নীলা দেখছে যুবকটি একটির পর একটি চুমু খাচ্ছে আর যুবতীটির পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করছে। এক শরীরের সঙ্গে আরেক শরীর মিশে একাকার। নীলার ইচ্ছে করে মেয়েটির মতো আদর পেতে, ইচ্ছে করে এমন এক সুদর্শন যুবক তাকে এমন করে ভালবাসুক, এমন করে জড়িয়ে থাকুক, এমন গভীর করে চুমু খাক। সেইন নদীর কাছাকাছি এলে নীলা নামে বাস থেকে, সেইনের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে ফুটপাতের সারি বাঁধা সবুজ বাক্স বইয়ের দোকানগুলো দেখে। পর্যটকের ভিড় দোকানের সামনে, বই কেনার নয়, ভিড় ছবি তোলার। হাঁটতে হাঁটতে চোখের সামনে দেখে ল্যুভর জাদুঘর। অপ্রকৃতিস্থের মতো সে দৌড়ে যায় জাদুঘরে। জাদুঘরের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অতি ক্ষুদ্র পিঁপড়েসম যদিও মনে হয় তার, বিশালতার কাছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নিজেকে নির্দ্বিধায় সমর্পণ করে। ল্যুভরের বিশাল জগতে নীলা হারিয়ে যায়, সত্যিকার হারানো যাকে বলে। তার আর মনে থাকে না সে কলকাতার কোনও এক অনির্বাণ মণ্ডলের কন্যা নীলাঞ্জনা মণ্ডল, নিজের কোনও অস্তিত্ব সে অনুভব করে না, ভিড়ের মধ্যে কারও কাঁধ কারও হাত নীলার গায়ে ধাক্কা খায়, নীলা অনুভব করে না। রসোলিও থেকে সুলি, সুলি থেকে দেনোতে সে গ্রস্তের মতো হেঁটে যায়, অনুভব করে না সে হাঁটছে, মনে হয় কেউ তাকে নিয়ে যাচ্ছে, কোনও দেবদূত পাখায় করে তাকে এক কোঠা থেকে আরেক কোঠায় নিচ্ছে। দুপুর গড়িয়ে যায় নীলার খিদে পায় না, খিদে পাবে কেন, তেষ্টাই বা পাবে কেন, নীলা এই জগৎ সংসার থেকে অনেক দূরে। এক অসাধারণ আচ্ছন্নতার মধ্যে নীলার বিকেল পার হয়ে যায়। ল্যুভর থেকে বেরিয়ে আসার পরও তার আচ্ছন্নতা কাটে না, কাচের পিরামিডের পাশে পাথরের মূর্তির মতো বসে থাকে। নীলা ভুলে যায় যে তার বাড়ি ফিরতে হবে, ভুলে যায় যে তার একটিই পরিচয় সে মিসেস লাল, মিসেস কিষানলাল।
.
বাড়ি ফিরে দেখে কিষান তখনও ফেরেনি। বাথটাবের গরমজলে নিজেকে ডুবিয়ে শুয়ে থাকে। তার উঠতে ইচ্ছে করে না, রাঁধতে ইচ্ছে করে না। কিষান যখন ফেরে তখনও নীলা সাদা ফেনায় ঢাকা। স্নানঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে কিষান বলে, কী ব্যাপার, এই অসময়ে স্নান করছ?
ওঠো ওঠো। তাড়া দেয় সে।
কেন? নীলার ঠাণ্ডা স্বর।
কেন মানে? আমি এসেছি না?
তো?
তো উঠতে হবে। সেদিন কুমড়োর কথা বলেছিলে, দেখো কুমড়ো এনেছি। এ দিয়ে কিছু একটা করো তো। শুনেছি কুমড়োর নাকি মোরব্বা হয়, জানো করতে?
সাদা ফেনায় নিজেকে আরও ঢাকতে ঢাকতে বলে সে, না।
তা হলে বুদ্ধি করে কিছু একটা করো এটি দিয়ে।
তুমি করো না। তোমার তো অনেক বুদ্ধি।
আমি রান্না করতে জানি নাকি!
