.
০৯.
কী ব্যাপার এই সন্ধেবেলা ঘুমোচ্ছ? কিষান ঘুমের নীলাকে ডেকে প্রশ্ন করল।
আড়মোড়া ভেঙে নীলা বলল, সময় খুব বড় শত্রু আমার, তাই সময়কে হত্যা করছি একরকম, ঘুমিয়ে।
রাতে দুজন লোক আসবে, বেশ কিছু পদ রান্না করতে হবে। শুরু করে দাও এক্ষুনি।
নীলা হেসে বলল, এই তো ব্যস্ত বানিয়ে দিলে। কারা আসবে শুনি?
এক পাঞ্জাবি দম্পতি। তুমি চেনো না।
কেবলই দেশি বন্ধু, তোমার বিদেশি বন্ধু নেই?
আছে, তবে বাইরে, ঘরের বন্ধু দেশিই হয়।
ইমানুয়েলও কি বাইরের বন্ধু ছিল?
ইমানুয়েল কে?
তোমার স্ত্রী।
ও তা খবর দিল কে?
যেই দিক না।
মনে হয় তুমি খুব ভেঙে পড়লে?
মোটেই না! এত সহজে ভাঙলে চলবে!
ইমানুয়েলকে বিয়ে না করলে আমার ফরাসি নাগরিক হওয়া হত না, আর সে সুবাদে যে তোমারও হচ্ছে, সেটিও হত না।
তুমি তো আগে বলনি ইমানুয়েলের কথা।
কেন, আগে জানালে বুঝি এ বিয়েতে রাজি হতে না?
হয়তো না।
হতে হতে।
কী করে জানো হতাম?
হতে কারণ প্রেমিকপ্রবর সুশান্ত তোমাকে ছেড়ে যেভাবে পালিয়েছে, আমি না বিয়ে করলে তোমাকে কেউ বিয়ে করত না, খবর তো আর কম রটেনি। শুয়েছও তো ও ছেলের সঙ্গে, শোওনি?
নীলার বুকের ভেতর এক কলস ঠাণ্ডা জল উপুড় হয়ে পড়ল।
কী শুয়েই থাকবে নাকি? রান্না করতে হবে তো! কিষান টাই ঢিলে করতে করতে গলা চড়ায়।
.
১০.
সকালে কিষান বেরিয়ে যাবার পর নীলা অলস শুয়ে রইল। শুয়ে শুয়ে ভাবছিল গত রাতে পাঞ্জাবি বন্ধুদম্পতি নিয়ে মধ্যরাত অব্দি কিষানের হইচই এর কথা। নীলা শোবার ঘর থেকে শুনেছে, তিন মাতালের উচ্ছ্বাস। যা রান্না করেছিল, কিষান বারবারই বলেছে, মোটে ভাল হয়নি। নান পুড়ে গেছে, ডালমাখানিতে কিছু একটা কম হয়েছে, কী কম হয়েছে তা অবশ্য বলেনি আর ফুলকপির তরকারি, পাঞ্জাবি বউটি যদিও বলেছে ভাল, জিভে চুক চুক শব্দ করে কিষান বলেছে আরও ভাল হতে পারত। নিজেকে নীলার মনে হয়েছে, সে তার মা, সে মলিনা। অনির্বাণ এমন আচমকা বলে বসতেন, রাঁধো তো, বন্ধুরা খেতে আসছে। মলিনা রান্নাঘরে ঘেমে নেয়ে রাঁধতেন। খেতে গিয়ে অনির্বাণ সব সময়ই এটা ওরকম হলে ভাল হত আর এটা না হয়ে ওটা হলে স্বাদ হত এ সব বলতেনই। মলিনা স্বামীকে যত তুষ্ট করতে চাইতেন, তত ব্যর্থ হতেন।
নীলা সানালকে ফোন করে।
ওপাশে সানাল গলা শুনে চিনতে পারেনি, চিনতে পারার কোনও কারণও নেই।
নীলা। নীলাঞ্জনা মণ্ডল।
ও মিসেস কিষানলাল!
হ্যাঁ মিসেস কিষানলাল।
তা কী খবর মিসেস লাল। হঠাৎ?
