লজ্জা, কাকে?
তোমাকে। তাকে।
কেন?
কেনর উত্তর না দিয়ে নীলা তার শাড়িকাপড় পরে নিয়ে সোজা বেরিয়ে গিয়ে, কিষানকে জানায় তার পক্ষে হাসপাতালের অসভ্য প্রস্তাব মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কিষান কোদালি হাসি হেসে নীলাকে ঠেলে দেয় এক্সরে করার ঘরে, উলঙ্গ হতে বললে উলঙ্গ যেন হয় নীলা, পরামর্শ দেয়।
তুমি রাগ করবে না? নীলা জিজ্ঞেস করল।
মহানুভবতার চুড়ান্ত উদাহরণ দেখিয়ে কিষান বলে ডাক্তারের সামনে উলঙ্গ হওয়া কোনও অন্যায় নয়।
.
নীলা লজ্জার মাথা খেয়ে মাথার এক্সরে করে।
দুটো সেলাই নেয় ফাটা বা কাটা কপালে, সেলাই নেওয়ার পর ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রও নেয়, সে নিতে গিয়ে অবশ্য তাকে উলঙ্গ হতে হয়নি।
.
০৫.
কিষানের থুতনির কাছে কাটা দাগের একটি চিহ্ন আছে, এ কারণে, নীলা কখনও বলেনি যে কিষানের রূপের বারোটা বেজেছে কিন্তু তার কপালের ছোট্ট দাগটির জন্য যেটি চুলের তলে ঢাকা পড়ে থাকে, কিষান প্রায়ই মুখ মলিন করে বলে যে নীলার আগের সেই আগুন রূপটি আর নেই।
কাটা ঘা সারার পর ওষুধ খেয়ে চাঙা হতে কদিন পেরোয়, রান্না করার আর ঘর গোছানোর পর যে অবসর জোটে, বই পড়ে কাটায় নীলা। এরপর মুখ থুবড়ে পড়া দিনগুলোকে টেনে হিঁচড়ে যেমন তেমন পার করছিল, তেমনই এক দিনে গান্ধী নামকরণের পর রেস্তোরাঁর ব্যবসা ভাল জমে ওঠায় কিষানের শখ হয় নীলাকে নিয়ে গ্যালারি লাফায়েতে যেতে।
বুলোভার্ড হুসমানের চোখকাড়া বাড়ি দেখতে দেখতে গ্যালারি লাফায়েতে এক বিকেলে থামা হয়। ভেতরে ঢোকাও হয়। চমকানোও হয়।
ও মা, আমি তো ভেবেছিলাম এ একটা গ্যালারি, ছবি টবি থাকে।
এ দোকান, এক দোকানের ভেতরে একশো দোকান। আকাশছোঁয়া রঙিন ছাদে চোখ যায় তার, চোখ সরতে চায় না সেই অসম্ভব সুন্দর থেকে। কিষানের গুঁতো খেয়ে ঘাড় সোজা করতে হয়।
এ দোকান, না কি সোনায় মুড়োনো প্রাসাদ!
