নীলাও বেঁচেছে, নীলারও তো হাড়গোড় ভাঙতে পারত, বুটের চাপে ফুসফুস ফেটে যেতে পারত, হৃৎপিণ্ড ফুটো হতে পারত। হয়নি। দানিয়েল এক্সরের কাগজ হাতে নিয়ে সুখবর সুখবর বলে চেঁচিয়েছিল। সুখবরই বটে।
নীলার হাতের ওপর কালো কোমল হাত রেখে মনি বলেছে, যে এক মাসের বাচ্চা আবর্জনার স্তূপে চাপা পড়ে মরেনি, সে কেন সুস্থ সবল হবার পর আপেল কাটার সামান্য ছুরির আঘাতে মরবে?
ফ্রেডেরিক মরুনিকে নিয়ে পরদিন প্যারিসে রওনা হয়ে যাবার পর নীলার আর থাকতে ইচ্ছে করেনি, সেও মিমিজঁ থেকে প্যারিসে ফিরেছে, দানিয়েল আর নাতালি অবশ্য আরও দুদিন কাটিয়ে তবে ফিরেছে।
প্যারিসে ফেরার পর রিভিয়েরা থেকে প্রতিদিনই বেনোয়া নীলাকে ফোনে জ তেম বলেছে। প্যারিসের আবহাওয়ার খবর নিয়েছে, নীলা কী খেয়েছে, কী পরে আছে, বেনোয়াকে মনে পড়েছে কি না, ওকে ভালবাসে কি না এ সব জিজ্ঞেস করেছে। নীলা বলেছিল ওই ঘটনার কথা সে ভুলতে পারছে না, রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠে দেখে বুক ধড়ফড় করছে, গা ঘামছে। বেনোয়া তখন বলেছিল, ও প্যারিস ফিরে এ নিয়ে কথা বলবে।
পথে গাড়ি থামিয়ে যখন ক্যাফেতে বসল, নীলা ভেবেছিল, বুঝি অতলান্তিকের পাড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা বা দুর্ঘটনার কথা পাড়বে বেনোয়া। এখনও নীলার হাঁটুর কাছে ফুলে আছে, পিঠে নীল দাগ পড়ে আছে, কাঁধ নাড়লে এখনও টনটন করে, এ সব কথা নীলারও বলা বাকি রয়ে গেছে। কফি খেতে খেতে বেনোয়া মনাকোর গল্প করে। মনাকোতে যারা আছে সুখে আছে। কর দিতে হয় না। যা উপার্জন করো, তা ভোগ করো। ফরাসি সরকারকে উপার্জনের তিরিশ পঁয়ত্রিশ ভাগ দিয়ে ধুয়ে থাকে কী! মনাকোতে থাকলে টাকাটা বাঁচত। কফি খেয়ে শহরে দু চার পাক ঘুরে পঁ নফের কাছাকাছি গাড়ি রেখে হেঁটে যায় দুজন,হাঁটতে হাঁটতে নতরদাম সেতুতে, সামনের যে সেতুর ওপর দাঁড়ালে নতরদাম দ্য পারির আগপাশতলা দেখা যায়, সেখানেই দাঁড়ায় নীলা সেইনের জল দেখব বলে, সেইন দেখলে যা হয় ওর, জলে জনদার্কের ছাই ভাসতে দেখে, এত বছর আগের ছাই, ভেসে গেছে কোথায়, তবু তার মনে হয় সেইন জানে, সেইনের প্রতি বিন্দু জল জানে, কোনও একদিন সাহসী এক কিশোরীর গা পোড়ানো ছাই এসে পড়েছিল এই জলের শরীরে, আসলে ছাই তো দেখে না, গোটা জনদার্ককেই দেখে জলে, সেইনের আর গঙ্গার জলে কোনও কি তফাত আছে, প্রশ্নটি হঠাৎই একটি পালকের মতো যেন উড়ে এল, গঙ্গার জলও তো দেখতে এমন, ঘোলা, জগতের সব জলই আসলে এক, এরকম একটি উত্তর মতো ভাবতে ভাবতে সেতুর রেলিং থেকে সরে আসে নীলা, জল থেকে চোখ সরে এসেছে, জনদার্ক থেকেও, চোখ তখন পাথরের সেতুতে, মন তখন গঙ্গায়, নাহ! গঙ্গা অন্যরকম, গঙ্গার জল বাঁধনছেঁড়া, আর সেইন যেন একোয়রিয়াম, সেইনের সঙ্গে জীবনযাপন হয় না, যা হয় গঙ্গার সঙ্গে, জগতের সব জল এক নয়। গঙ্গার জল ছাপিয়ে মন তখন নয়েল