.
১৩.
কম্পিউটার বাক্সবন্দি করার চাকরি পেল নীলা। সপ্তাহে দেড় হাজার ফ্রাঁ। এই বা কম কীসে, নীলার কাছে এ অনেক। সকালে কিষান যখন ঘুম থেকে ওঠে, পেছন পেছন নীলাও ওঠে, কিষানের মতো নীলাও বাইরে বেরোয়, কিষান গাড়িতে, নীলা মেট্রোয়, গার্দ দ্য নর্দ থেকে দু নম্বর লাইন ধরে বেলভিল, বেলভিল থেকে এগারো নম্বরে উঠে মেট্রো টেলিগ্রাফ। মেট্রো থেকে নেমে রু পেলপোর্ত ধরে হাঁটলেই রাস্তার ওপর কারখানা। চাকরিতে ঢুকেছে এই খবরটি নীলা প্রথম দেয়নি কিষানকে। বাড়িতে কুরুক্ষেত্র বাধাক কিষান, সে চায়নি।
কিষান চণ্ডিগড়ের লোক, কুরুক্ষেত্রেই জন্ম, রক্তের টান বলে কথা। পাণ্ডবে কৌরবে যুদ্ধ বেধে গেল, আর কিষান তো ভগবানেরই সন্তান, ফাঁক পেলেই কৃষ্ণনাম জপে। নীলাকে বেশ অনেকদিন বলেছে, জন্মাষ্টমীর আগে আগে তাকে নিয়ে সে চণ্ডিগড় যাবে, কী ঘটা করেই যে কৃষ্ণের জন্ম উৎসব হয় চণ্ডিগড়ে তাকে দেখাবে সে। হোলি উৎসবও দেখাবে, রঙে ডুবতে চাইলে নীলাকে এমন রঙে ডোবাতে পারে কিষান যে নীলার জীবন ফুরিয়ে যেতে পারে কিন্তু রং ফুরোবে না। নীলা প্যারিসের স্থাপত্য দেখে হাঁ হয়েছে আর কত, চণ্ডীগড় দেখলেও তেমনই হবে, চণ্ডীগড় তো ফরাসি স্থপতি লা করবুসিয়ের করা। মসিয়ে হুসমান থেকে করবুসিয়ে কম কীসে! জারদা দ্য লুক্সেমবার্গ বা জারদা দ্য প্লানত দেখে নীলা উচ্ছ্বসিত হয়, চণ্ডিগড়ের পিঞ্জরবাগান, শুখনালেক, শান্তিকুঞ্জ দেখলেও কম হবে না। কিষানের বর্ণনাতেও নীলা আগ্রহ দেখায়নি চণ্ডিগড় যেতে। কলকাতায় বিয়ের অনুষ্ঠানে নীলা চণ্ডিগড় থেকে আসা কিষানের যে কজন আত্মীয়কে দেখেছে, তাতে তার মনে হয়নি চণ্ডিগড়ে এদের সঙ্গ সে সামান্যও উপভোগ করবে।
খবর লুকিয়ে রাখা যায় না। কিষান জেনে যায় নীলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোনও এক বাক্সবন্দির দোকানে কাজ করে। যেদিন জানল কিষান, সেদিনই বাড়িতে ডাকল সুনীলকে।
সুনীল বাড়ি ঢুকে এ ঘর ও ঘর হেঁটে কিষানের মুখোমুখি বসে বলল, কী ব্যাপার, জরুরি তলব কেন, হয়েছে কী?
