.
০৬.
আমাকে কিছু টাকা দেবে, তোমার তো সময় হয় না, আমি একা না হয় বেরোই।
একা?
হ্যাঁ একা।
পাগল হয়েছ?
কেন একা বুঝি আমি বেরোতে পারি না? আমি কি ছোট্ট বাচ্চা?
আমার কাছে অবশ্য তুমি ছোট্ট বাচ্চাই। কিষান নীলার গালে আঙুল বুলিয়ে বলে।
নীলা হাসে। বলে, কিন্তু আমার কাছে তো আমি ছোট্ট বাচ্চা নই।
তবে কি বড় বাচ্চা? কিষানও হাসে, কোদালি হাসি।
আমার সাতাশ বছর বয়স। আমি প্রাপ্তবয়স্ক।
প্রাপ্তবয়স্ক হলে বুঝি বেরোতে হয় রাস্তায়?
রাস্তায় যে হতে হবে তা নয়। ধরো সুনীলের বাড়ি গেলাম কি কোনও ক্যাফেতে বসে চা খেলাম, ধরো কোনও জাদুঘরে গেলাম, অথবা বইয়ের দোকানে। ধরো অপেরার ভেতরটা দেখতে গেলাম। প্যারিসে আসব বলে প্যারিসের ওপর কিছু বই পড়েছি, দেখতে ইচ্ছে করে জায়গাগুলো। নীলা জানালায় উদাস তাকিয়ে বলে।
একা একা এ সব করতে চাও তুমি? কিষানের ছোট ছোট চোখ দুটো গোল আলুর মতো বড় হয়ে ওঠে।
তুমি তো সময় পাও না তাই। ভাবছিলাম, একটু না হয় হাঁটিই রাস্তায়, কোথাও যদি নাও যাই। নীলার উদাস স্বর।
হাঁটবে? কেন?
কোনও কারণ নেই। এমনি।
এমনি এমনি হাঁটে কেউ রাস্তায়! দেখো তো এই দেখো, কিষান হেঁচকা টেনে নীলাকে জানালার কাছে নিয়ে বলে, ওই যে লোকগুলো হাঁটছে, কেউ কি অকারণে হাঁটছে বলে মনে হয় তোমার! সকলেই কিছু না কিছু কারণে হাঁটে। সকলেই ব্যস্ত। আমিও ব্যস্ত। কাজে ব্যস্ত না হলে উনুন জ্বলবে না। মাথার ওপর ছাদ থাকবে না নীলা, তোমাকে একদিন দেখাতে নেব কী করে উদ্বাস্তুগুলো রাস্তায় কাটায়, শীতের রাতেও। তখন বুঝবে, খামোখা সময় নষ্ট করার মানে হয় না।
নীলা শাড়িতে আঙুল পেঁচাতে পেঁচাতে বলে, আসলে কী জানো, আমার মোটে সময় কাটে না। লেখাপড়া করেছি কি ঘরে বসে থাকার জন্য? কোনও চাকরি বাকরি করলেও না হয়…
চাকরি? চাকরি বা করতে হবে কেন? আমি কি টাকা রোজগার করছি না? কিষান তাজ্জব হয়ে প্রশ্ন করে।
তা করছ।
আর এই যে আমি ব্যস্ত থাকি, সে তো এ সংসারের জন্যই। আমি কাজ না করলে তুমি থাকবে কোথায়, খাবে কী! পরবে কী? গলার স্বর ক্রমে উঁচুতে উঠছে কিষানের।
সে কি কেবল আমার জন্যই করছ! বিয়ের আগেও তুমি এ কাজই করতে। আমাকে ভরণ পোষণ করতে হবে বলে কি কাজ নিয়েছ? তা তো না। নীলার অদ্ভুত শান্ত গলা।
ওহ নীলা, কিষান সোফায় ধপাস করে বসে বলে, তুমি তো বেশ কথা বলতে জানো! এত কথা শিখলে কোথায়।
কোথাও তো শিখিনি। এ তো সবাই বলতে পারে।
কিষান সজোরে মাথা নেড়ে বলে, না না না, ভারতীয় বউরা এমন বলে না।
নীলা আবারও আগের সেই শান্ত গলায় বলে, ভারতীয় বউ কারা এমন বলে না। তোমার দিদিমা বলে না, তোমার ঠাকুরমা বলে না। এই তো!
