কিষানের চুলে এবং টাকে দুটোতেই হাত বুলিয়ে দিতে দিতে চাপা হাসি ঠোঁটে, নীলা বলে, বিদেশি মেয়ের স্বাদ কেমন?
ধুর। কিষান ঠোঁট ওলটায়।
কেউ কি হাত বুলিয়ে দিয়েছে চুলে? কিষানের মুখের ওপর ঝুঁকে বলে নীলা।
কিষান চোখ বোজে। হুলো বেড়াল চোখ বোজে। গড়গড়।
বলছ না যে, কেউ হাত বুলোয়নি?
ওরা এ সবের বোঝেই না, কী বুলোবে!
কী করে জানো যে বোঝেই না?
বোজা চোখ বুজেই থাকে। জানি জানি। কে না জানে!
.
০৮.
সোমবার সকালে নীলাকে নিয়ে ইল দ্য লা সিতের পুলিশঅফিসে গিয়ে নীলার নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করল কিষান। ঘণ্টা দুয়েক কাটানোর পর যখন বেরিয়ে এল, নীলার ইচ্ছে করে নতরদামে যেতে, কিষানের ইচ্ছে করে না। নীলার ইচ্ছে করে সেইনের পাড় ধরে হাঁটতে, কিষানের ইচ্ছে করে না। এই দ্বীপটিতে, এই ইল দ্য লা সিতের ছিল সবচেয়ে পুরনো বসতি, এখানেই এক উপজাতি জেলেদলের নাম ছিল পারিসি। রোমানরা এসে পরে এ জায়গা দখল করে নিয়ে সেইনের ধারে বাড়ি ঘর তুলেছিল, রোমান শহরের চিহ্ন কিছু আছে ওপারে। জানো, ওই পারিসি উপজাতির নামেই এ শহরের নাম প্যারিস হল। আগে নাম ছিল লুতেসিয়া। কিষান জানে না, জানার কোনও ইচ্ছে তার নেই। তার তাড়া রেস্তোরাঁয় যাবার। নীলাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে সে চলে গেল। ওই তাড়ায় কিষান ভুলে গেছে তার ঠিকানা আর টেলিফোন নম্বর লেখা নোটবইটি সঙ্গে নিতে। কিষানের ছোট্ট নীল নোটবইটি হাতে নিয়ে এ থেকে জেড পর্যন্ত লেখা নামগুলো দেখে নীলা। বেশির ভাগ নামই সে চেনে না। নীলার নাম নেই, বদলে নিখিলের নাম, পাশে বালিগঞ্জের বাড়ির নম্বর। সুনীলের নামের পাশে পাঁচটা ফোন নম্বর, একটি প্যারিসের বাড়ির, দুটো ক্লিনিকের, একটি মোবাইলের, আর একটি কলকাতার বাড়ির।
নীলা শুয়ে নোটবইটি কোলের ওপর নিয়ে সুনীলের আপিসের একটিতে ফোন করল।
ফরাসি ভাষায় একটি মেয়েকণ্ঠ তড়বড় করে কিছু বলল, নীলা কেবল জিজ্ঞেস করল, তুমি কি ইংরেজি জানো?
মেয়েটি সাফ বলে দিল, না। বলে ফোন রেখে দিল। খটাস।
সুনীলের আপিসে আরেকটি নম্বরে ফোন করে এবারও একই কণ্ঠ পেল। খটাস।
সুনীলের নাম থেকে ওপরে চোখ পড়তেই দেখে সানাল।
নম্বরটি নীলা টুকে রাখে। সানালেরও দুটো নম্বর, আপিসের নম্বরে খটাসের ভয়ে নীলা ফোন করে না।
শেষে তাজমহলে, কিষানকে বলতে যে টেলিফোনের নোটবইটি বাড়িতে পড়ে আছে। কিষান নেই, এখনও রেস্তোরাঁয় পৌঁছোয়নি, সবে রেস্তোরাঁ খোলা হল, থাল বাটি সাজানো হচ্ছে, গেলাসে ন্যাপকিন পোরা হচ্ছে। লোবানের গন্ধ ছড়ানো হচ্ছে রেস্তোরাঁয়।
গন্ধটা বিচ্ছিরি লাগে না? নীলা বলে।
এ দেশি লোকেরা আবার এ গন্ধ পছন্দ করে। আমার সহ্য হয় না, মনে হয় কেউ যেন মারা গেছে। মোজাম্মেল বলে।
দুপুরে কী রান্না হচ্ছে ওখানে?
