এই অসময়ে? তা আছ কেমন?
এই তো।
কিষান বাড়িতে?
না।
কী ব্যাপার ও রেস্তোরাঁয় নেই। মোবাইলও ধরছে না, ভাবলাম বাড়ি আছে বুঝি।
নেই।
তা কী করে সময় কাটাচ্ছ? কী কী দেখলে প্যারিসে?
ইফেল টাওয়ার দেখেছি।
আর?
আর কিছু দোকান।
ল্যুভরে যাওনি?
না।
মিউজি দর্সে?
না।
পিকাসো, রোদ্যাঁ কিচ্ছু না?
না।
কিষানকে একদিন বলেছিলাম আমাদের সঙ্গে তোমাকে যেন বেরোতে দেয়, তা হলে প্রদর্শনীগুলোয় নিয়ে যেতে পারতাম, আর দেখার এত কিছু আছে এ শহরে, ও বলল ও নিজেই নাকি তোমাকে নেবে, আর বিয়ের পর পর কেউ কি বউ ছাড়তে চায়, স্ক্রৈন হয়ে থাকে তো অন্তত ক’মাস।
বলে সুনীল হাসে দম টানা হাসি। হেসে আবার বলে, আমি নিজেকে দিয়ে বুঝি, চৈতালিকে বিয়ে করার পর তো কাজেই যাইনি পুরো দু মাস। চব্বিশঘণ্টা আঠার মতো লেগে ছিলাম দুজনে।
আচ্ছা, সুনীলদা, আপনার হাতে কোনও চাকরি টাকরি আছে? নীলা আচমকা প্রশ্ন করে।
চাকরি? কেন? কার জন্য?
আমার জন্য।
তুমি চাকরি করবে?
করব।
কিষানকে বলেছ? ও কী বলে?
ওকে বলিনি।
ওকে বলনি? তা হলে হবে কী করে?
কিষান কিষান কিষান, কিষান ছাড়া যেন আমার জীবনে কিছু হবার নয়।
না সে কথা বলছি না। কাজ করার আগে ভাষাটা তো শিখতে হবে…
ভাষা শিখব কোথায়?
আলিয়ঁস ফ্রসেজে যাও না কেন! কিষানকে বলো…
আমাকে ঠিকানা দিন, কী করে যেতে হয় বলুন, আমি একাই যেতে পারব।
কিষান তো রাগ করবে…
নীলা দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে।
ওপাশ থেকে সুনীল বলে, কিষান বাড়ি এলে বোলো বাড়িতে আমাকে একবার ফোন করতে।
কোনও জরুরি ব্যাপার?
আরে ওই পুজোকমিটির ব্যাপার। ও কিছু চাঁদা দেবার লোক জোগাড় করে দেবে বলেছিল।
ও৷
.
১১.
যে চাবি ঘরে আগুন না লাগলে ব্যবহারের পরামর্শ কিষান দেয়নি, সে চাবি ঘরে আগুন লাগেনি, অথচ নীলা ব্যবহার করে। বাইরে বেরোয় সে। বেরিয়ে রাস্তায় এলোপাতাড়ি হাঁটে। পকেটে শহরের একটি মানচিত্র আর কিছু ফ্রাঁ। গার দ্য নর্দ নামের সেই প্রাসাদের ভেতর ঢুকে দেখে, মানুষ ঢুকছে, বেরোচ্ছে, রেলগাড়ি থামছে, ছাড়ছে। নীলা একটি থামে হেলান দিয়ে রেলগাড়ি দেখে, ইচ্ছে করে দূরে কোথাও যেতে। রাজপুত্রের মতো দেখতে নীল চোখের সোনালি চোখের যুবকেরা রেলগাড়িতে চড়ে কোথায় যেন চলে যাচ্ছে, নীলাকে কেউ নিচ্ছে না, নীলার দিকে কেউ তাকাচ্ছে না। তার হঠাৎ মনে হয় সে দৃশ্যমান তো! নিজের দিকে তাকায়, পাট ভাঙা কালো জিনস, তার ওপর সাদা একটি সিলকের শার্ট, শার্টের ওপর গোলাপি একটি কার্ডিগান, পায়ে পালিশ করা কালো জুতো, নীলাকে নীলা নিজেই বোঝে মোটেও কুৎসিত লাগছে না। তবু কেন তার দিকে কারও তাকাবার রুচি হয় না। কলকাতার রাস্তায় হাঁটলে সে নিশ্চিত যে কোনও পুরুষই তাকে ফিরে ফিরে দেখত। প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আবারও নীলা উদ্দেশ্যহীন হাঁটে, হেঁটে হেঁটে একটি বাসস্টপে দাঁড়াতেই মুহুর্মুহু