কেউ বলে না। কিষান চেঁচাল।
আসলে কী জানো, তোমার এক বোবা মেয়ে বিয়ে করা উচিত ছিল। মুখ বুজে সংসারের কাজ করবে, এমন এক মেয়ে। সাত চড়ে রা করবে না এমন এক মেয়ে। তিন কুলে যার কেউ নেই, এমন মেয়ে। লেখাপড়া না জানা মেয়ে। মাথায় গোবর ছাড়া কিছু নেই, এমন মেয়ে। সাধ নেই স্বপ্ন নেই এমন মেয়ে। নীলা চিবিয়ে চিবিয়ে বলে।
কিষানের গলার স্বর সপ্তম থেকে নবমে, লেখাপড়ার বড়াই করছ কেন? এমন তো নয় যে ডাক্তার হয়েছ বা ইঞ্জিনিয়ার হয়েছ। তোমার ওই বাংলাসাহিত্যের লেখাপড়া দিয়ে কী করতে পারো তুমি। এক ফ্রাঁ উপার্জন করতে পারবে? পারবে না। তোমার সারাজীবনই আমার ওপর নির্ভর করতে হবে, এ ছাড়া তোমার উপায় নেই। সুতরাং দেমাক কমাও, এত দেমাক দেখিয়ে তোমার যে কোনও লাভ হবে না মাথায় সামান্য ঘিলু থাকলে বুঝতে পারতে।
কিষান উঠে দাঁড়ায়। হাঁটে, কোনও কারণ ছাড়াই ঘরময় হাঁটে। ভারী শরীরের ধপ ধপ শব্দ তুলে মেঝেয়, হাঁটে। জল খায়। এক গেলাস। দু গেলাস। হাঁটে। এরপর ভারী কণ্ঠে বলে, শোনো, সুনীল চৈতালি দুজনই চাকরি করে, ওরা দিনের বেলা বাড়ি থাকে না। আর ক্যাফেতে যাবে কেন, ঘরে চা আছে, সে বানিয়ে খাও। বাইরে খামোখা পয়সা খরচার দরকার কী! জাদুঘর, সিনেমা থিয়েটার, এ সবে আমি যাই না, কিন্তু তোমার যদি এতই যাবার ইচ্ছে, তা হলে ঠিক আছে, আমার সময় হলে আমি নিয়ে যাব।
কিষান বেরিয়ে যায়। সিঁড়িতে শব্দ হয় ধপ ধপ, নামার।
.
টেবিলে চাবির গোছা। নীলা সারাদিনই ঘুরে ফিরে চাবিটি হাতে নেয়, ঘরে আগুন না লাগলে এ চাবি ব্যবহারের কোনও পরামর্শ কিষান দেয়নি।
.
০৭.
কবে তোমার সময় হবে গো?
শনিবার সকালে কিষানের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে নীলা।
নীলার দিকে আরও সরে এসে কিষান তার ডান বাহুটি নীলার শরীরে ছড়িয়ে দিয়ে বলে তোমাকে সময় দেবার সময় তো এই শনি রোববার। সপ্তাহগুলো ব্যস্ততায় কাটে, ঘরে শুয়ে বসে থাকার দুটো কেবল দিন। বউয়ের নরম হাতের স্পর্শ সারাদিন ধরে নেব।
কোদালি দাঁত যতটা সম্ভব আড়াল করে হাসে কিষান। এ হাসিটি তার যে কোনও হাসির চেয়ে ভাল। কিষান সম্ভবত ভাবে এ হাসিটি প্রেমিকের হাসি। প্রথম প্রেমে পড়লে প্রেমিকার সঙ্গে এমনই কায়দায় হাসে প্রেমিককুল।
সারাদিন শুয়ে বসে থাকবে? আর কিছু না? নীলা জিজ্ঞেস করে। মন তার উড়ছে খোলা হাওয়ায়।
কিষান মাথা নাড়ে। আর কিছু না।
আগে একদিন বলেছিলে শনি রোববার হল ঘর পরিষ্কার করার, কাপড় ধোবার।
