সতত যেমতি লোক নিশার স্বপনে
শোনে মায়া মন্ত্রধ্বনি তব কলকলে
জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে!
বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদ-দলে,
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?
দুগ্ধ শ্রোতরূপী তুমি জন্মভূমি স্তনে!…
এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে
লইছে যে তব নাম বঙ্গের সঙ্গীতে!
কেবল নদ নয়, মনে পড়ে ফেলে আসা নদীতীরের বটবৃক্ষ, ভাঙা শিবমন্দির, বউ কথা কও পাখি, অন্নপূর্ণার ঝাঁপি, রামায়ণ, মহাভারত, গৌরবজ্জ্বল প্রাচীন ভারত।…ভেরসাইয়ে থাকাকালীন ইতালিয়ান কবি পেত্রার্কার সনেটের অনুকরণে কিছু সনেট লিখেছিলেন। পেত্রার্কার সঙ্গে মধুসূদনের বেশ মিল ছিল বলতে হবে। পেত্রার্কার বাবা ছিলেন আইনজীবী, পেত্রার্কাকে আইন পড়িয়েছিলেন, কিন্তু সব ছেড়ে ছুঁড়ে পেত্রার্ক ডুব দিয়েছিলেন ধ্রুপদী ভাষা ও সাহিত্যের বিশাল সমুদ্রে। মধুসূদনও তেমন। অবশ্য পার্থক্য যা ছিল, তা হল, পেত্রার্কা যেমন তাঁর প্রেমিকা লরাকে নিয়েই সনেট লিখতেন, মধুসূদন তা মোটেও করেননি। বোদলেয়ারের সঙ্গেও কিছুটা মেলে, বোহেমিয়ান ছিলেন, ভোগ বিলাসের নেশা ছিল, ধার করে মদ খেতেন। ভেরসাই থেকে তিনি কলকাতা ফিরে যান, ভাগ্যিস ফিরে গিয়েছিলেন, না ফিরলে বাংলা সাহিত্যকে এত সমৃদ্ধ করত কে! মধুসুদনের ভুল স্বপ্ন কেটেছিল বলেই বাংলা সাহিত্য আজ সমৃদ্ধ তাঁর চতুর্দশপদী কাব্যে, মেঘনাদ বধ কাব্যে। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীকে তিনি নতুন করে গড়েছেন, দৈবশক্তির বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রামের জয়গান গেয়েছেন। নীলা বারো নম্বর রু দ্য শাঁতিয়ের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পাথরের ফলকটি দেখে
LE POETE INDIEN
MICHAEL MADHUSUDAN DATTA
(1824-1873)
A DEMEURE DANS CATTE MAISON
DE 1863 A1865
ET Y A COMPOSE EN BENGALI
DES SONNETS ET DES FABIES
বাড়িটির সামনে উবু হয়ে ধুলো নিয়ে কপালে ছোঁয়ায়। দেখে হেসে ওঠে বেনোয়া, এ কী করছ?
মধুসূদনকে কুর্নিশ করলাম।
মধুসুদনকে কুর্নিশ করলে না কি ফ্রান্সের মাটি কপালে ছোঁয়ালে?
এ মাটিতে মধুসূদন একদিন হেঁটেছিলেন, সে কারণেই করা। নীলা শাতিয়ের রাস্তায় উদাস হাঁটতে হাঁটতে বলে।
সে মাটির ওপর কত মাটি পড়েছে। কত লুই কত ফিলিপ, কত ভালেরি কত,
বেনোয়ার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে নীলা বলে, কত বেনোয়া, কত পাসকাল, কত জ্যাকলিন…
প্রসঙ্গে পালটে বলে, তা কেমন কাটালে সমুদ্রপারে?
বেনোয়া উত্তর দেয় না।
গাড়িতে উঠে বেনো দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তুমি খুব বদলে গেছ নীলা।
কী করে বুঝলে! নীলা বলে।
সবসময় আমার হাত ধরে হাঁটতে, আজ হাতই ধরেনি।
বোয়ার অভিযোগ সে খণ্ডায়, মনে করিয়ে দেয় সে প্রাসাদের বাগানে বসে তার হাত নিয়েছে হাতে, সুন্দর সাদা আঙুলে সোনার অঙ্গুরিটি চমৎকার মানিয়েছে, দেখেছে।
নীলা তুমি আমাকে বোকা বানাচ্ছ! বেনোয়া ক্ষীণ স্বরে বলে।
আমি দুর্বল, দীন, হীন, ক্ষীণ, তোমাকে বোকা বানাবার সাধ্য আমার হবে কেন!
