তাও ঠিক। কিষান ঘুম ঘুম স্বরে বলে।
নীলা সারাদিন নিপুণ হাতে ঘর ঝাড়ু দিল, কাপড় কাচল, ফুলগাছের গোড়ায় জল ঢালল, রান্না করল। এ সব করে নীলার অভ্যেস নেই যদিও, করল। করতে করতে নীলা ভাবে, সে কি এ সব কিষানকে ভালবেসে করছে না কি ওকে খুশি করার জন্য করছে যেন অন্তত এ কারণে নীলাকে সে ভালবাসে, ভালবাসার তো কোনও একটি কারণ থাকতে হবে, কিছু গুণ না থাকলে তো জোর করে ভালবাসা যায় না। গুণ বলতে তো রান্নাবান্না করা, ঘর গোছানো, এ সব। বউ হয়েছে বলেই যে আকাশ থেকে বউয়ের জন্য ভালবাসা জলের ফোঁটার মতো বুকের ওপর পড়বে তা তো নয়! নীলা ভাল গান গায়, সাহিত্যের ভাল খবর রাখে, এ সব কিষানের মনে ভালবাসা জাগাবার কোনও কারণ নয়, কারণ কিষান বাংলা ভাষা বোঝে না। এ ভাষায় শুয়োরের বাচ্চা বলে গাল দিলেও কিষান বুঝবে না যে এ গাল, না বুঝে মিষ্টি মিষ্টি হাসবে। এ ভাষায় কবিতা আবৃত্তি করলেও কিষান ভাবলেশহীন মুখে বসে থাকবে সামনে। এ ভাষা, এ বাড়িতে ভাঙা কাচের মতো মূল্যহীন। ভাঙা কাচ গা কাটা ছাড়া আর কোনও কাজে আসে না। এ অচল ভাষাও তেমন। শরীর না কাটলেও মন কাটে। এ ভাষার অসম্ভব সুন্দর শব্দাবলী নীলার ভেতরে গুমরে মরে আর যখন একা একা নীলা নিজের সঙ্গে এ ভাষায় কথা বলে বা গেয়ে ওঠে আমি কান পেতে রই, ও আমার আপন হৃদয় গহন দ্বারে, কোন গোপন বাঁশির কান্না হাসির গোপন কথা শুনিবারে, ভ্রমর সেথা হয় বিবাগি নিভৃত নীল পদ্ম লাগি রে, কোন রাতের পাখি গায় একাকী সঙ্গীবিহীন অন্ধকারে..নীলা লক্ষ করে চোখে জল তার, আসলে জল নয়, নীলা ভাবে, এ হৃদয় কাটা রক্ত।
সারা সকাল বিছানায় গড়িয়ে কিষান টেলিভিশনের সামনে সোফায় আসে দ্বিতীয় দফা গড়াতে, ভিডিওতে কেয়ামত সে কেয়ামত চালিয়ে। নীলা তখন কার্পেট ঝাড়ু দিয়ে জানালার কাছে কাচ মুছছে। কাচ মুছে, রান্না সেরে, স্নান সেরে, কেবল গুণ নয়, রূপও যেহেতু চাই কিষানের, মুখে তাই ক্রিম মেখে, পাউডার মেখে, চোখে কাজল পরে, ঢাকাই শাড়ি পরে সামনে এসে বসে নীলা। বউ নীলা। লক্ষ্মী নীলা। ঘরণী নীলা।
কেমন লাগছে দেখো দিকিনি! কিষানের পাশে ঘন হয়ে বসে জিজ্ঞেস করে।
বেশ।
এই ওদের একবার নেমন্তন্ন করবে না?
কাদের?
সুনীলদের।
সময় কোথায়।
আজ সন্ধেয় না হয় ডাকো।
এভাবে ডাকা যায় নাকি! অন্তত দু সপ্তা আগে থেকে জানাতে হবে তো!
ও।
কেন, হঠাৎ ওদের কথা কেন!
অনেকদিন বাংলায় কথা বলি না তো!