বাস আসছে, একটিতে চড়ে বসে। কোন বাস, কী বাস, কোথায় যাচ্ছে কিছু না জেনেই সে চড়ে। কিষান একবার বলেছিল, নীলা হারিয়ে যেতে পারে একা বেরোলে। তার মনে হয়, সে যদি হারিয়ে যায়, যাক, ক্ষতি কী। নীলা নিজেকে হারাতে চায়। এমন কোথাও চলে যেতে চায় যেখান থেকে বাড়ির পথ আর সে চিনবে না। বাস যতদূর তাকে নেয়, সে যায়। এক বাস থেকে নেমে কিছুক্ষণ এদিক ওদিক হেঁটে আবার সে নতুন বাসে চড়ে। কখনও উদাস, কখনও ঔৎসুক্য চোখে। কলকাতার বাসে গাদাগাদি ভিড়, ভ্যাপসা গরম, জানালায় বসলে ধুলোয় চোখ মুখ চুল ভেসে যায়। আর এখানকার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসের চারদিকটা প্রশস্ত জানালায় মোড়া, ধুলোর বংশও নেই। সামনের দরজা দিয়ে ওঠো, কমলা রঙের টিকিট, মাসের টিকিট, ওঠার সময় ড্রাইভারের সামনে কেবল উঁচিয়ে ধরো, ঢুকে যাও, আর কমলা টিকিট না থাকলে ড্রাইভারের কাছ থেকে সবুজ টিকিট কিনে নাও আট ফ্রাঁ দিয়ে, ছোট মেশিনে সে টিকিট ঢোকালে কড় কড় শব্দ করে সময় তারিখ বসিয়ে দেবে। নিয়ে গদিঅলা চেয়ারে বসে যাও। কোনও চিৎকার নেই, চেঁচামেচি নেই, রাজনীতির গল্প নেই, মাছের বাজারের আলাপ নেই, ঘর সংসারের বর্ণনা নেই। সকলেই শান্ত, সকলেরই সুখী মুখ, কারও ব্যাপারে কেউ নাক গলাচ্ছে না। সাদা সব মানুষের মধ্যে বাদামি রঙের এক মেয়ে বসে আছে, কেউ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করছে না তুমি কোত্থেকে এসেছ, কোথায় দেশ, কোথায় বাড়ি। নীলা বাসের ভেতরের বাইরের সুখী মুখগুলো দেখে, দেখে এক যুবক যুবতী উঠল বাসে, প্যারামবুলেটরে বাচ্চা ঠেলে। বাচ্চা ঘুমিয়ে আছে আর যুবক যুবতী এক বাস লোকের সামনে দাঁড়িয়ে চুমু খাচ্ছে। গভীর চুমু। ফরাসি চুমু। নীলার কান লাল হয়ে ওঠে লজ্জায়। নীলা দেখে বাসের আর কেউ তাকাচ্ছে না চুমুখাওয়া জোড়ার দিকে। কলকাতায় এ ঘটনাটি ঘটতে পারত না, বাসে কেউ যদি চুমু খায়, অশালীন কর্ম করার দায়ে বাসের লোকেরা ধাক্কা দিয়ে জোড়া ফেলে দেবে বাইরে। রাস্তায় অশালীন কর্মটি করলে রীতিমতো ঢিল ছুড়বে লোকে। নীলা ভাবে, এই যে চুমু খাচ্ছে এরা, খেতে ইচ্ছে হচ্ছে বলে খাচ্ছে, চুমুটাকে বাড়ির শোবার ঘরের জন্য রেখে দিচ্ছে না, আড়াল খুঁজছে না, অন্ধকার খুঁজছে না, এর মতো শালীন এবং সুন্দর ব্যাপার আর হয় না। কলকাতার রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে কোনওদিন সুশান্তর হাতে হাত রেখে হাঁটতে পারেনি সে, লোকে কী বলবে বলে। লোকে কী বলবে বলে সন্ধের পর চারদিক কালো হলে শহর থেকে চার মাইল দূরে গিয়ে অন্ধকার ঝুপড়ির আড়ালে কোথাও কেউ নেই, এমন জনমনুষ্যহীন জায়গায় এদিক ওদিক দেখে নিয়ে ভয়ে ভয়ে একটি কি দুটি চুমু খেয়েছে। নীলার আর সুশান্তর সবচেয়ে বেশি ভয় ছিল মানুষের। শেয়াল ডাকছে ঝুপড়ির পেছনের জঙ্গলে, সে ক্ষতি নেই, মানুষ ডাকলেই সর্বনাশ।
