কিষানের মোটা ঠোঁটে মোটা হাসি, তোমার বাবার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের পণের টাকা পেলে ঠিকই পারি। আজই পারি।
নীলা ঘাড় বাঁকায়, কেন? সুনীল কি পণের টাকায় বাড়ি নিয়েছে এ অঞ্চলে?
সুনীলের সঙ্গে আমার তুলনা! ও ডাক্তার, কোটি টাকা কামায়। আমি ভাই খেটে খাওয়া মানুষ। আমার ব্যবসায় প্রায় লালবাতি জ্বলছে।
সুনীলের বাড়িটিতে নীলার বোধ হচ্ছে না যে সে অতিথি, যেন এ তার নিজের বাড়ি অথবা আপন কারও বাড়ি। কিষানের বাড়ির চেয়ে এ বাড়িতেই, সে লক্ষ করে, সহজবোধ তার বেশি, স্বস্তিবোধ অসামান্য। দেয়ালে সোনালি ফ্রেমে ঝুলে আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষ বসু, স্বামী বিবেকানন্দ। তিন খ্যাতিমান বাঙালি। বিবেকানন্দ নিয়ে নীলার মনে খুঁতখুঁতি আছে, লোকটি মেয়েদের বাল্যবিবাহের পক্ষে ছিলেন, বিধবাবিবাহের বিপক্ষে ছিলেন। ছিলেন না কি? নীলা জিজ্ঞেস করে, সুনীল বলে যে সে জানে না, জানে চৈতালি, চৈতালি ব্যস্ত রান্নায়, বিবেকানন্দের বিবেক বলতে কিছু ছিল না, এ ধরণের মন্তব্য তার শোনার ইচ্ছে নেই। বইয়ের আলমারিতে একগাদা বাংলা উপন্যাস, গান বাজছে আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইল না কেহ…ঝুঁকে বই দেখতে দেখতে গানটি গানের সঙ্গে গাইতে গাইতে রান্নাঘর থেকে আসা সর্ষে ইলিশের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়া ঘরে, নীলার ইচ্ছে করে, থেকে যায়। বইয়ের তাক থেকে তিনটে বাংলা উপন্যাস আর উনিশ শতকে ফরাসি শিল্পচেতনা হাতে নিয়ে ধার নেবার অনুমতি চাওয়ার আগেই নীলা দেখে সুনীল মাথা নাড়ছে, অর্থাৎ অনুমতির অপেক্ষা কোরো না।
আর দুটো রবীন্দ্রসংগীতের ক্যাসেট? কণিকার? এতেও কোনও বাধা নেই।
নীলা প্রফুল্লচিত্তে পায়ের ওপর পা তুলে পা নাচাতে থাকে, হাতে জর্জ পেরেকের একটি বই, নাচের পা জোড়া মেঝে থেকে সোফায় ওঠে, কুণ্ডলী থেকে ধীরে ধীরে সিধে হয়, মাথা কাত হতে হতে সোফার এক কোণে, পা ছড়াতে ছড়াতে সোফার আরেক কোণে। কলকাতার বাড়িতে সোফায় বিছানায় মাঠে উঠোনে মেঝেয় শুয়ে নীলা এরকম জগৎ ভুলে মেতে থাকত বইয়ে। সুনীল এবং কিষান দুজনই মন্তব্য করে সাহিত্যের ছাত্রী তো, বইয়ের নেশা থাকবেই।
কী ব্যাপার, বই পড়তে এখানে এসেছ নাকি?
কিষানের মন্তব্যে নীলা সোজা হয়ে বসে। বৈঠকঘরে দুটো পুরুষমানুষ বসে গল্প করছে। সেখানে নীলার এরকম সোফায় শুয়ে বই পড়া মোটেই শোভন নয়, তার বরং রান্নাঘরে গিয়ে চৈতালিকে সাহায্য করা দরকার।
রান্নাঘরে না গিয়ে সে সুনীলকে একটি বাক্য তৈরি করতে বলে যেখানে কোনও আকার নেই, ইকার নেই।
সুনীল কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে, বাক্য তৈরি সম্ভব হয় না।
জর্জ পেরেক ইকার ছাড়া এই আজদাহা বইটি লিখেছে। ভাবা যায়! নীলা তখনও বুঁদ হয়ে আছে, পেরেকে।
কী অসামান্য প্রতিভা! বিভোর নীলা।
তাই নাকি তাই নাকি বলে সুনীল কিছুক্ষণ আগ্রহ দেখিয়ে কিষানের রেস্তোরাঁ ব্যবসার গল্পে পরক্ষণেই মেতে ওঠে।
এই বইটিকে নীলা ধারের বইয়ের কাতারে রেখে কাঠের মেঝেয় হামাগুড়ি দিয়ে টুম্পার দিকে এগোয়। এই টুম্পামণি আমাকে খেলায় নেবে? টুম্পা আপন মনে খেলতে থাকে, ফিরে চায় না।
টুম্পামণি, ওই যে কথা বলা পুতুলটা দেবে আমাকে?
