নীলা নীরব থাকে।
নীরবতা ভাঙে সুনীল, বলে, এরকমও হয়, এখানকার বাঙালির বাচ্চাদের ও বাংলা শেখাল, ঘরেই একটা ইস্কুল খুলে নিতে পারে।
কিষান ঠোঁট বাঁকায়, বলো যে সরবনে বাংলার প্রফেসর হতে। এত কি সোজা এসব নাকি! একটা রেস্তোরাঁ খুলতে আমাকে বারো বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।
লীলা বলে, তোমার মতো গাধার তো বারো বছর লাগবেই। বাংলায় বলে।
যেন কিষান বলে কেউ এখানে উপস্থিত নেই, যেন মান সম্মান ফিরে পেতে কিষান, তার স্বামী কোনও জরুরি বৈঠকে বসেনি, নীলা সুনীলের দিকে মুখ করে বলে যায়, প্যারিসের ক্যাফে সংস্কৃতি আমাকে খুব মুগ্ধ করেছে। লোকেরা বসে আছে, খবরের কাগজ পড়ছে, বই পড়ছে, লিখছে, আবার সাহিত্যের আসরও বসছে ক্যাফেতে, কী চমৎকার তাই না? আচ্ছা, জঁ পল সার্ত্র নাকি ক্যাফে দ্য ফ্লোরে আড্ডা দিতেন, সিমোন দ্য বোভোয়াও? নতরদামের উলটোদিকে একটা বইয়ের দোকান আছে না, শেকসপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি! ওখান থেকে জেমস জয়েসের ইউলিসিস প্রথম বেরিয়েছে, জানেন সুনীলদা?
জেমস জয়েস কে? কিষান নীলাকে নয়, শুধোয় সুনীলকে।
নীলা উত্তর দেয়, আইরিশ লেখক।
কলকল করে বইছে নীলা, হেমিংওয়েও আড্ডা দিতেন বইয়ের দোকানটায়। টাকা ছিল না বলে দোকানটি থেকে পড়ার জন্য বই ধার নিতেন।
বলে নীলার আশঙ্কা হয় কিষান জিজ্ঞেস করবে, হেমিংওয়ে কে? ভাল যে করেনি, কারণ নীলা মনে একটি উত্তর তৈরি করেছিল ওই প্রশ্নের, হেমিংওয়ে আমার পিসতুতো দাদা হয় গো পিসতুতো দাদা।
সে রাতের বৈঠকে কিছু এগোল না। নীলার ব্যাপারটি অমীমাংসিত রেখেই সুনীল পুজোর চাঁদা নিয়ে পড়ল। ট্রেতে করে চা বিস্কুট আনল নীলা। চা খেতে খেতে সুনীলকে সেই বাঙালি লোকটির কথা জিজ্ঞেস করল, যার যাবার কথা ছিল কলকাতা। সেই লোক কলকাতা পৌঁছেছে, সেই লোক নীলার বাড়িতে শ্যানেল পৌঁছেও দিয়েছে, সেই লোক ফিরেও আসবে শিগরি। সেই লোক আবার কবে যাবে, নীলা জানতে উৎসুক। সেই লোক এ বছর আর যাবে না তবে এ বছর কে যাবে কলকাতা? এ বছর সুনীল নিজেই যাবে, পুজোর পর। আর নীলা কোন বছর যাবে? নীলা কোন বছর যাবে, সে কিষান জানবে।
রাতে ঘুমিয়েপড়া নীলাকে জাগায় কিষান, জামার বোতাম খুলতে মোটা লোমশ হাত বাড়ায়। নীলা সরিয়ে দেয় কিষানের হাত। কিষান শক্ত হাতে নীলার হাত চেপে চাপা কণ্ঠে বলে, আমি একটা বাচ্চা চাই নীলা।
নীলা বলে, আমাকে ঘুমোতে দাও।
প্রায় সে বলতে নিচ্ছিল, কেন, ইমানুয়েল তোমাকে বাচ্চা দেয়নি? কিন্তু উচ্চারণ করে না ও নামটি। করলেই, নীলার আশঙ্কা হয়, কিষান সুশান্তর প্রসঙ্গ ওঠাবে। শুয়েছে কিনা সুশান্তর সঙ্গে। হ্যাঁ শুয়েছে। নীলা নিজে কুমারী নয় বলে যে নিজেকে তার অপরাধী মনে হত, ইমানুয়েলের ঘটনা জানার পর তার সে বোধটুকু নেই, সেই অপরাধবোধ। নীলা বরং অনেক স্বস্তি বোধ করে আগের চেয়ে। ইমানুয়েল তাকে একরকম বাঁচিয়েছে।
.