নীলা বেশ ভাল জানে যে কিষান রান্না করতে জানে, সে এ বাড়িতে আসার আগে কিষান নিজের জন্য রান্না করত। নীলা বেশ ভাল জানে যে তার ইচ্ছে না করলেও এই ফেনা সরিয়ে তাকে উঠতে হবে। মোরব্বা বানাতে না জানলেও, তাকে মোরব্বা বানাতে হবে।
নীলা যখন স্নানঘর থেকে এল, কিষান মীনাক্ষীর সঙ্গে কথা বলছে ফোনে। জানতে চাইছে, কুমড়োর মোরব্বা কী করে বানায়। ধুতে হবে, চামড়া ছাড়াতে হবে, টুকরো করতে হবে, ছিদ্র করতে হবে, চিনির সিরা বানাতে হবে, সে সিরায় কুমড়োর টুকরো ছাড়তে হবে…চারটে লবঙ্গ ছাড়তে হবে, পাঁচটা এলাচ ছাড়তে হবে, কম আঁচে অনেকক্ষণ রাখতে হবে ইত্যাদি।
ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।
.
সে রাতে কুমড়োর মোরব্বা বানিয়ে কিষানকে তুষ্ট করার পর নীলা চিঠি লেখে মলিনাকে,
আমার যদি টাকা থাকত মা, আমি বেশ ভাল বেঁচে থাকতে পারতাম। নিজের টাকা মা, নিজের টাকা না হলে, যার টাকা আছে তার কথায় কথায় সারাজীবন কেবল উঠবে বসবে, তুমি ডানে যেতে চাইলে টাকাঅলা বলবে বামে, তোমাকে বামে যেতে হবে। ইচ্ছের কোনও মূল্য নেই, তুমি যদি কপর্দকহীন হও। অন্যের পয়সায় খাব, আর স্বাধীনতা চাইব, এটি হয় না। তুমি কী আমাকে, কাউকে জানিয়ো না, কিছু টাকা পাঠাতে পারো? যে টাকা এনেছিলাম দেশ থেকে, প্রায় শেষ। নিজের হাতখরচের জন্য কিছু থাকা ভাল।
.
১২.
সকালে মলিনাকে লেখা চিঠিটি দুবার পড়ে ছিঁড়ে ফেলে নীলা, ছিঁড়ে মোজাম্মেলকে ফোন করে।
যেমন তেমন একটা চাকরি আমাকে খুঁজে দেবেন, যেখানে ভাষাটা খুব দরকার হয় না!
দিদি, সে পারি, পরে না আবার আমার অসুবিধে হয়। মোজাম্মেল অসহজ কণ্ঠে বলে।
ব্যগ্ৰ নীলা, সে বুঝতে পারছি, আমি কাউকে বলব না।
দিদি আমার চাকরিটা থাকবে না…
নীলা কথা দিল কিষানকে সে কিছুতে জানতে দেবে না যে মোজাম্মেলের কোনওরকম ভূমিকা আছে তার চাকরির ব্যাপারে। দোষ সব নিজের ঘাড়ে নীলা নেবে।
.
নীলা সেদিনও বেরোল। সারাদিন ঘুরে ফিরে সন্ধের মুখে বাড়ি ফিরল।
কিষান ঘরে ফিরে, এক থোকা উৎকণ্ঠা তার স্বরে, জিজ্ঞেস করে, কোথায় ছিলে, ফোন ধরোনি কেন?
কখন ফোন করেছিলে?
দুপুরে করেছি, বিকেলেও।
নীলা একবার ভাবে বলবে সে ঘুমিয়েছিল। আরেকবার ভাবে, না ঘুমিয়ে না, স্নান করছিল। ধুত, স্নান না, টেলিভিশন দেখছিল, ফোনের শব্দ শোনেনি। নীলা যখন যে কোনও একটি বলার, যেটি বললে কিষান স্বস্তি পাবে, খুঁজছিল, আর কিষান দাঁড়িয়েছিল নীলার উত্তরের অপেক্ষায়, তার চোখের সামনে, নাকের সামনে, ঠোঁটের সামনে, নীলা বলল, সে বাড়ি ছিল না। ছিটকে পড়ল কিষান। বাড়ি ছিল না নীলা। বাড়ি ছিল না, তো কোথায় ছিল? বাড়িতে আগুন ধরেছিল? না ধরেনি। ভূমিকম্প হয়েছিল, যা হলে দরদালান থেকে লাফিয়ে নামতে হয়! না হয়নি। কিছুই হয়নি, কিন্তু নীলা বেরিয়েছিল। বেরিয়েছিল, কারণ তার ইচ্ছে করছিল বেরোতে। কিষান তাকে নিয়ে বেরোতে পারত সে নীলা জানে, জেনেও সে একা বেরিয়েছে। কারণ তার একা বেরোতে ইচ্ছে করছিল।
