বিয়ে ছাড়া? নীলা আবার প্রশ্ন করে।
নিশ্চয়ই। বিয়ে আজকাল কেউ করে না। আর করলেও অনেক পরে। পাঁচ ছ বছর এমনকী দশ বছর একসঙ্গে থাকার পর। বাচ্চা কাচ্চা হলে পর।
লেখাপড়া? নীলার কৌতূহল ক্রমাগত বাড়ে।
লেখাপড়া করতে এ দেশে পয়সা লাগে না। সরকারই দেয়। আর মেয়েরা লেখাপড়ার পাশাপাশি ছোটখাটো কাজ করে, চলে যায়।
খুব মুক্ত জীবন। নীলা বলে।
হ্যাঁ, এদের মূল উদ্দেশ্য জীবনকে উপভোগ করা, সে যে ভাবেই হোক। কিষান বলে, ঠোঁট তার উলটে থাকে, নাক কুঁচকে থাকে।
যত্তসব। কিষান বলে, এই মেয়েরা সতীত্ব হারায় কখন জানো তো! পাঁচ ছ বছর বয়সে, ডাক্তার ডাক্তার খেলতে গিয়ে। কুড়ি বছরের আগেই একশো একটা ছেলের সঙ্গে ঘুমোনো সারা। কোনও আদর্শ নেই, মাইরি। আজ একে ভালবাসল তো কাল ছেড়ে গেল, পরশু আরেক জনের সঙ্গে, এরা কোনও স্থায়ী বন্ধনে নেই। এরা জানে না কী করে স্থির হতে হয়, কোথায় এবং কখন। এরা জানে না, পারে না।
নীলা ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শোনে নিজের ভেতরে কোথাও, চলো ওই সেতুতে থামি কিষান, ওই পঁনফে, একটু হাঁটি। চলো সেইন নদীটি দেখি ঝুঁকে, ঢেউ কী করে ফুলে ফুলে আসছে দেখি, দূর থেকে নতরদামের চুড়োর আলো ঢেউগুলোর মাথায় কেমন সোনার মুকুট পরাচ্ছে দেখি।
কিষান গাড়ি থামায় না। হাতে স্টিয়ারিং তার, হাতে যার স্টিয়ারিং, তার ক্ষমতা অনেক, নীলা জানে। তবে কিষানকে থামতে হয় রিপাবলিকের মোড় থেকে যখন শাঁ শাঁ শব্দ তুলে ধেয়ে আসে হাজার হাজার রোলার স্কেটার, হাজার প্রজাপতির মতো উড়ে, তখন। নীলা দুচোখে রাজ্যির বিস্ময় নিয়ে দেখে তরুণ তরুণীর জুতোয় চাকা লাগানো, চাকা চলছে, জুতো চলছে, ওরাও চলছে। তারুণ্যের এমন বিচ্ছুরণ, নবীন প্রাণের জাগরী নিনাদ এর আগে এত কাছ থেকে নীলা দেখেনি, শোনেনি।
এ সব করছে কেন এরা?
কিষান বলে, আনন্দ করতে।
কী করতে?
আনন্দ। আনন্দ। কিষানকে চেঁচাতে হয়।
কেবলই আনন্দ?
কেবলই।
নীলা বেরিয়ে আসে বাইরে, দু চোখ মেলে দেখে গতিময় মানুষ, নীলাকে পেছনে রেখে চলে যাচ্ছে, চোখের পলকে যাচ্ছে, হাওয়ার গতিতে যাচ্ছে, জীবনের গতিতে যাচ্ছে আর গতিহীন নীলা, স্থবির নীলা দাঁড়িয়ে থাকে একা, দুচোখে বিস্ময় তার, দুচোখ জুড়ে মুগ্ধতা।
কিষান তাড়া দিলে গাড়ির ভেতরের অন্ধকারে ঢুকতে হয় নীলাকে, যদিও তার ইচ্ছে করছিল রাস্তায় হাঁটতে, দৌড়োতে, চাইছিল শরীরে মনে নির্ঝরের গতি, চাইছিল সারারাত তারুণ্যের উল্লাসে মেতে উঠতে, কিন্তু কিষান, যেহেতু কিষান তার স্বামী, আর যেহেতু স্বামীর আদেশ অমান্য করা অন্যায়, যেহেতু স্বামী ছাড়া সে চলৎশক্তিহীন, ডাকলে তার ইচ্ছের পায়ে শেকল পরাতে হয়।
কী অপূর্ব! অন্ধকার বলে কিছু নেই এখানে। সবই উজ্জ্বল, আলোকিত, সবই জীবন্ত। বার বার বলে নীলা।
.