ক্যাথারিনে। ক্যাথারিন গ্র্যান্ডও এখানে, ঠিক যেখানে নীলা দাঁড়িয়েছিল কোনও একদিন। নীলার মতো ক্যাথারিনও ছিল কলকাতার মেয়ে, চন্দননগরের ফরাসি বড়কর্তার অসাধারণ রূপসি কন্যা, মর্তের মানবী নয়, স্বর্গের অপ্সরা, কলকাতার ইংরেজ ফরাসি যুবকদের নিদ্রা হরণ করা ক্যাথারিন। সেই অপ্সরার বিয়ে হয়ে গেল বেশি বয়সের এক ইংরেজ অফিসার ফ্রান্সিস গ্র্যান্ডের সঙ্গে, চন্দননগরের গিজায়। ফরাসি বিপ্লব তখনও শুরু হয়নি। ক্যাথারিনের প্রেমে উতলা ফরাসি যুবক ফিলিপ রাতের অন্ধকারে পাঁচিল টপকে গিয়েছিল ক্যাথারিনের শোবার ঘরে, জানাজানি হয়ে গেল ফিলিপের কীর্তি, ফ্রান্সিস মামলা করে ফিলিপকে পঞ্চাশহাজার সিকা টাকা জরিমানা দেওয়াল, ঢি ঢি পড়ে গেল চন্দননগরে, কলকাতায়, ক্যাথারিনকে হতে হল তার ফরাসি প্রেমিক ফিলিপের রক্ষিতা। হায় ক্যাথারিন। অপ্সরার কপালে রক্ষিতা হওয়াই ছিল! এক পুরুষের হাত থেকে আরেক পুরুষে চালান হল বেচারি, কলকাতা থেকে লন্ডন এসেও, প্যারিস এসেও রক্ষিতার ভাগ্য বদলায়নি৷ নীলার বয়সেই প্যারিসে এসেছিল সে আর হোটেল দ্য ভিল থেকে হাঁটতে হাঁটতে একদিন এই সেতুতে, সেতুটি তখন কাঠের, সেতুর ওপর কত কিসিমের লোক বসে থাকত, ফেরিঅলা, ভিখিরি, মদ্যপ…ক্যাথারিনের জামা ধরে টেনেছিল এক দুষ্ট লোক, আর আরও কিছু দুষ্ট লোক তা দেখে হা হা হেসেছিল। ক্যাথারিনের অস্তিত্ব নীলা অনুভব করে নিজের ভেতর, যদিও দুজন দেখতে এক নয়, ক্যাথারিন ছিল গোরা, ক্যাথারিনের ছিল সোনালি চুল, নীল চোখ, নীলার রং বাদামি, কালো চুল, কালো চোখ, কানো মখমল চোখ! হাত থেকে হাতে গড়িয়ে, শেষে ক্যাথারিন গড়িয়ে পড়ল তালের কোলে। মঁসিয়ে তালেরর রক্ষিতা হয়ে। তালের তখন পররাষ্ট্র সচিব। বিদেশি দুতের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় আলাপ আলোচনা তালেরর চেয়ে ক্যাথারিনেরই বেশি হয়। প্যারিসেও ঢি ঢি পড়ে গেল, নেপোলিয়ন বললেন এ কী কাণ্ড তালের! রক্ষিতা দিয়ে রাষ্ট্রের কাজ চালাচ্ছ! ক্যাথারিন শেষ দিকে দুষ্ট্রর সঙ্গে দুষ্টুমিও করেছে, নেপোলিয়ানকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে বলেছে, তালেরঁর সন্তান আমার গর্ভে। নেপোলিয়ান তখন সন্তান বলতে অজ্ঞান, সন্তান হচ্ছে না বলে শখের বউ জোসেফিনকে ত্যাগ করে মারি লুইসকে বিয়ে করার কথা অব্দি ভাবছেন। তক্ষুনি তালেরঁকে আদেশ করলেন রক্ষিতাকে বিয়ে করার, নেপোলিয়ানের আদেশ অমান্য করার বুকের পাটা তালেরঁর ছিল না। শেষ অব্দি জীবনভর রক্ষিতা হিসেবে পড়ে থাকার দিন শেষ হয় ক্যাথারিনের, কলকাতার টানে ফরাসি বলা মেয়ে, এর ওর রক্ষিত হয়ে জীবনের অনেক বছর কাটানোর পর হল পড়ন্ত বয়সে এক মন্ত্রীর বউ। ওই দুষ্টমিটুকু না করলে অবশ্য রক্ষিতা হয়েই বাকি জীবন তার বেঁচে থাকতে হত। নীলার মনে হয় যেন দুশো বছর পর সেই ক্যাথারিনই আবার এসে দাঁড়িয়েছে এই সেতুতে।