টুম্পা কথা বলে না।
সুনীল বলল, ও বাংলা জানে না।
নীলা অবাক হয়। বাঙালি মেয়ে বাংলা বলতে জানে না, জানে কেবল ফরাসি। ইস্কুলে ফরাসি বলে, ঘরেও ফরাসি। সুনীল চৈতালি নিজেদের মধ্যে বাংলায় বললেও টুম্পার সঙ্গে বলে ফরাসি।
ওকে বাংলা শেখান না কেন?
দুটো ভাষা শেখার চাপে ওর মাথাটা যাবে। এ সুনীলেরও মত, চৈতালিরও। বাংলা শিখে লাভ কী, কী কাজে লাগবে এ ভাষা!
নীলা কলকাতাতেও দেখেছে, বাঙালি বাচ্চাদের ইংরেজি ইস্কুলে পাঠানো হয়, ঘরেও তাদের সঙ্গে ইংরেজি বলা হয়, যেন বাংলা কোনও অস্পৃশ্যদের ভাষা, আর এরকম যুক্তিই দেওয়া হয় বাংলা জেনে কী লাভ! ভারতবর্ষের বাংলা মুল্লুকে অর্থনৈতিক দুরবস্থা, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে বড় বড় বিদ্বান বসে আছে, চাকরি জোটে না, জীবিকার তাগিদে অন্য রাজ্যে পাড়ি দিতে হয় বাঙালিদের, উত্তরপ্রদেশে, মহারাষ্ট্রে, ও সব রাজ্যে বাংলা চলে না, ইংরেজি ভাল জানলে যে কোনও রাজ্যে চাকরি পাওয়া সহজ হয়, সে কারণে বাংলার প্রতি অনীহা। নীলা সব জেনেও বাংলা সাহিত্যে লেখাপড়া করেছে, অনির্বাণ বলেছিলেন, এ পড়ার কোনও মূল্য নেই, কিন্তু প্রতিবাদ করেছে সে, পৃথিবীতে একুশ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে, এর মূল্য থাকবে না কেন? পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা এটি, এর লিখিত সাহিত্যই হাজার বছরেরও অধিক পুরনো, বাংলার যত গভীরে গেছে, ততই অমূল্য সম্পদের খোঁজ পেয়েছে সে, কোনও গোপন হিরের খনির সন্ধান পাওয়ার মতো। এ ভাষাটি নিয়ে অন্যভাষীরা গৌরব করলেও, নীলা দেখেছে, বাঙালিরাই এই ভাষায় কথা বলতে, লিখতে, বাংলাভাষী বলে নিজেদের পরিচয় দিতে কুণ্ঠিত বোধ করে।
টেবিলে হরেক রকম খাবার এনে রাখে চৈতালি, খাবারের গন্ধেই জিভে জল চলে আসে নীলার। ডালের বড়া, শুক্তো, পোস্ত, বেগুনভাজা, ফুলকপিভাজা, ছোট মাছের চচ্চড়ি, রুইমাছের পাতুরি, সরষেইলিশ, চিংড়িমাছের মালাইকারি, মুরগির ঝোল, ভেড়ার মাংসের কালিয়া খেতে খেতে নীলার মনে হয়, দীর্ঘদিন সে উপোস ছিল। ভরপেট খেয়ে সোফায় গা এলিয়ে দেয়, সে জানে, জিজ্ঞেস করলে চৈতালি পই পই করে বলবে কোন দোকান থেকে কোন মাছ কিনেছে, কোন দোকান থেকে মাংস। এ সব জেনে নীলা এও জানে, তার কোনও লাভ নেই। কিষানের বাড়িতে মাছ মাংস কেন, এর গন্ধও ঢুকলে চলবে না।