বাড়ির কাছে পৌঁছে গাড়ি রাখার জায়গা খুঁজতে বড় রাস্তার এ মাথা থেকে ও মাথা, এক গলি থেকে আরেক গলিতে কলুর বলদের মতো ঘোরে কিষান। জায়গা ঘণ্টাখানেক পর মেলে।
গাড়ি গ্যারেজে না রেখে রাস্তায় রাখছ যে? নীলা বেরিয়ে বলে।
কারও গ্যারেজ আছে নাকি, সব্বাই তো রাস্তাতেই রাখে।
কলকাতায় রাস্তায় এরকম গাড়ি পড়ে থাকতে নীলা দেখেনি। অনির্বাণের অ্যামবেসেডার গাড়িটির লেজের দিকটা ডেবে গেছে, দরজায় জং ধরেছে, তারপরও ওটি রাখা হয় গ্যারেজে, রেখে আবার শক্ত তালাও লাগানো হয় গ্যারেজের দরজায়।
এই যে রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাড়ি দাঁড়ানো, সারারাত এখানেই থাকবে গাড়ি?
কিষান মাথা নাড়ে। থাকবে। থাকে। থেকে আসছে।
চুরি হয় না?
চুরি হবে কেন?
নীলা ভাবে, তাই তো চুরি হবে কেন? এ তো চোর ডাকাতের দেশ নয়।
বাড়ি থেকে গাড়ি দূরে রাখাতে নীলার একরকম ভালই লাগে, অনেকটা পথ এখন সে হেঁটে যাবে, অনেকটা পথ সে দেখে দেখে যাবে পথের চরিত্র। আলোর প্লাবন বইছে বন্ধ দোকানগুলোয়, ইটের নয় কাঠের নয় পাথরের নয়, কাচের দেয়াল দোকানগুলোর। নীলা কাচের ওপারে দেখে সারি সারি অলংকার সাজানো, দামি পাথরের, সোনার রুপোর মুক্তোর হিরের। যে কেউ ইচ্ছে করলে কাচ ভেঙে ভেতরে ঢুকে অনায়াসে হাতিয়ে নিতে পারে অমূল্য সব মণিমুক্তো।
চুরি হয় না?
কিষানের কণ্ঠস্বরে এক রাশ বিস্ময়, চুরি হবে কেন?
নীলার চেতন ফেরে, তাই তো, চুরি হবে কেন? এ তো কলকাতা নয়।
.
০৪.
