খাওয়া শেষে বাটায় পান নিয়ে দিদিমা ঠাকুরমাদের মতো চৈতালি বসে সুনীলের সামনে, এই পুজোয় পবন দাস বাউলকে ডাকছ তো?
নীলা পান মুখে দিয়ে বলে, এই প্যারিসে পুজোও হয়?
কেন হবে না? রীতিমতো ঘটা করে হয়।
সুনীল মাথা চুলকোয়। পুজোকমিটির সভাপতির পদ পেয়েছে সে এ বছর, এত দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কাঁধ ঝুলে পড়ার জোগাড়। আমার এত পোষায় না। জয়ন্তকে দেব দায়িত্ব।
জয়ন্তকে দেবে, ও তো বাংলাদেশি!
তা হোক হিন্দু তো।
তার চেয়ে অসীম রায়কে দাও। গতবার বাংলাদেশিগুলো মণ্ডপ করবে বলল টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেল, ভুলে গেছ? চৈতালি অদৃশ্য এক অনুযোগের বাটাও পানের বাটার সঙ্গে নিয়ে বসেছে।
সুনীল ভোলেনি।
বাঙালির মাঝখানে শক্ত এক দেয়াল, নীলা অনুমান করে। বাংলাদেশের বাঙালিরা বেশির ভাগই এ দেশে অবৈধভাবে এসেছে, থাকেও অবৈধভাবে, কাজও করে অবৈধভাবে। যতসব অবৈধ ছোটলোক। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি বাঙালি যত না, তার চেয়ে বেশি ভারতীয়। পাঞ্জাবি, মরাঠি বা গুজরাটি যাকে পাক দেশি ভাই বলে জড়িয়ে ধরে ফরাসি, হিন্দি, ইংরেজি ধুমসে বলে যাচ্ছে, কেবল পেচ্ছাপ পায়খানা চেপে রাখার মতো বাংলাটা পেটে চেপে রাখে, ব্যাস। বাংলা হচ্ছে আড়ালে আবডালে, না পারতে।
তিন বাঙালির মাঝখানে কিষানলালকে একটি রামছাগলের মতো দেখতে লাগে। রামছাগলটি, নীলা কায়মনোবাক্যে কামনা করে, একা বাড়ি ফিরে যাক, বাড়ি ফিরে একা ঘরে মদ খাক, মদ খেয়ে একা বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ক, সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখুক সে একা, তার নাস্তা তৈরি করার কেউ নেই ঘরে, কেউ নেই তার জুতোর ফিতে বেঁধে দেবার, সন্ধে বা রাতে ফিরেও দেখুক সে একা, তার জুতো মোজা খুলে দেবার কেউ নেই, রান্না করার, টেবিলে খাবার সাজিয়ে দেবার, পরিবেশন করার কেউ নেই, একা সে কথা বলুক নিজের সঙ্গে, একা সে কাঁদুক। কিষান একা বাড়ি ফিরবে না, একা তার না ফেরায় সায় দেয় সুনীল। সুনীলের চশমাচোখের লম্বাটে মুখের দিকে তাকিয়ে নীলা ভাবে, এই লোকটি প্রেসিডেন্সি কলেজে নিখিলের সঙ্গে পড়ত, লোকটি নীলাদের বালিগঞ্জের বাড়িতে অনেকদিন গিয়েছে, মলিনা যত্ন করে ছেলে আর ছেলের বন্ধুকে খাইয়েছেন। মাসিমার হাতের রান্নার তুলনা হয় না! খেয়ে ঢেকুর তুলতে তুলতে এই লোকটি অনেকদিন বলেছে। নীলা বেণী দুলিয়ে ইস্কুল থেকে ফিরলে লোকটি প্রায়ই বলত, কীরে পাগলি, এত লেখাপড়া করে কী হবে, বরের ঘরে গিয়ে তো ওই হাঁড়িই ঠেলবি! নীলা জিভ দেখিয়ে চলে যেত অন্য ঘরে। সেই জিভ দেখানো