শহরভর্তি মানুষ, মানুষের কাঁধে কাঁধে মানুষ, পায়ে পায়ে কুকুর, কাউকে নীলার চেনা লাগে না। অন্য কোনও গ্রহ থেকে নেমে আসা এরা, না কি সে নিজেই অন্য গ্রহের। না কি নীলারই এমন, আর কারও নয়, খালি খালি লাগে। পাছে পাতা ধরলেও মনে হয় ধরেনি, ফুলগুলোকেও মনে হয় ফুল নয়, যখন ঘাসে হাঁটে, ঘাসগুলোকে পাথর মতো লাগে, মেঘগুলোকেও ঠিক মেঘ মনে হয় না, চাঁদকেও চাঁদ না। রোদ্দুর গড়াচ্ছে গায়ে, তবু মনে হয় প্রতি কণা ত্বক সেঁধিয়ে গেছে লোমকূপের অন্ধকারে। রাতে নিয়ন আলোর নীচেও এক শরীর অন্ধকার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে, আর ওই দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই পাথরের শরীরে, তার মনে হয়, ঢুকে যাচ্ছে তার নিজের শেকড়। নীলা, নিজের কাছেই দিন দিন কেমন অচেনা হয়ে যাচ্ছে। শহরটিও, শহরের মধ্যিখানে ঘোলা জলের নদীটিও। যে নদীটির ধারে উদাস বসে থাকতে নীলার এত ভাল লাগে, সেটিকে, সেতু পার হতে হতে বলে ওলো সেইন, তোমাকে খুব পাথর-মতো লাগে।
.
বেনোয়ার স্পর্শে নীলার মগ্নতা ভাঙে। নতরদামের পেছনে ইল সা লুই দ্বীপটিতে উত্তরে হাওয়ায় উদাস হাঁটতে হাঁটতে হোটেল লজের সামনেও নীলা আবার মগ্ন হয়, এটির কি এককালে নাম ছিল হোটেল পিমোদাঁ? এখানে কি একসময় শার্ল বোদলেয়ার থাকতেন?
বেনোয়া নীলাকে সরিয়ে আনে, আবহাওয়া খারাপ হচ্ছে, বাড়ি চলো।
নীলা আকাশে কালো মেঘ দেখে খুশিতে নেচে ওঠে।
এ তো চমৎকার আবহাওয়া। একে খারাপ বলছ কেন? চলো ভিজি।
নীলার বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করে। বেনোয়ার করে না। গনগনে সূর্যের তলে তার জন্ম নয়, মেঘ-বৃষ্টি সুধা তার কাছে পৌঁছে না। বাড়ি পৌঁছোনোর পর বেনোয়াকে পায় যৌনতায়, নীলাকে কবিতায়। বোদেলেয়ারের ফ্লর দু ম্যল হাতে নিয়ে সোফায় বসে নীলা জিজ্ঞেস করে, মালাবারের মেয়ে নিয়ে বোদেলেয়ার কবিতা লিখেছেন কেন?
বেনোয়া বইটি সরিয়ে নীলাকে জড়িয়ে প্রেমকাতর চোখ নীলার চোখে রেখে বলে, কারণ বোদেলেয়ার মালাবারের মেয়েকে ভালবেসেছিলেন। ভালবেসে কী করতেন বোদেলেয়ার, দেখবে?
উত্তপ্ত চুম্বন নীলার ঠোঁটে। দক্ষিণী উষ্ণতা বহন করে এনেছে বেনোয়া, সূর্যের সবটুকু আগুন ঠোঁটে করে এনেছে নীলাকে পোড়াতে।
আবার ফ্লর দু মল হাতে নিয়ে নীলা বলে, মালাবারে তো বোদেলেয়ার যাননি।
বইটি কেড়ে নিয়ে মিষ্টি হাসে বেনোয়া, যাননি তোমাকে বলেছে কে?
গিয়েছিলেন?