নীলা ফরাসি ভাষা শেখার বই পড়ছিল শুয়ে। সুনীলকে দেখে বই রেখে, ক্যাসেটেও বাজছিল ফরাসি উচ্চারণ শেখানো, বন্ধ করে, উঠে এল।
বাহ্, ভদ্রলোক কি পথ ভুলে? নীলার মুখে মিষ্টি হাসি।
সুনীলের গম্ভীর মুখ, উত্তর নেই। তলবের কারণ সে তখনও বুঝে উঠতে পারছে না।
এ কেমন মেয়ে তুমি বিয়ে করালে সুনীল, এ তো কথা শোনে না, যা ইচ্ছে, তাই করছে। অভিবাদনের আগে আগে অভিযোগ জানায় কিষান। নীলা সোফায় নয়, খাবার টেবিলের একটি চেয়ার টেনে সামনে বসে।
কী করছে? ঘটকচূড়ামণি এখন বিচারকের আসনে।
ওকেই জিজ্ঞেস করো কী করছে। কিষান কাটা দাগের থুতনি তুলে নীলাকে দেখায়।
সুনীল মুখ খোলার আগেই নীলা বলে, খারাপ কিছু করছি না।
কত বড় স্পর্ধা দেখো আমাকে না জিজ্ঞেস করে ও নিজে চাকরি নিয়েছে।
তাই নাকি? সুনীল সুতীক্ষ্ণ চোখে তাকায় নীলার দিকে জানতে যে কিষান যা বলছে তা সত্যি কি না, নীলা সত্যি সত্যি কিষানকে না জানিয়ে কোনও চাকরি নিয়েছে কি না।
নীলা মাথা নাড়ে, নিয়েছে।
কত ফ্রাঁ পায় ওখানে, ও কটা ফ্রাঁ কি আমার কাছে চাইলে পারে না? ওর জন্য ঘর সংসার ফেলে এভাবে আজেবাজে যতসব কালো লোকদের সঙ্গে কাজ করতে হবে! কিষান এক দমে বলে নিয়ে দম ছাড়ে, সেই ছাড়া দমের সঙ্গে সঙ্গে পেটের তেল চায় শার্টের বোতাম ফেটে বেরোতে।
তুমি বুঝি সাদা? বলে নীলা রান্নাঘরে চপ্পলের চটাস চটাস শব্দ তুলে গেল চায়ের জল চড়াতে।
আমার মান সম্মান সব গেল সুনীল। কিষান বড় শ্বাস ফেলে।
সামনে মদ নেই। টেলিভিশন খোলা নেই। শুকনো স্তব্ধতা সামনে নিয়ে দুজন বসে থাকে।
অনেকক্ষণ বাদে কিষান মলিন স্বরে বলে, সুনীল কিছু বলছ না যে! এর তো একটা বিহিত করতে হবে।
সাদা দেয়ালের দিকে উদাস তাকিয়ে সুনীল বলে, আমি কী বলব, তোমরা স্বামী স্ত্রী, তোমরা এর মীমাংসা করো।
ওকে চাকরি ছাড়তে বলো। কিষানের গলায় বাঘের জোর। অস্থির আঙুলগুলো মুঠোর ভেতর।
এবার দেয়াল থেকে চোখ সরিয়ে সুনীল কিষানে চোখ ফেলে, আমি বলব কেন, তুমি বলো।
খানিক বিরতি দিয়ে সুনীল থেমে থেমে বলে, বিদেশ বিভুঁয়ে আমার মনে হয় দুজনের কাজ করাই ভাল, একজনের টাকায় তো পোষায়ও না। আমি আর চৈতালি দুজন চাকরি করছি, আমাদের বেশ ভাল চলে যায়। তুমি যদি মনে করো, তোমার টাকা পয়সা খুব বেশি…বউকে পালঙ্কে শুইয়ে রাখবে, সে তোমার ব্যাপার।
কিষান উঠে এক গেলাস জল খায়, আবার ফিরে আসে সোফায়, বলতে বলতে যে হ্যাঁ আমি জানি, দুজনের উপার্জন করা ভাল। এতে সংসারে সচ্ছলতা আসে। কিন্তু কী কাজ ওর করতে হবে, কী করলে ভাল, কী করলে মান সম্মানও থাকে, টাকা পয়সাও আসে, তা আমার চেয়ে ও ভাল বুঝবে?
সুনীল মাথা নাড়ে, না, নীলা কিষানের চেয়ে ভাল বুঝবে না।
সুনীলের এমন গম্ভীর মুখ নীলা এর আগে দেখেনি, যে ভাষায় বৈঠক চলছে, ইংরেজি, সে ভাষাতেই বলে সুনীল, তুমি যা করবে কিষানের সঙ্গে পরামর্শ করে করো। ও তোমার স্বামী, ও তো তোমার কোনও খারাপ চায় না।
দুজনে নীলার উত্তর আশা করছে, আশা করছে নীলা বলবে যে ঠিক আছে, মেনে নিচ্ছি, অন্যায় করেছি, কাল থেকে ওই চাকরিতে আমি আর যাচ্ছি না। এখন থেকে আমার স্বামীর আদেশ মতো চলব। ও যেদিন চাকরি করতে বলবে, সেদিন করব। যে চাকরি করতে বলে, সে চাকরি করব, কারণ ও আমার চেয়ে ভাল বোঝে কোন চাকরি ভাল, কোন চাকরি মন্দ। আমার ভাল ওর চেয়ে বেশি তো আর কেউ চায় না। ইত্যাদি ইত্যাদি…
