নীলা তার জীবনে কখনও এত কাছ থেকে বিড়ির গন্ধ পায়নি আগে। বিড়ি খাওয়া দেখেছে দূর থেকে, রাস্তার শ্রমিক বা ভিখিরিদের। আগে নীলার এমন জানাও ছিল না যে কোনও গন্ধ এত বিশ্রী হতে পারে।
বিড়ির সৌন্দর্য এবং স্বাদ যে অকল্পনীয় রকমের ভাল, ক্যাথারিন তা হাত পা মুখ মাথা নেড়ে বোঝাতে থাকে আর নীলা নির্বাক বসে বিড়ির বিশ্রী গন্ধ সইতে সইতে শুনতে থাকে এর অসামান্য গুণের কথা।
নীলা সেই বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে দানিয়েল আর ক্যাথারিনের সঙ্গে কারখানার পাশেই এক ক্যাফেতে ঢুকল। ওরা কফি খাবে, নীলা চা। চা কফি এলে নীলা বলে, চলো চেয়ার খালি আছে বসি গিয়ে।
দানিয়েল বলল, না এ দাঁড়িয়ে খাবার চা কফি।
নীলা জানত না, ক্যাফেতে তিন রকম দাম আছে খাবারের। ধরা যাক চা, দাঁড়িয়ে খেলে সাত ফ্রাঁ, বসে খেলে আঠারো ফ্রাঁ, আর বাইরের তেরাসে বসে খেলে তিরিশ ফ্রাঁ। দানিয়েল কাগজে তামাক মুড়ে সিগারেট বানায়। সিগারেট ফুঁকে ছাই ফেলে মেঝেয়। এও নাকি নিয়ম, কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কফি খাওয়া লোকেরা কোনও ছাইদানি পাবে না সামনে, যা ফেলবে মেঝেয়।
তোমরা বাঙালি খাবার পছন্দ করো। নীলা জিজ্ঞেস করে।
নিশ্চয়ই। ক্যাথারিন বলে।
দানিয়েল খায়নি কোনওদিন বাঙালি খাবার। লাফিয়ে ওঠে সে প্রস্তাব শুনে।
নীলা ওই তখনই চা খেতে খেতে ক্যাফেতে, নেমন্তন্ন করে বসে দুজনকে। আগামীকাল সপ্তাহের মাইনে নেবে সে, নিয়ে সোজা বাড়ি, বাড়িতে রান্না করবে, কাজ শেষে দানিয়েল আর ক্যাথারিন সন্ধের দিকে চলে যাবে নীলার বাড়িতে, এরকম কথা হল। নীলা ঠিকানা আর ফোন নম্বর লিখে দিল।
পরদিন ঠিক ঠিক তাই করল নীলা। বেলভিল থেকে মাছ মাংস কিনে বাড়ি ফিরল। সারা বিকেল রান্না করল।
সন্ধেয় দানিয়েল আর ক্যাথারিন দুজনই এল। দানিয়েল ওয়াইন এনেছে দু বোতল।
টেবিলে ন’রকমের খাবার এনে রাখল যখন নীলা, দানিয়েল আর ক্যাথারিন দুজনই প্রথম উ লা লা, উ লা লা করল, তারপর মনে তাদের প্রশ্ন, নীলা আর কাকে কাকে নেমন্তন্ন করেছে। আর কাউকে না, কেবল ওদের দুজনকেই। দানিয়েল আর ক্যাথারিন পরস্পরের দিকে চেয়ে বিস্ময় বিনিময় করল।
নীলা, তোমার মাথার ঠিক আছে তো!