রান্না নতুন করে কিছু হয় না। সেদ্ধ খাবার থাকেই ফ্রিজে, বের করে তেলে ভেজে দাও, বারোয়ারি মশলায় ছেড়ে দাও। তবে তন্দুরি চিকেন আর নানরুটিতে মন ঢালতে হয়। এ দেশিরা এটিই খায় বেশি।
ও।
এদিকে যে অনেকদিন আসেন না!
যাব একদিন, খেতে যাব। মাছ মাংসের স্বাদই ভুলে যেতে বসেছি। ছাগলের মতো ঘাসপাতা চিবোতে হয় শুধু।
মোজাম্মেল হাসে। বলে, যাই বলুন দিদি, শাক সবজিতে ভিটামিন আছে।
তা আছে। এ থেকে জেড পর্যন্ত ভিটামিন টলটল করছে। বলে নীলা নিজেই হাসে।
দিদি আপনি কি লেখাপড়া করছেন না কি চাকরি করছেন?
লেখাপড়া করছি না। তবে চাকরি করছি। ঘর সংসারের চাকরি। বেতন ছাড়া চাকরি।
মোজাম্মেল হাসে, নীলাও।
আচ্ছা মোজাম্মেল, আপনি তো অনেক জায়গায় কাজ টাজ করেছেন, আমার জন্য একটা কাজ খুঁজে দেখবেন।
নীলার কণ্ঠস্বরে মোটেও মনে হয় না, সে কথার কথা বলছে।
আপনি চাকরি করবেন? তো কিষানবাবুকে বলুন না, ওঁর তো অনেক চেনা আছে। আমি তো ছোট চাকরি করি…আমি কী করে বড় চাকরির খোঁজ দেব বলুন।
মোজাম্মেলের কথা শেষ না হতেই নীলা বলে, ছোট চাকরিই করব। আপনি পদার্থ বিজ্ঞানে মাস্টার্স করে থাল মাজেন, আমি বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স করে না হয় ঘরই ঝাড়ু দিলাম। নীলা বলে। নীলার কণ্ঠস্বর শুনে আবারও কেউ বলবে না যে সে মজা করছে।
ছি ছি কী বলছেন দিদি। আমি তো করি আর কোনও উপায় নেই বলে।
আর আমার বুঝি খুব উপায় আছে?
নীলা হাসে, মোজাম্মেলও।
কিষানবাবু তো ভাল টাকা রোজগার করেন।
তো?
কেন, ওতে তো চলছে ভাল।
মোজাম্মেল, কিষান রোজগার করে, ও তো ওর টাকা, আমার তো নয়।
মোজাম্মেল অপ্রস্তুত। থেমে থেমে বলে, আপনি কিষানবাবুকে বললে নিশ্চয়ই…
ও বউদের চাকরি করা পছন্দ করে না…
কেন কিষানবাবুর আগের স্ত্রী তো চাকরি করতেন!
আগের স্ত্রী?
মোজাম্মেল অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলে, কেন দিদি, আপনি জানেন না?
না তো…
মোজাম্মেল খদ্দেরের দোহাই দিয়ে ফোন রেখে দেয়।
সেদিন বিকেলেই নীলা সুনীলের বাড়িতে ফোন করে কিষানের আগের বিয়ের ঘটনাটি সত্য কি না জানতে চায়।
কেন তুমি জানো না?
নাহ।
হ্যাঁ, ওর তো ফরাসি বউ ছিল। ইমানুয়েল। কিষান বলেনি?
নাহ।
বলো কী, আমি তো জানি, তুমি জেনেই বিয়েতে রাজি হয়েছ।
.
নীলা অনুভব করতে চেষ্টা করে, কিষানের আগে একটি বউ ছিল বলে তার কষ্ট হচ্ছে কিনা। কোনও যন্ত্রণা তার শরীর থেকে মনে ছড়াচ্ছে কি না, আশ্চর্য, না। ছড়াচ্ছে না।