.
প্যারিসে ফিরতে ফিরতে নীলা ভাবে, বেনোয়া চৌদ্দই জুলাইয়ের ঘটনার কথা রিভিয়েরা থেকে ফেরার পর আর তুলছে না। যদিও বলেছিল প্যারিস ফিরে এসে সে এ নিয়ে কথা বলবে। প্রথম রাতেই ঘটনা জানিয়েছিল নীলা, বিস্তারিত শোনার পর বেনোয়ার প্রথম প্রশ্ন ছিল, কেন তুমি মিমিজঁ গেছ?
নীলা বলেছে সে মিমিজঁ গেছে, কারণ তার ইচ্ছে হয়েছিল। বেনোয়া অবাক হয়েছে নীলার অদ্ভুত ইচ্ছের কথা শুনে, একা একা সমুদ্রপারে কারও কি ইচ্ছে করে যেতে, বেনোয়া কি রিভিয়েরা একা যেত, যদি না বউ বাচ্চা না থাকত সঙ্গে! যেতে পারত নীলাকে নিয়ে, একা নয়। ওসব জায়গায় সঙ্গী ছাড়া যাওয়ার কোনও মানে হয় না।
অপেক্ষা করতে পারতে। আমি তোমাকে নিয়ে যেতাম মিমিজঁ। হঠাৎ হঠাৎ কী যে সব কাণ্ড ঘটাও তুমি নীলা।
নীলা নিজের চেয়ে মরুনির জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বেশি। বেনোয়া বলেছে, মরুনিটা আবার কে? এর নাম তো তোমার মুখে আগে শুনিনি।
তারপর মরুনির সঙ্গে কী করে পরিচয় হল, কোথায় হল ইত্যাদি খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করেছে।
শেষে অবশ্য সান্ত্বনা দিয়েছে, ভিড়ের মধ্যে এ সব হই হট্টগোলে পড়লে কত রকম দুর্ঘটনা ঘটে। এই এখানেই তো জ্যাকলিনের বয়সি একটা বাচ্চা হারিয়ে গেল সেদিন বিকেলে। ঘন্টা চারেক পর বাচ্চাটির খোঁজ পাওয়া গেছে। ছিল একটি ক্যান্ডির দোকানে।
নীলা যখন তার লাথি খাওয়া আর মরুনির পেটে ছুরি খাওয়ার সঙ্গে বাচ্চা হারিয়ে যাওয়ার দুর্ঘটনা এক নয় বোলে বলে এবং স্পষ্ট করে বলে, ওরা বর্ণবাদী ছিল, বেনোয়া ঠিক নিশ্চিত হতে পারেনি। বলেছে, মোটা বুটের কথা বলছ তো! ও সব কিন্তু সমকামীরাও পরে।
আর যদি বর্ণবাদী ওরা হয়েই থাকে, তবে খুব ছোট দল এরা। গান বাজনা করে, বুদ্ধি শুদ্ধি এখনও হয়নি, ভাল শিক্ষা পায়নি, অথবা শৈশবে এদের অভিভাবক এদের মন মানসিক সুস্থ করে গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করেননি, এ সব নানা কারণ দেখিয়েছে। নীলা বেনোয়ার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ মন দিয়ে শুনেছে, শুনেছে কারণ সে বেনোয়া, তার প্রেমিক, সুদর্শন, সুপুরুষ, একোল নরমাল-এর ছাত্র, বিজ্ঞানী, হাই টেক, হাই ফাই, সাদা। আর বেশি কী গুণ থাকতে পারে একজন মানুষের।
ওই ঘটনার আর নতুন কোনও ব্যাখ্যা নীলা এখন শুনতেও চায় না। ফুটো পেট সেলাই হবার পর মরুনির পাশে সারারাত জেগে বসেছিল নীলা, নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য ক্ষমা চেয়েছে। মরুনি হেসে বলেছে, ক্ষমা চাচ্ছ কেন, ও কি তোমার দোষ ছিল, তুমি কি জানতে ওখানে কারা কী করছে? আমার বরং দূর থেকে অনুমান করা উচিত ছিল। সমুদ্রের হাওয়া খেতে এসেছিলাম কি এত সতর্ক থাকার জন্য। যাক, ভাল যে বেঁচে গেছি।
