কিষান টাই ঢিলে করে মদের তাকের দিকে যায়, একটি কথা না বলে।
মদের তাক থেকে বোতল হাতে সোফার দিকে যায়, একটি কথা না বলে।
রান্নাঘর থেকে মদের গেলাস আনে, একটি কথা না বলে।
গেলাসে মদ ঢেলে পান করতে থাকে, একটিও কথা না বলে।
.
নীলা ফ্রিজের খাবার গরম করে টেবিলে এনে রাখে, একটি কথা না বলে।
একটি থালা রেখে যায় টেবিলে, কথা না বলে।
.
১৩.
রাতে কিষান বাড়ি ফিরে দেখে নীলা সোফায় বসে সামনে টেবিলের ওপর পা তুলে টেলিভিশন দেখছে, টেলিভিশনে কোনও ছবি নয়, নাটক নয়, রীতিমতো ফরাসি খবর। কিষান ঘরে ঢোকে, নীলা যেমন বসেছিল, তেমন বসে থেকেই বলে, আজ ফোন করেছিলে বাড়িতে?
কেন?
বাড়ি ছিলাম না তো, তাই জিজ্ঞেস করলাম।
কিষান জিজ্ঞেস করে, কোথায় গিয়েছিলে?
বিশেষ কোথাও না। আটচল্লিশ নম্বর বাসে চড়ে শাঁ জার্মা দি প্রেতে গেলাম, ক্যাফে দ্য ফ্লোরে বসে চা খেলাম। তারপর বুলোভার্ড শাঁ জার্মায় হাঁটলাম। কত মানুষ হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে দেখি অদ্ভুত সুন্দর এক বাগান, লুক্সেমবার্গ বাগান। সেখানে বসেছিলাম অনেকক্ষণ। তারপর… কার্তে লাতার এক ব্রাসারিতে দুপুরে খেলাম, তারপর, তারপর কী করলাম, ও তারপর
কিষান দাঁতে দাঁত চাপে। নীলা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে স্পষ্ট সে দেখছে। কিষানকে দেখেও সে টেবিল থেকে পা নামায়নি বরং জিজ্ঞেস করার আগেই নিঃসংকোচে, নির্ভয়ে, নিরুদ্বেগে, নির্বিকারে, নিশ্চিত নির্লিপ্তিতে বর্ণনা দিচ্ছে নিজের নিন্দনীয় নিষিদ্ধ আচরণ। নিশপিশ করা দুটো হাত কিষান মুঠো করে রাখে, মুঠো না করলে সে দুটো হাত নীলার চুলের মুঠি ধরে সোফা থেকে উঠিয়ে ধাক্কা দিয়ে বাইরে ফেলত, দরজার বাইরে।
যাও, এবার তোমার শখের ঘুরে বেড়ানোর সাধ মেটাও।
গা এলিয়ে, কেলিয়ে, নীলা বলে দেখলে তো দিব্যি ঘুরে এলাম, কোনও অসুবিধে হয়নি, রাস্তায় দু একজনকে অবশ্য জিজ্ঞেস করতে হয়েছে কোথাকার বাস এ সব। আমি কচি খুকি নই তা দেখলে তো!
তুমি যে কচি খুকি নও, সে বেশ আন্দাজ করতে পারছি। দাঁতে দাঁত। এরকম ব্যাটাছেলেদের মতো পা তুলে বসেছ কেন?
কে বলেছে ব্যাটাছেলেদের মতো! আমি তো একেবারে খাঁটি মেয়েদের মতো পা তুলে বসেছি। নীলা খিলখিল হাসে।
পা নামাও।
কেন? তোমার বসতে অসুবিধে হচ্ছে? নীলার সরল প্রশ্ন।
আমার চোখে অসুবিধে হচ্ছে। তোমার ওই উরু ফাঁক করে বসাটা দেখতে বিচ্ছিরি লাগছে। আবারও দাঁতে দাঁত।
তা হলে দেখো না। মিটে গেল। সরল উত্তর।
ঠিক আছে দেখব না। দূরে যাও তুমি। কিষানের তপ্ত স্বর।
আমি কেন, তুমি দূরে যাও। বলে নীলা পা নামায়। পা নামায় এ কারণে যে কিষান খুব স্বাভাবিক ভাবে খুব শান্ত গলায় একটি খুব সত্যি কথা এখন বলতে পারে, বলতে পারে যে এটা আমার বাড়ি, আমি কোথায় বসব না বসব তা তুমি বলে দিতে পারো না।
খাবার দাও টেবিলে। দাঁত খিঁচিয়ে বলে কিষান।
খাবার কেন? মদ খাও। নীলা বলে।
মদ খাব কি খাব না, সে তোমার বলে দিতে হবে না। খেতে ইচ্ছে করলে আমি নিজেই খাব।
আবারও সেই আদেশ, খাবার দাও টেবিলে।
খাবার তো রাঁধিনি। নীলার শান্ত স্বর।
কেন?