হুম তাও কথা। তোমার সঙ্গে কোনও এক বাঙালির বিয়ে হলে ভাল হত।
বাঙালির সঙ্গে বিয়ে না হয়ে ঢের ভাল হয়েছে। বাঙালিকে বিশ্বাস নেই।
কিষান তার না কোদালে হাসিটি হাসে।
আচ্ছা, তুমি ঘরে বসে পাঞ্জাবি ভাষাটা শিখলেও তো পারো!
কী করে?
পাঞ্জাবি গান শোনো। ছবি দেখো। আমার সঙ্গে একটু একটু বলো। হয়ে যাবে।
তার চেয়ে ফরাসি ভাষাটা শেখা ভাল না?
মাথায় যদি কুলোয়, তা হলে শেখো।
ফরাসি ভাষা যে ঘরে বসে থেকে আর কিষানের সঙ্গে গাড়িতে হঠাৎ হঠাৎ এদিক ওদিক ঘুরে এলে শেখা হবে না, তা নীলা যেমন জানে, কিষানও জানে। এ প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে সে বলে আচ্ছা সানালের বাড়ির নেমন্তন্নে তো গেলে না, কাটিয়ে দিলে, ওকেই না হয় আজ খেতে ডাকো!
নাহ। ও ছেলের মুখের লাগাম নেই! দেখলে না তোমার সঙ্গে কী রকম রং তামাশা করল সেদিন।
রং তামাশা?
তাই তো। এ নিয়ে পরে রাজেশ বলেছেও যে সালের এ সব করা মোটেও ঠিক হয়নি। অন্যের বউয়ের দিকে নজর দেওয়া ওর চিরকালের স্বভাব। ভারতীয় বউগুলো এলেই সানাল ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেন রে বাবা নিজে একটা জোগাড় করে নিলেই তো পারিস, অন্যের সম্পদে চোখ দিস কেন!
কিষানের সারা মুখে ঈর্ষা চমকাচ্ছে, নীলা স্পষ্ট দেখে। সানাল গত রবিবার নীলা আর কিষানকে নেমন্তন্ন করার পর, কিষান প্রথম বলেছে নিশ্চয়ই যাব, তারপর বলেছে দেখি, তারপর বলেছে, মনে হচ্ছে না হয়ে উঠবে, একেবারে শেষে বলেছে, ভাই খুবই দুঃখিত, বিষম এক কাজ পড়ে গেছে, জরুরি কাজে আমাকে লিওঁ যেতে হচ্ছে। কিষান লিওঁ যায়নি সেদিন, প্যারিসেই ছিল।
সে রাতে ওর তো তোমাকে স্ক্রু ড্রাইভার বানিয়ে দেওয়া উচিত হয়নি। কিছু বানাতে হলে সে আমি বানাব। আমার বউ আমি দেখব তার কী লাগবে না লাগবে। কিষানের ঘাড়ের রোয়া ফুলে ওঠে বলতে গিয়ে।
ধুর কী যে বলল। তোমারই তো বন্ধু। বউদির সঙ্গে মজা করেছে এই যা। নীলা বলে।
তুমি বুঝবে না, এ সব মজা না। এই পনেরো বছরে প্যারিসের ভারতীয় ছেলেদের কাণ্ড কম শুনিনি, অন্যের বউ ভাগিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে, নয়তো অবৈধ সম্পর্ক করে।
কিষান নাক কুঁচকোলো। কপাল কুঁচকোলো। ঠোঁট কুঁচকোলো।
নীলা কুঁচকোনো কিষানের সামনে থেকে সরে জানালায় গিয়ে দাঁড়ায়। আচ্ছা, আজ চলো না তোমার রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার সারি।
কী যে বলো, পুরো সপ্তাহটা কাটে ওই রেস্তোরাঁয়। আজ যাব না! অবশ্য…সামনের সপ্তাহে তোমায় নিয়ে যাব, রেস্তোরাঁয় মাছ মাংস খাওয়াতে…
নীলা ঘুরে দাঁড়ায়। কিষানের দিকে পায়ে পায়ে যেতে যেতে বলে, ঠিক বলছ তো!
ঠিক বলছি, ঠিক।
কিষান নীলার ডান হাত টেনে নিয়ে নিজের চুলে বসিয়ে দিয়ে বলে, দেশি মেয়ের হাতের স্পর্শই অন্যরকম, দেশি মেয়ের স্বাদই আলাদা!