নীলা বলল, না ঠিক নেই। তার মন খারাপ।
কেন খারাপ।
আরও দুটো পদ রান্না করতে চেয়েছিল, কিন্তু সময়ের অভাবে হল না।
দানিয়েল ওয়াইন খুলে তিনটে গেলাসে ঢালল।
সঁতে।
বোনা পিতি।
নীলা ওদের থালায় খাবার বেড়ে দিল। কিন্তু নীলার পরিবেশন ওদের ঠিক মনমতো হয় না। নীলা দিতে চায়, প্রথম শাক ভাত, শাক শেষ হলে দিতে চায় নিরামিষ, নিরামিষ ফুরোলে মাছ ভাজা, তারপর মাছের ঝোল, তারপর মাংস…কারণ আলাদা আলাদা করে খেলে সব কিছুর আলাদা স্বাদ পাওয়া যায়, এ যুক্তি দানিয়েলের পছন্দ হয় না, একবারেই সে ন’পদের কিছু কিছুটা করে নিজের থালায় নেয়। বিয়েবাড়ির রেখে দেওয়া থালার খাবার ছুড়ে ফেললে ঠিক এরকমই জগাখিচুড়ি দেখতে লাগে, দেখে নীলার অস্বস্তি হয়। তার ধারণা, ওরা মোটেও এক একেকটি পদের স্বাদ আলাদা করে পাচ্ছে না। মাছ ভাজার সঙ্গে মাংসের ঝোল মেলাচ্ছে। নীলা আহা আহা করে ওঠে, তার আহা আহা বোঝা ওদের পক্ষে সম্ভব হয় না। খেতে খেতে দানিয়েল আর ক্যাথারিন উমমম উমমম শব্দ করে। এই শব্দের অর্থ, খুব স্বাদ।
মাছের ঝোল মুখে পড়তে দানিয়েলের চোখ মুখ কান লাল হয়ে ওঠে। ক্যাথারিন বাউলের বাড়িতে ঝাল খেয়েছে, সুতরাং তার, সে বলল, অসুবিধে হচ্ছে না। দানিয়েল ঝালের তরকারি ফেলে দিয়ে অঝালের দিকে মন দিল। খেতে খেতে দানিয়েল বারবারই বলল, ক্যাথারিনও, কখনও তারা এত পদ দিয়ে খায়নি।
কলকাতায় লোককে নেমন্তন্ন করলে আমরা তো এরকমই করি, এ এমন কোনও আহামরি ব্যাপার নয়।
অতিথির থালায় মাছের টুকরা শেষ হতে, আরেকটি টুকরো তুলে দেয় নীলা। আরেক চামচ ভাত। আরও একটু মাংস নাও। ওরা না বলে। তারপরও নীলা, হাতের ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে দেয়। ওরা অতিথি, ওরা তো না বলবেই, কিন্তু দিতে তো হবে। এরকম নিয়ম, এরকম নিয়ম দেখেই নীলা বড় হয়েছে কলকাতায়। দানিয়েল হেসে বলে, আশ্চর্য, তুমি ঠাকুরমাদের মতো করছ কেন!
ঠাকুরমার মতো নয়। নীলা ওদের বোঝাতে পারে না অতিথি হল নারায়ণ, অতিথি হল ভগবান, বাঙালির বিশ্বাস এই। ভগবান না মানলেও বাঙালি অতিথি মানে। বাঙালির ঘরে অতিথি এলে সবচেয়ে বড় আসনটি দেওয়া হয়, বড় বিছানাটি দেওয়া হয়, সবচেয়ে ভাল খাবারের আয়োজন করা হয়। ভালবাসি, এ কথাটি মুখে বলা শক্ত বাঙালির পক্ষে, খাইয়ে এবং দিয়ে ভালবাসা বোঝায় বাঙালি।
.
দানিয়েল আর ক্যাথারিন খেতে খেতে ওয়াইন পান করে, নীলা ওয়াইনে এক কি দু চুমুক দিয়েই রেখে দেয়। ওয়াইনে ওর অভ্যেস নেই।
মহাভোজ তখনও শেষ হয়নি, অতিথিরা বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে খাচ্ছে, খাওয়া স্থগিত রেখে দুবার সিগারেট ফুঁকেছে দানিয়েল, ক্যাথারিন বিড়ি, এর মধ্যে কিষান এল। এক বোতল দুধের মধ্যে দুফোঁটা চোনা।
দানিয়েল আর ক্যাথারিন দুজনই বঁজু বলল, কিয়ান বঁজু বলে শোবার ঘরে চলে গেল।
এই বুঝি তোমার স্বামী!
নীলা মাথা নাড়ে, এই তার স্বামী।
নীলা ফ্যাকাশে মুখে শোবার ঘরে এসে গলা চেপে বলল, তুমি এমন কথা না বলে চলে এলে যে ওরা কী মনে করবে বলো তো।