কোনও ঘটনা না ঘটলে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কাও থাকে কম, কিন্তু নীলার সাদামাটা ঘটনাবিহীন জীবনে হঠাৎ এক দুর্ঘটনা ঘটে যায়। স্নানঘরে পা পিছলে কপাল ফাটে তার। ফাটা কপালের কপাল ফাটা বড় ভয়ানক, নীলার ধারণা। মাথা গিয়ে পড়েছিল বাথটাবের কোণে, স্রোতের মতো রক্ত বয়ে গেছে। কিষানকে ফোনে খবর দেওয়ার শক্তিটুকু শেষ অব্দি ছিল, ভাগ্য। তড়িঘড়ি বাড়ি পৌঁছে নীলাকে নিয়ে কিষান দৌড়োল লারিবুয়াসিয়ের হাসপাতালে, গার দ্য নর্দের কাছেই সে হাসপাতাল। কলকাতার হাসপাতালে শত রোগীর উপচে পড়া ভিড় দেখে নীলা অভ্যস্ত, আর এ হাসপাতালের অপেক্ষাঘরে পাঁচ কি ছ জন রোগী বসে আছে, ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরা, দেখে রোগী বলে বিশ্বাস হয় না, যেন বাড়িটির ভোজসভার নিমন্ত্রিত অতিথি এরা। নীলার গায়ে রক্তমাখা শাড়ি, পাতলা তোয়ালেয় পেঁচানো মাথা, নীলরতন-বর্হিবিভাগের জলজ্যান্ত রূপ। একজন একজন করে ডাক পড়ছে ভেতরে। ডাক পড়লে নীলাকে ভেতরে যেতে হয়, নার্স বলে, গায়ের সব কাপড় চোপড় খুলে পাতলা একটি বুক খোলা জামা পরে পরীক্ষা করার বিছানাটিতে শুয়ে পড়তে। মাথা পরীক্ষা হলে পরনের সব কাপড় খুলতে হবে কেন, নীলা বুঝে পায় না, দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থাকে। নার্সকে ডেকে স্মরণ করিয়ে দেয়, মাথা ছাড়া আর কোথাও তার কোনও অসুবিধে নেই। নার্স বলে, মাথা হোক, পায়ের আঙুল হোক, কাপড় খুলতেই হবে। এরকমই নিয়ম? এরকমই নিয়ম। শাড়ি ব্লাউজ পেটিকোট খুলে হাসপাতালের সাদা জামাটি পরে নেয় নীলা। নার্স দেখে বলে, জামার তলে কোনও সুতো থাকলেও চলবে না। ব্রাও খুলতে হবে? ব্রাও। প্যান্টিও? প্যান্টিও। নীলা খোলে, শোয়, ডাক্তার এসে নাড়ি দেখে, মাথা টেপে, পাঠিয়ে দেয় এক্সরে করতে। এক্সরে করতে গিয়ে মহা বিপদ, পুরো উলঙ্গ হয়ে এক্সরে টেবিলে শুতে হবে। নীলা জিজ্ঞেস করল মাথার এক্সরে হলে উলঙ্গ হতে হবে কেন? ওরা বলে হতে হবে। বুকের এক্সরেও হবে, বুকের এক্সরে হলেই বা উলঙ্গ হওয়ার দরকার কী? ওরা বলে দরকার আছে। মাথা হোক, বুক হোক, পেট হোক, পা হোক, পায়ের আঙুল হোক, এক্সরে করতে হলে পুরো উলঙ্গ হতেই হবে। এরকমই নিয়ম? এরকমই নিয়ম। নীলার বাবা অনির্বাণ নিজে ডাক্তার, নীলা নিজে বহুবার হাসপাতালে গেছে, ঘুরে ঘুরে হাসপাতালের নানা বিভাগ দেখেছে সে, নিজের বুকের এক্সরে একবার করতে হয়েছিল, পরনের কোনও কাপড় খুলতে হয়নি। এখানে উলঙ্গ হওয়ার প্রস্তাব শুনে নীলা লজ্জায় মাটির সঙ্গে কেবল মিশে যায় না, মাটির তলেও ঢুকে যায় মনে মনে। তার পক্ষে পুরো ন্যাংটো হয়ে ড্যাং ড্যাং করে স্তন দেখিয়ে নিতম্ব দেখিয়ে নার্স ডাক্তারের সামনে হেঁটে যাওয়া সম্ভব হয় না। সম্ভব না হলে চিকিৎসাও হবে না জানিয়ে দেওয়া হয়। নার্স এবং ডাক্তার ঠিক বুঝে পায় না নীলা চিকিৎসা নাকচ করে দিচ্ছে কী কারণে। লজ্জায় শেষ পর্যন্ত তাকে উচ্চারণ করতে হয়েছে লজ্জা শব্দটি। সে যে লজ্জা করছে এ সহজ ব্যাপারটি তবুও কারও বোঝার ক্ষমতা নেই। দুবার বলার পর নার্স আর ডাক্তার দুজনের চোখ কপালে ওঠে।
