরলে না!
নীলা ঠিক বুঝে পেল না দানিয়েল কী বলতে চাচ্ছে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় দাঁড়িয়ে চিকন গলায় বলে, দেখতে কি খুব খারাপ লাগছে?
রায় দিয়ে দিলে, মোটে তাকে দেখতে খারাপ লাগছে না। বাইরের হাওয়ায় এসে নীলার ধিন তা তা ধিন তা তা ছন্দ ওঠে শরীরে। এমন সুখ তার প্যারিসে হয়নি কখনও, নিজেকে কখনও সে এত স্বাধীনতা পেতে দেখেনি। শুন্যে দু হাত ছুঁড়ে বলে, ভারতের দাসী পোষার শখ হয়েছিল কিষানলালের! কোথায় তোমার সেই দাসী এখন, কিষানবাবু?
সখেদে বলে, আহা আরও আগে কেন পায়ের শেকল ছিঁড়িনি।
দু বাহুতে দানিয়েলকে জড়িয়ে সে সুখোচিৎকার করে, তুমি আমাকে বাঁচালে।
তুমি একদিন না একদিন ওখান থেকে বেরোতেই নীলা। ওভাবে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে নাকি!
নীলা প্রাণ খুলে হাসে। তাকে হাসিতে পায়। তাকে খুশিতে পায়। তার সারা শরীরে আনন্দ। সারা মনে স্ফুর্তি। রাতের রাস্তায় ছেলে মেয়েরা আনন্দ করতে নামে, নীলা দেখেছে। রাত বলে, অন্ধকার বলে যে কিছু নেই সে দেখেছে। তার সামনে আলোয় ঝলমল একটি জগৎ। এই জগতের প্রতি তীব্র আকর্ষণে নীলা লক্ষ করে গা কাঁপছে তার। দানিয়েলের কাঁধে হাত রেখে নীলা হাঁটে, নীলা হাঁটে না তো নীলা ওড়ে। দানিয়েলের হাত টেনে নেয়, হাতে হাত রেখে হাঁটে, আর সব মুক্ত মানুষের মতো হাঁটে। নীলা হাঁটে না তো নীলা ওড়ে।
কী যে ভাল লাগছে তোমাকে দেখে নীলা। এ সত্যিকার তুমি। এ তুমি। মাদাম কিষানলালের মুখোশ পরিয়ে তোমার ভেতরের তুমিকে আড়াল করে রাখা হয়েছিল। আর এখন, দেখো কী জীবন্ত তুমি! কী অসম্ভব সুন্দর তুমি! দেখো, দুশ্চিন্তার লেশমাত্র নেই তোমার মুখে। গোপন কোনও কষ্ট লুকিয়ে রাখার কোনও চিহ্ন নেই কোথাও। এ তুমি অন্যরকম। দানিয়েল মুগ্ধ চোখে নীলাকে দেখে আর বলে। নীলার হাতের মুঠোর ভেতর ওর হাতখানা কাঁপে, ঘামে।
.
শাতলের ক্যাফে জিমমারে ঢুকে দানিয়েল মেনু খুঁটিয়ে পড়ে স্পাগেটি বোলোনেস আর আর লাল ওয়াইন চাইল। মেনুতে স্যান্ডুইচ ছাড়া আর বাকি খাবার যেহেতু জানে না কী, দানিয়েলকেই বলল নীলা, তার জন্য একটি বেছে দিতে। একই খাবার হোক না, স্পাগেটি বোলোনেস।
ওয়াইন কোনটা নেবে সাদা না লাল? অবশ্য, দানিয়েলের মতে, এ খাবারের সঙ্গে লালই যায়।
লালই যায় তো লালই।
কাঁটা চামচে স্পাগেটি যতবারই তুলতে নেয় নীলা, পিছলে পড়ে যায়। হাল ছেড়ে দেয় সে, স্পাগেটি কাঁটায় তোলাও অসম্ভব আর মুখে নিলেও আটাগোলার স্বাদ। বরং সে জমজমাট ক্যাফের ভেতরের মানুষ দেখে, পাশের টেবিলে একটি একুশ বাইশ বছর বয়সি ছেলেকে দেখে, ছেলেটির কানে দুল, ছেলেটির সঙ্গে যে মেয়ে তার কানে তো আছেই, একটি নয়, এক কানেই ছটি, নাকেও, কেবল নাকে নয়, চোখের ভুরুতে, ঠোঁটে, আর মেয়েটি হা হা করে হেসে উঠলে নীলা দেখে, মেয়েটির জিভে দুল।
এ কী কাণ্ড, মেয়েটির চোখের ভুরু ফুটো করেছে? ঠোঁট, জিভ?
ঘটনাটি যেন ডাল ভাত, দানিয়েল বলে, হ্যাঁ করেছে, ইচ্ছে করেছে তাই করেছে।
নীলা ভাবে, এরা ইচ্ছে যা করে, তাই করতে পারে। আর সে, নিজের জীবনের কথা খানিক ভাবে, ইচ্ছে যা করে, তা কখনই করতে পারেনি। করলে, বলা হত, যাচ্ছেতাই কাণ্ড করছে। শার্ট প্যান্ট পরে বাড়ি থেকে বেরোতে গেলেই অনির্বাণ তেড়ে আসতেন, কী পরেছিস কী! রাস্তায় তো লোকেরা ঢিল ছুড়বে। ঢিল থেকে বাঁচার কারণেই হোক, আর অনির্বাণের আদেশেই হোক নীলাকে পুরুষের পোশাক খুলে মেয়েদের পোশাক পরতে হত, সালোয়ার কামিজ নয়তো শাড়ি।
ক্যাফে জিমমার থেকে বেরিয়ে লে আলের দিকে হেঁটে যেতে যেতে নীলা দেখে কিছু ছেলে মেয়ের চুল খাড়া হয়ে আছে ওপরের দিকে, মোরগের ঝুঁটির মতো, শজারুর কাঁটার মতো। চুলগুলো কালো নয়, বাদামি নয়, লাল নয়, সোনালি নয়, রাঙিয়ে হলুদ করেছে, সবুজ করেছে, গোলাপি করেছে। ও মা কী কাণ্ড।