নীলা এর আগে এত সুন্দর কোনও দোকান কেন, প্রাসাদও দেখেনি।
এটা কেনো, ওটা কেনো, জুতো কেনো, জামা কেনো, কিষান বলেই যাচ্ছে। কপালের দাগটি সত্ত্বেও নীলা রূপসি রয়ে গেছে, তার হাতের রান্নাও দিন দিন সুস্বাদু হচ্ছে, আর নীলা যেহেতু তারই বউ, তারই সম্পদ, তারই সম্পত্তি, তারই হাতের মুঠোয় নীলার জীবন, নীলাকে আরও সুন্দরী দেখালে লোকে তারই প্রশংসা করে বলবে যে কিষান বড় সুন্দরী বউ পেয়েছে, নীলা ভাল জামা জুতো পরলে এ প্রশংসাও কিষানের, নীলা অসুখ থেকে সেরে উঠলে লোকে বলেছে কিষান তার বউকে সারিয়ে তুলেছে, নীলার কিছুতে যেহেতু নীলার কিছু নয়, সবই কিষানের, নীলার প্রতি উদারতা তাই উথলে উঠেছে তার, এ আসলে কিষানের নিজেকেই নিজের ভালবাসা, নীলা অনুমান করে।
জুতোর দোকানে ঢুকলে দোকানি নীলার পায়ের মাপ জিজ্ঞেস করে। মাপ তো দাদা জানি না! নীলা মাপ জানবে কেন, কলকাতার জুতার দোকানে ঢুকে যে জুতো বা স্যান্ডেল পায়ে আঁটে, তা কিনে অভ্যেস তার। এ মাসে আট নম্বর জুতো আঁটসাঁট হল, পরের মাসে দেখা যায় সাত নম্বরই বড় হচ্ছে। তবে কি পা কুঁকড়ে যাচ্ছে, না পা কুঁকড়োচ্ছে না, জুতোর মাপের ঠিক নেই। জুতোঅলারা যার যা পছন্দ নম্বর বসিয়ে দেয়, যার পায়ে জুতো দরকার দোকানে এসে একটি পর একটি জুতো পরে পরখ করে তবে কেনে। এরকমই নিয়ম।
কিষান জুতোর তাক থেকে একজোড়া বুটজুতো নিয়ে বলে, পরে দেখো তো।
ও মা এ তো ছেলেদের জুতো। নীলা জিভে কামড় দেয়।
এ মেয়েদের।
কিষান বলে, দোকানিও বলে এ মেয়েদের।
জুতো কিনে জামা কাপড়ের দোকানে এসে নীলা ঝামেলায় জড়ায় আবার। পান্তলুনে হাত রাখতেই কিষান সরিয়ে নেয় নীলাকে, ও সব ছেলেদের।
তা হলে এই শার্ট!
এও ছেলেদের!
কী তফাত গো ছেলেদের মেয়েদের পোশাকে? নীলা উৎসুক জানতে। কলকাতায় মেয়েদের ছেলেদের জামা কাপড় জুতোয় আকাশ পাতাল তফাত। শাড়ি, সালোয়ার কামিজ, ফিতেঅলা চটি মেয়েদের আর ছেলেদের ধুতি, ফতুয়া, স্যান্ডো গেঞ্জি, শার্ট, প্যান্ট, টাই, জুতো, মোজা। তফাত স্পষ্ট। এ দেশে একই রকম পোশাক ছেলে মেয়েরা পরছে, দু পোশাকে তফাত বোঝা কঠিন। বোতামের ঘর এদিক না হয়ে ওদিক, কোমরের কাছটা সামান্য চাপা, বুকের কাছে একটি বাড়তি সেলাই, খুব মন দিয়ে না দেখলে কোনটি কার তা বোঝা যায় না। কিষানের মতে প্রচুর তফাত, কোমরে তফাত, নিতম্বে তফাত, দৈর্ঘে তফাত, প্রস্থে তফাত।
তোমার মাপ কী?
মাপ তো জানি না! নীলা তার মাপ জানবে কেন, মাপ জানে পাড়ার দরজি।
আর ওই লাল সোয়েটার, ওটি বেশ সুন্দর তো।
হাত দিয়ো না। ও ছেলেদের।
মেয়েদের সোয়েটারের সঙ্গে এটির তফাত কোথায়?
আছে। ঘাড়ে, গলায়, কোমরে, বুকে।
বুকে শব্দটি বলে কিষান কনুইয়ে আলতো চাপ দেয় নীলার বুকে।
কমলা রঙের একটি মেয়েদের সোয়েটার কিনে কিষান যখন দাম দিতে যায়, নীলা বলে পাঁচশো ফ্রাঁ এর দাম, তার মানে সাড়ে তিন হাজার টাকা?
এরকমই দাম এ সবের। কিষান হাসে।
কিছু কম করে দিতে বলো। দুশো ফ্রাঁ-এ দেবে কি না জিজ্ঞেস করো।
এ দেশে দরাদরি নেই। দাম যা লেখা আছে, তাই।
.
যে দোকানে কোনও ভিড় নেই সে সোনার দোকান। আর এ দোকানেই নীলা আটকে যায়। সোনায় বানানো নানান অলংকার।
সোনার এমন লালচে রং কেন?
আঠারো ক্যারেটের সোনা এরকমই দেখতে হয়।