নীলা টের পায় সানাল আশা করছে কোনও জরুরি খবরের।
না এমনি। এমনি ফোন করলাম। নম্বরটা পেলাম। ভাবলাম জিজ্ঞেস করি কেমন আছেন।
আমি ভাল আছি। বেশ ভাল। হা হা। তা আপনি কেমন আছেন! সানালের সেই উৎফুল্ল কণ্ঠস্বর।
আমার আর থাকা! তা আসুন না একদিন আমাদের বাড়িতে। অনেকদিন আপনাকে দেখি না। নীলার গলায় ব্যাকুলতা।
তা স্বামী দেবতাটি কোথায়? ঘরে আছে?
নেই। ওর তো দিনরাত ব্যস্ততা।
হুম। বিদেশে ব্যস্ত না থাকলে চলেও না..তা ভাবীজি আমারও ব্যস্ততা ভীষণ। এই তো ছুটতে হবে কাজে।
সানালের ব্যস্ত কণ্ঠ।
ও। ঠিক আছে। আমি বোধহয় অসময় ফোন করলাম।
নীলা ফোন রাখে। নিজের ওপর রাগ হয় তার। কেন এই ফোনটি সে করেছে, কেন সে শুনতে গেছে যে সানাল খুব ব্যস্ত, এত ব্যস্ত যে নীলা যেচে ফোন করার পরও তার যেহেতু এখন সময় নেই, কখন সময় হবে কথা বলার, সকালে না হলে দুপুরে, দুপুরে না হলে রাতে, আজ না হলে কাল তা বলেনি। এত ব্যস্ত যে নীলা যে ভাল নেই তার ইঙ্গিত দেবার পরও সানালের এতটুকু উৎসাহ হয়নি জানতে কেন নীলা ভাল নেই, কী ঘটেছে বা কী ঘটছে।
সানালের সঙ্গে সে কেন কথা বলছে চেয়েছে! এ কি কেবল কারও সঙ্গে কথা বলার জন্যই! কারও সঙ্গে কথা বলার জন্য এমনই যদি আকুতি, তবে সে মলিনার সঙ্গে বলতে পারত অথবা কলকাতার পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে। কলকাতা যেহেতু দূরে, যেহেতু কিষান বলেছে, ঘন ঘন বিদেশে ফোন করলে ফ্রান্স টেলেকমের ধারালো ছুরিতে গলাটা কাটা পড়বে, সে প্যারিসেই সুনীল বা চৈতালির সঙ্গে বলতে পারত যত কথা আছে মনে। বলেনি কারণ নীলা সানালের সঙ্গেই চেয়েছে বলতে, যে সানালের দুর্নাম আছে অন্যের বউয়ের সঙ্গে রং তামাশা করার, যে সানালের দুর্নাম আছে অন্যের বউয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার, অন্যের বউকে ভাগিয়ে নিয়ে যাবার, সেই সানালকেই নীলা চেয়েছিল তাকেও যেন ভাগিয়ে নেয় এ বাড়ি থেকে, যে করে হোক। নীলা নিজেকে প্রশ্ন করে, এই কি কারণ? নীলা কারণ জানে না। আজকাল নীলার মনে হয় অনেক কিছু সে জানে না। কেন সে সারাদিন শুয়ে থাকছে সে জানে না। কেন সে উঠে চা পর্যন্ত খায়নি, সে জানে না। কেন সে স্নান করতে ওঠেনি, দুপুরের খাবার খেতে না, এমনকী জানালায় দাঁড়িয়ে রাস্তার কোলাহল দেখতেও না, সে জানে না। কেন সে সুনীলের বাড়ি থেকে আনা বইগুলো পড়তে নিয়েও রেখে দিয়েছে, সে জানে না।
.
বিকেলে ফোন বাজে, নীলা ফোনের দিকে পিঠ ফিরে শোয়, কেউ হবে হয়তো, কিষান কিংবা রেস্তোরাঁর কোনও লোক তাকে খুঁজছে, অথবা কোনও পাঞ্জাবি কারবারি।
শ্রুতিযন্ত্রে সুনীলের কণ্ঠ শুনে নীলা রিসিভার তোলে, কী ব্যাপার নীলা, ফোন ধরছ না।
শুয়েছিলাম। ক্লান্ত স্বর নীলার।