১৪.
চাকরি করতে গিয়ে নীলা দেখে বেশির ভাগই কালো, বাদামি আর হলুদ রঙের লোক বাক্সবন্দির কাজ করে। হাতে গোনা কজন কেবল সাদা। প্রথম দিনই মসিয়ে গিগু নীলাকে কী কাজ করতে হবে এবং কী করে, তার নিখুঁত বর্ণনা করলেন ফরাসি ভাষায়। নীলা মসিয়ে গিগুর কথা পুরোটাই শুনে গেছে একটি অক্ষর না বুঝে। গিগু ঘর থেকে বেরোলে ওই হাতে গোনা সাদার দল থেকে একটি মেয়ে, দানিয়েল, এগিয়ে এসে নীলাকে জিজ্ঞেস করে কিছু বুঝলে, কী বলে গেল?
নীলা মুখ মলিন করে বসেছিল। কিছুই বোঝেনি সে।
দানিয়েলে বুঝিয়ে বলল।
সেই থেকে দানিয়েলই ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে দেয়, যা কিছু বেরোয় গিগুর মুখ থেকে।
সেই থেকে দানিয়েলই নীলাকে চা খেতে নিয়ে যায় কাছের ক্যাফেতে।
সেই থেকে দানিয়েলকেই অল্প অল্প করে নীলা তার প্যারিসে আসার গল্প করে, কিষানের সঙ্গে তার জীবনযাপনের গল্প করে।
ক্যাথারিন, আরেকটি সাদা মেয়ে, ভাঙা ইংরেজিতে একদিন বলে, তুমি ভারত থেকে এসেছ তাই না?
নীলা হ্যাঁ বলার আগেই ক্যাথারিন বলেছে কিছু টাকা জমলেই সে ভারত যাবে। এই বাক্সবন্দির কাজ করে সে যা পায় তা জমিয়ে দূরের কোনও দেশে চলে যায়। গত বছর গিয়েছিল মালটায়। তার আগের বছর মার্টিনিতে। ক্যাথারিন কলেজ দ্য ফ্রান্সে ইন্ডোলজি পড়েছে, তার থিসিসের বিষয় বাউল। থিসিস লেখার শুরুতে, সে পশ্চিমবঙ্গের অজ পাড়াগাঁয়ে এক বাউলের বাড়ি মাস দুয়েক থেকেও এসেছে। থিসিস তার এখনও জমা দেওয়া হয়নি, আবার সে যাবে, সেই গ্রামে।
বাউলের প্রসঙ্গ আনায় ক্যাথারিনকে মুহূর্তে খুব আপন মনে হয় নীলার। সেদিন দুপুরে একসঙ্গে ব্রাসারিতে খেতে গেল দুজন। খেতে খেতে ক্যাথারিন বর্ণনা করল, কী করে সে হাতে ভাত খেয়েছে বাউলের বাড়িতে, কী করে মাইলের পর মাইল হেঁটেছে কাদাজলে। না কলকাতায় সে থাকেনি, ইচ্ছেও করেনি, ওই গ্রামে গ্রামে বাউলের জীবন দেখতেই তার ভাল লেগেছে। আর সবচেয়ে ভাল লেগেছে যা, যা সে নিয়েও এসেছে একগাদা, তা হল…
নীলার মুখে খাবার, শুনবে বলে সে চিবোনো বন্ধ রাখল।
বিড়ি।
নীলা অনেকক্ষণ ভুলে ছিল মুখের খাবার চিবোতে।
খাওয়া শেষ করে ক্যাথারিন তার পকেট থেকে খুব যত্ন করে একটি বিড়ির প্যাকেট বের করে, দু আঙুলে আরও যত্ন করে একটি বিড়ি তুলে নিয়ে, টানে।