সময় পাইনি।
তোমার নাকি সময়ের অভাব নেই। সময় নিয়ে কী করবে তাই ভেবে পাও না! বলতে গিয়ে ছোট চোখ আরও ছোট হয় কিষানের।
সে তো অকাজে ঘরে বসে থাকলে। নীলা দাঁতে নখ খুঁটতে খুঁটতে, বলে, এবারে পায়ের ওপর পা তুলে, কাল বেরোবার আগে আমাকে কিছু টাকা দিয়ে যেয়ো তো।
কেন?
কিছু বই কিনব।
কী বই?
আজ সেইনের ধারে হাঁটতে গিয়ে দেখলাম ইংরেজি বইয়ের এক দোকান। আসলে এ শহরে একটি নয়, বেশ কটি ইংরেজি বইয়ের দোকান আছে। কিছু বই কিনলে সময় কাটবে।
আমার খুব হিসেব করে চলতে হয় নীলা। কিষান উঠে দাঁড়ায়, টাই ঢিলে করতে।
আচ্ছা আমি চাকরি বাকরি কিছু করলে তো পারি…এভাবে বসে থাকার চেয়ে…নীলা তাকায় কিষানের দিকে নরম চোখে।
তোমার তর সয় না নীলা, বড় অস্থির তুমি। বড় খাই খাই তোমার। বড় চাই চাই তোমার। ক’দিন হল এসেছ? দু মাস, তিন মাস…এরই মধ্যে তুমি ছটফট করছ!
আমি জীবনে কখনও এরকম বসে কাটাইনি। কলকাতায় লেখাপড়া করতাম, সঙ্গে টিউশনিও। নিজের হাতখরচটা হত।
তোমার হাতখরচ, পাখরচ, মাথাখরচ, যা যা খরচ আছে, আমি কি দেব না বলেছি? দিচ্ছি না?
নীলা হেসে বলল, তাহলে দাও, আমার হাতখরচ দাও। পা মাথার খরচ তো চাইছি না।
হাতখরচের দরকারটা কী, আমি বুঝতে পারছি না। তোমার যা দরকার সব আছে এ বাড়িতে। যা যা দরকার, সব পাচ্ছও। মদের তাকের দিকে যেতে যেতে বলে কিষান।
আমার আইসক্রিম খাবার দরকার। বাড়িতে কোনও আইসক্রিম নেই।
ঠিক আছে কাল আমি দশ প্যাকেট আইসক্রিম কিনে আনব, যত ইচ্ছে খেয়ো।
নীলা দাঁত থেকে নখ নামিয়ে জোরে হেসে বলে, আমার মাংস খাবার দরকার।
কে বলল দরকার? মাংস ছাড়া মানুষ বেঁচে আছে না? আমি বেঁচে নেই?
মদের বোতল টেবিলে শব্দ করে রেখে কিষান বলে।
হ্যাঁ আছো, বেঁচে থাকাটাই তো কেবল আমার উদ্দেশ্য নয়। আরও কিছু দরকার।
কী দরকার?
নীলা কিষানের চোখে চোখ রেখে ধীরে, শান্ত গলায় বলে, তুমি রুটির কথা বলছ, কেবল রুটি দিয়ে সব হয় না, গোলাপও দরকার হয়।
ঠিক আছে, কাল একশো গোলাপ কিনে তোমাকে দেব।
তুমি দেবে। কিষান, তুমি দিতে চাও আমাকে। কিন্তু আমি যে আমাকে কিছু দিতে চাই।