মেয়ে, পরোয়া না করা মেয়ে, দিব্যি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ডিঙিয়ে গেল তরতর করে, অশিক্ষিত গৃহবধূ না হতেই তো! হাঁড়ি ঠেলার কাজ না নিতেই তো! লেডি ব্রেবোর্ণ কলেজে নয়তো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ছাত্রী পড়াবে, এই স্বপ্ন নিয়েই তো! আর শেষ অব্দি, এই লোকটি, এই সুনীল, নিখিলের বন্ধু সুনীল, এক কদাকার ব্যবসায়ীকে পাঠিয়ে দিল নীলার স্বপ্নের বাগানে মোষ চরিয়ে দিতে, নীলাকে তুলে এনে হাঁড়ি ঠেলার কাজে লাগাতে! ভেবে তার অবাক লাগে, নিখিলের এই বন্ধুটির হাতেই ছিল তার ভবিষ্যৎ। নিখিলের এই বন্ধুটি বিশ্বাস করত, নীলাকে হাঁড়ি ঠেলতে হবে যত বিদুষীই সে হোক না কেন! ঠিকই নীলা হাঁড়ি ঠেলছে। আগের মতো আর সে জিভ দেখাতে পারে না। জিভ এত ভারী আর শক্ত হয়ে আছে যে ইচ্ছে করলেও সম্ভব নয়। নীলার নিজের কোনও মাটি নেই, যেখানে সে স্বপ্ন রোপণ করবে। নীলার রাগ হতে থাকে সুনীলের ওপর।
.
বাড়িতে ফিরতে গিয়ে রাতের উজ্জ্বল প্যারিস দেখতে দেখতে মনে মনে ঘ্রাণ নেয় নীলা ছোটবেলার সেই সুগন্ধীর, সেই ইভনিং ইন প্যারিস নামের সুগন্ধীর। রাস্তায় ছেলে মেয়ের কোলাহল, মেয়েরা নিশ্চিন্তে হাঁটছে, শিরদাঁড়া টান করে, শক্ত করে। আতঙ্কের লেশ নেই কোথাও, পদক্ষেপে দ্বিধা নেই কোনও।
রাস্তায় এত রাতেও মেয়েরা একা একা হাঁটে? ভয় পায় না? নীলা জিজ্ঞেস করে।
কীসের ভয়? কিষান পালটা জিজ্ঞেস করে।
তাও তো কথা! নীলা ভাবে, কীসের ভয়। এ তো আর কলকাতা নয় যে ঝোপের আড়াল থেকে পাঁচটা কামুক বা ডাকাত অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে মেয়েদের ওপর। টাকা পয়সা গয়নাগাটি মান সম্মান এমনকী জীবন, যদি ইচ্ছে হয়, ছিনিয়ে নেবে।
নীলা জিজ্ঞেস করে, আঙুল তুলে একটি মেয়েকে দেখিয়ে, এই মেয়েটি, এই ধরো ষোলো সতেরো বছরের মেয়ে, সামনের ওই বাড়ি থেকে এই বেরোল, কোথায় যাচ্ছে বলো তো এত রাতে!
কিষান উত্তর দেয়, হয়তো কোনও বারে, নয়তো ডিসকোতে, সারারাত আড্ডা দেবে, নাচবে, আনন্দ করবে।
ওর মা বাবা কিছু বলবে না? বড় বড় চোখে নীলা তাকায় কিষানের দিকে।
যদি শুক্রবার রাতে এ বয়সি মেয়েরা ঘরে বসে থাকে, যদি কোনও ছেলে বন্ধু না থাকে, যদি না শোয় কোনও ছেলের সঙ্গে, তা হলে মা বাবাই বরং বিষম ভেঙে পড়ে। ভাবে যে এ মেয়ের যৌনাঙ্গে অথবা মস্তিষ্কে দুরারোগ্য কোনও ব্যাধি আছে। মেয়েরা বেরিয়ে গেলে মা বাবা নিশ্চিন্তে ঘুমোয়, আর ঘরে থাকলে বরং দুশ্চিন্তায় সারারাত না ঘুমিয়ে কাটায়। আর বেশির ভাগই তো এ বয়সে বেরিয়ে যায় বাবা মায়ের বাড়ি থেকে। নিজেরা একা থাকে নয়তো প্রেমিকের সঙ্গে থাকে।
