আঠারো ক্যারেট মাত্র! কেন গো! আমরা তো বাইশ ক্যারেট পরি।
এরা সোনা তেমন পরে না। পছন্দও করে না। কেনে পাথরের অলংকার।
এরা ধনী হয়েও সোনার অলংকার কেনে না আর গরিব দেশ ভারতে সোনা না হলে চলে। সোনা না পরলে মান যায় জাত যায়। সোনা না হলে বিয়ে হয় না, বিয়ে হলেও সুখ হয় না। নীলার বিয়েতেই অনির্বাণ আট ভরি সোনা দিয়েছেন, চকচকে সোনা। অনির্বাণের ধারণা সোনা থেকে সুখের প্রপাত বইয়ে কন্যার সংসার ভাসিয়ে দিচ্ছে। সোনার প্রতি লোভ ভারতীয় মেয়ে মাত্রই থাকে, নীলারও আছে। কিন্তু আঠারো ক্যারেটের লালচে সোনা কিনতে মোটে তার আগ্রহ জন্মায় না।
আগ্রহ তার সুগন্ধী কেনায়। সুগন্ধীর রাজ্যে ঢুকে নীলা বিবশ হয়ে থাকে। এত সুগন্ধীও জগতে আছে! এ তো সুগন্ধীরই দেশ। এটি পছন্দ হয় তো ওটিও পছন্দ হয়। নীলা পছন্দ করে জিভাঁসির অরগানজা, কিষানের পছন্দ ক্রিশ্চান ডিওরের পয়জন। তা হলে কোনটা কেনা হবে। একেবারে সোজা। কেনা হবে পয়জন।
পয়জনের এত দাম এখানে? কলকাতায় তো অনেক কম।
হ্যাঁ অনেক কম, কারণ ওখানে যা পাওয়া যায়, সব নকল। এখানে আসল, বুঝলে হে, সব আসল।
নীলা সব আসলের ভিড়ে খাবি খায়। সবই আসল, সবই ভাল, সবই সুন্দর।
সুগন্ধী নো হলেও সুগন্ধীর এলাকা থেকে মোটে সরতে চায় না সে। একটি সুগন্ধী সে খুঁজছে, খুঁজছে ইভনিং ইন প্যারিস। পাতি পাতি করে খুঁজেও সেই নীল রঙের ছোট্ট শিশি, সেই ইভনিং ইন প্যারিস কোথাও পেল না। চোখ গেল শ্যানেল নং ফাইভে। শ্যানেলই কিনবে সে, নিজের টাকায় কিনবে।
কিষান চমকায়, কার জন্য?
দাদার জন্য।
সুনীলের এক বন্ধু কলকাতা যাচ্ছে, তার হাতে কিছু জিনিস পাঠানো যেতে পারে, সুনীল নিজে বলেছে।
নিখিলের জন্য তো। অনেক অল্প দামের সুগন্ধী আছে, ওগুলো কেনো। কিষান বলে।
না এটিই কিনব। শ্যানেল নং ফাইভ দাদার খুব পছন্দ। নীলা গোঁ ধরে।
কিষান নীলার হাত থেকে শ্যানেলটি দোকানিকে ফেরত দিয়ে নীলাকে টেনে সরাল দোকান থেকে, গলা চেপে বলল, তোমার কাণ্ডজ্ঞান একেবারে নেই।
নীলা শান্ত গলায় বলে, আসলে কী জানো দাদা আমাকে দুশো ডলার দিয়েছে যেন ঠিক এই সুগন্ধীটিই কিনে তাকে পাঠাই।
ঠিক এটিই?
হ্যাঁ ঠিক এটিই।
নীলা ডলার ভাঙিয়ে শ্যানেল নং ফাইভ কিনল। কিনে, দেখল, তার একরকম আনন্দ হচ্ছে নিজের টাকায় কিছু কিনে। কিষানের কাছ থেকে ব্যাগ ভরে জিনিসপত্র উপহার পাওয়ার চেয়ে বেশি আনন্দ।
.
বাড়ি ফিরে, কিষান মদ নিয়ে বসল, আর নীলা আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান, প্রাণের আশা ছেড়ে সঁপেছি প্রাণ গাইতে গাইতে পয়জন মাখল গায়ে। কিষান জিজ্ঞেস করল, কী গান এটি?