হ্যাঁ। বেনোয়া মাথা নাড়ে।
না যাননি। বোদেলেয়ারের সৎবাবা তাঁকে ধরে বেঁধে জাহাজে তুলে দিয়েছিলেন ভারতে যাবার জন্য, ১৮৪১ সালের ৯ জুনে। মরিশাসের কাছে এসে বোদেলেয়ার জাহাজ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, তিনি যাবেন না ভারতে, পরের বছর ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি প্যারিসে ফিরে এলেন। বোদেলেয়ারের তো মালাবার বন্দরে পা দেননি।…
আমাদের বোদেলেয়ার সম্পর্কে তো বেশ জানো দেখছি।
জন দুভালের মতো কালো রেশমি চুল ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে নীলা। গা থেকে সুগন্ধ বেরোচ্ছে তার। এ সুগন্ধ বেনোয়াকে এমন মাতাল করছে যে সে নীলার শরীরের গভীরে উন্মত্ত অস্থির প্রেমের কবিতা রচনা করতে চাচ্ছে।
বেনোয়ার হাত থেকে বইটি নিয়ে নীলা পাতা ওলটাতে থাকে। বেনোয়া প্রশ্ন করে, মালাবার ভারতে নাকি?
তুমি জানো না মালাবার কোথায়?
নাহ! বেনোয়ার নাহ-টি বেশ স্বাধীন, আক্ষেপের লেশ নেই, জানে না বলে একধরনের অহংকারও যেন ঠোঁটের ওপর বসে।
নীলা বলে, আশ্চর্য!
আশ্চর্য কেন?
আশ্চর্য এই জন্য যে তোমাদের কবি কোন মালাবারের মেয়েকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, সেই মালাবার কোথায় কোন দেশে, মালাবারের মেয়েকে কি মালাবারে দেখেছেন নাকি কল্পনায়, এ নিয়ে ভাবোনি?
বেনোয়া নীলার পাশ থেকে উঠে অন্য সোফায় বসে। সে ভাবেনি, কারণ ভাবার তার অন্য জিনিস আছে।
কী আছে? মনাকো আছে?
জিভের লালায় ভিজে ওঠে পাসকাল আছে, জ্যাকলিন আছে?
বেনোয়া হঠাৎ কোনওরকম প্রসঙ্গ ছাড়া জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা নতরদাম কবে বানানো হয়েছে জানো?
তেরোশো চৌত্রিশ সালে।
হল না, তারও আগে।
কাজ শুরু হয়েছিল এগারোশো সালের মাঝামাঝি, শেষ হয়েছে তেরোশো চৌতিরিশে।
এগারো সালের কখন শুরু হয়েছিল বলো।
তা জানি না।
বেনোয়া মুচকি হেসে বলে, তোমাদের তো আছে ওই এক তাজমহল। ভারতে খুব পুরনো কিছু কিন্তু দেখলাম না…কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখলাম, তাও তো ইংরেজের করা।
নীলা উঠে বসে জিজ্ঞেস করে, তুমি কি মহেঞ্জোদারো হরপ্পার নাম শুনেছ?
এ আবার কী?
এ হল সভ্যতা। তোমাদের যিশুর জন্মের আড়াই হাজার বছর আগে সে সভ্যতা ছিল ভারতবর্ষে, সেটির কথা বলছি।
বেনোয়া কাঁধ ঝাঁকায় এ সব তার জানার কথা নয়।
নীলা বলে, ভেবো না, এ ভারতবর্ষের ব্যাপার, তোমার না জানলেও চলবে। এ পৃথিবীর ইতিহাস।
ইতিহাস আমার জানতেই হবে কেন?
বেনোয়া শব্দ করে সোফা ছেড়ে ওঠে। শব্দ করে হাঁটে। শব্দ করে শ্বাস নেয়, ছাড়ে। চেঁচায়,
তুমি কি ভেবেছ, সবাই সবকিছু জানে? আমার যে বিষয়ে জানার আগ্রহ আমি সে বিষয়ে জানি। নিজেকে তুমি সবজান্তা ভাবো নীলা। তোমার অহংকার খুব বেশি।
নীলা হাসে, হেসে ধীরে নিচু স্বরে বলে, অহংকার থাকা খারাপ নাকি! যদি জ্ঞান থাকে, তা নিয়ে কুঁকড়ে থাকব কেন। বলি যে হ্যাঁ আছে জ্ঞান।