রবীন্দ্রসংগীত।
ওই বাঙালিব্যাটা তো যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিল, তার গান?
হ্যাঁ ওই বাঙালিব্যাটার গান। ওই বাঙালিব্যাটা এই পয়জন সুগন্ধী নিয়ে চমৎকার একটা গান লিখেছে, সেটিই গাইছি।
এই পয়জন?
হ্যাঁ এই পয়জন।
ঠিক এটিই।
হ্যাঁ ঠিক এটিই।
অনুবাদ করে শোনাও তো।
নীলা হেসে বলল, কিছু কিছু গান আছে, যার অনুবাদ হয় না।
কিছু কিছু মানুষ আছে, যার অনুবাদ হয় না। কিষান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে।
আর কিছু কিছু মানুষের অনুবাদ খুব সহজ। নীলা রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ঘরময় সুগন্ধ ছড়িয়ে বলে।
কিষান খেয়ে শুয়ে পড়ার পর নীলা চিঠি লিখতে বসে মলিনাকে।
তুমি যে বলেছিলে, এখানে একা একা কী করে সংসার করব আমি! তুমি একবার এসে দেখে যাও। কাজের লোক নেই, তা ঠিক। কোনও প্রয়োজনও নেই। মেশিনে বাড়ি ভর্তি, এখানে কাজ বলতে সুইচ টেপা। জানো মা, আমি আজকাল রান্না করছি। রান্নায়, আবার ভেবো না, কষ্ট হচ্ছে কিছু। একেবারেই না। কিষান আজ আমাকে অনেক জিনিস কিনে দিল। বারবার বুঝিয়ে দিল সে কিনে দিয়েছে। জীবন তো এরকমই মা, তাই না! স্বামী স্ত্রীকে জিনিসপত্র কিনে দেবে, আর স্বামীর আদেশ মতো স্ত্রী চলবে। জিনিসপত্রের কাছে আমরা একরকম বন্দি। আমাদের হাত পা বাঁধা। তোমাকেও দেখেছি, বাবা দুটো শাড়ি কিনে আনলে কী বিষম খুশি হতে তুমি। বাবাকে খাওয়াতে মাছের মুড়ো দিয়ে, পাশে বসে হাতপাখায় বাতাস করতে। ভালবেসে করতে হয়তো। জিনিসপত্র দিয়ে কি ভালবাসা কেনা যায়? কী জানি! যায় হয়তো। আজ রাতে কিষানের জন্য ডাল মাখানি রান্না করলাম, ও খুব পছন্দ করে খায়।
প্যারিস আশ্চর্য সুন্দর একটি শহর। আজ অপেরার পাশ দিয়ে আসার সময় আমার মনে হয়েছে, কিষানের সঙ্গে বিয়ে হয়ে একরকম ভালই হয়েছে আমার, না হলে এ শহর দেখা হত না। আর এ শহর না দেখে মৃত্যু হলে, জীবন পূর্ণ হত না।
সারাজীবন কেবল অন্যকে আনন্দ দেবার জন্য নিজের জীবন খরচ করলে মা। এবার নিজের কথা ভাবো। নিজে আনন্দ করো। দাদু মারা যাবার পর সম্পত্তি তো ভাগ হয়েছে, তোমার নিজের ভাগ বিক্রি করে টাকা তো পেয়েছ অনেক, কার জন্য জমিয়ে রাখছ সে সব? খরচ করো। নিজের জন্য করো। জীবন আর কদিনের বলো! দেখো, এখানকার লোকেদের ভাত কাপড়ের ভাবনা নেই। এরা জীবনকে ভীষণ রকম উপভোগ করে। এরা প্রাণ খুলে হাসে। আর আমরা হাসি না, ভয়ে হাসি না, কারণ রামশর্মা নামে এক বদমাশ লোক বলে গেছে, যত হাসি তত কান্না।
এটুকু লিখে থেমে পুনশ্চ দিয়ে লেখে দাদার জন্য শ্যানেল নং ফাইভ পাঠালাম, খুব দামি সুগন্ধী। এটি কিষানের টাকায় কেনা না, আমার টাকায়, যে টাকা জমিয়েছিলাম টিউশনি করে।
