এই বুঝি লিবার্তে ইগালিতের উৎসব! একটি গোলাপি পাংক চেঁচিয়ে বলে।
সবুজ পাংক মরুনিকে পাঁজাকোলা তুলে দৌড়ে যায় রাস্তার দিকে। পেছন পেছন বাকিরা।
ওদিকে গোলাপি পাংক রাইট রাইট করে চেঁচাচ্ছিল। পরিষ্কার ইংরেজিতে গোলাপিকে উত্তর দেয় এক দশাসই ন্যাড়া, দে হ্যাভ দ্য গড গিভন রাইট টু বিলিভ হোয়াটএভার দে ওয়ান্ট, বাট আই হ্যাভ দ্য গড গিভন রাইট টু কিক দেয়ার অ্যাস।
.
মরুনি যখন অপারেশন থিয়েটারে, হাসপাতালে নীলার বিছানার পাশে বসে নাতালি, দানিয়েল আর ফ্রেডেরিক–মরুনির প্রেমিক বর্ণনা করে যায় ন্যাড়াদের দৌরাত্ম্য। নাতালি কদিন আগেই নাকি দেখেছে এক ন্যাড়াকে সেইনের জলে ধাক্কা দিয়ে এক মরককান ছেলেকে ফেলতে। ফ্রেডেরিক দেখে এসেছে বোহা রেকর্ডস-এর দুই ন্যাড়া পুলিশকে ধমকে বসিয়ে দিচ্ছে। এদিকে নীলার বোকামো দেখে বোকা বনে যাচ্ছে দানিয়েল, ন্যাড়াদের ভিড়ে মরতে যেতে নীলাকে কে বলেছিল।
নীলা শোনে।
নীলার চৌদ্দই জুলাই কাটে।
.
এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে
সমুদ্রস্নান সেরে ফিরে বেনোয়া নীলাকে নিয়ে হাওয়া খেতে বেরোয়। ভেরসাই বাগানের হাওয়া বেশ সুস্বাদু হাওয়া। লা নত্রের বানানো দু হাজার একর জমির ওপর অসম্ভব সুন্দর বাগানটিতে হাঁটতে হাঁটতে ফোয়ারার জলে আধেক ভিজে গ্র্যান্ড ক্যানেলের পাশে বসে দুজন, সূর্যরাজার প্রাসাদের দিকে মুখ করে।
যাবে দেখতে প্রাসাদ? সূর্যরাজার শোবার ঘর, রানি মারি তেরেসের ঘর?
নীলা সবুজ ঘাস ছিঁড়ে দাঁতে কাটতে কাটতে বলে, রাজা রানির শোবার ঘর আলাদা ছিল কেন!
বেনোয়া বলে এত বড় প্রাসাদ। ঠেলাঠেলি করে থাকার কী দরকার।
ঘাসের একটি ডগা বেনোয়ার ঠোঁটে ছুঁইয়ে নীলা বলে নাকি তিন তিনটে রক্ষিতা নিয়ে তোমাদের লুইয়ের সময় কাটত বলে।
নীলাকে চুমু খেয়ে বেনোয়া বলে, আমাদের লুই তাঁর রক্ষিতাকে বিয়েও করেছিলেন।
নীলা ঘাসের ওপর শুয়ে আকাশের দিকে মুখ করে বলে, বিয়ে করে সেই বউয়ের শোবার ঘরও আলাদা করে দিয়েছিলেন।
বাদ দাও। যাবে নাকি প্রাসাদের ভেতর? বেনোয়া তাড়া দেয়।
নীলা তেমন শুয়ে থেকেই বলে, বাদ দাও, ওসব ঝকঝকে তকতকে প্রাচুর্য দেখলে আমার গা শিউরে ওঠে।
কেন শিউরে ওঠে?
নিজেকে এক দরিদ্র দীন হীন প্রজার মতো মনে হয়। মনে হয় রাজাদের চাবুকের মার খাচ্ছি। অকারণে।
বেনোয়া দু হাতের কনুইয়ে ভর রেখে পেছনে গা হেলিয়ে বলে, চলো যাই ভেরসাই চুক্তির আয়নাঘরটা অন্তত তোমাকে দেখিয়ে আনি।
নীলা বেনোয়ার বাঁ হাতটি হাতে নিয়ে আঙুলগুলো নিজের গালে ছোঁয়ায়। গালে বেনোয়ার তর্জনীর সোনার অঙ্গুরির স্পর্শ, বেনোয়ার সঙ্গে পাসকালের বন্ধনের স্পর্শ।
ওই আয়নাঘর দেখে কী লাভ? ভেরসাই চুক্তি তো কোনও শান্তি আনেনি, বরং আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ ঘটিয়েছে।
বেনোয়া উঠে বসে, উলটোপালটা না বকে বলো, এখান থেকে উঠতে ইচ্ছে করছে না।
হাওয়ায় নীলার চুল ওড়ে। চুলে বুক ঢেকে যায়, মুখ ঢেকে যায়। উঠে হাতখোঁপা করে বলে যে সে ওই প্রাসাদে যাবে না, যাবে বারো নম্বর রু দ্য শাতিয়ে তে।
ওখানে কী আছে?
ওখানে প্রাসাদ নয়, ভাঙা একটি বাড়ি আছে। সে বাড়িতে এককালে এক কবি থাকতেন। খুব বড় কবি।
কী নাম সেই কবির?
মধুসূদন দত্ত।
বেনোয়া বলে, এ আবার কী অদ্ভুত নাম? এ তো ফরাসি নাম নয়।
অসকার ওয়াইভও তো ফরাসি নাম নয়। গারট্রুড স্টাইনও নয়, হেনরিক ইবসেনও নয়। এই নামগুলো কি অদ্ভুত লাগে তোমার কাছে? নিজেই উত্তর দেয় সে লাগে না।
মধুসূদন দত্ত বাঙালি ছিলেন। নীলা বলে।
ও সে কথা বলো। বাঙালি!
বেনোয়া শ্বাস ফেলে বড় নিশ্চিন্তে, বাঙালি কবির নাম না জানা আর আমাজান জঙ্গলের কোনও ক্ষুদ্র কীটের নাম না জানা একই কথা, কিছু যায় আসে না।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি মধুসূদনের নাম জানবে কেন? ভারতের কারও নাম যদি জানো, জানবে সাঁইবাবার নাম, দীপক চোপড়ার নাম, স্বামী প্রভুপাদের নাম। যতসব প্রতারকের নাম।
বেনোয়া মধুসূদন সম্পর্কে জানার আগ্রহ না দেখালেও নীলা বলে যায় মধুসুদন কে ছিলেন, নীলা নিজেকেই শোনায় মধুসূদনের গল্প। মধুসূদন জমিদারপুত্র ছিলেন। খুব অল্প বয়স থেকেই ইয়োরোপীয় সংস্কৃতির প্রতি অন্ধ মোহ ছিল ওঁর। নিজের পোশাক ছেড়ে ইয়োরোপীয় পোশাক পরতেন। বাংলা ছেড়ে ইংরেজিতে কবিতা লিখতে শুরু করলেন এক সময়। হিন্দুধর্ম ছেড়ে ক্রিশ্চান হয়েছিলেন। নিজের সংস্কৃতিকে এমনই ঘৃণা করতেন যে বলেছিলেন, ঈশ্বর অ্যাংলো স্যাক্সনকে জগতে পাঠিয়েছেন হিন্দুদের উদ্ধার করতে, সভ্য করতে, এক কথায় ক্রিশ্চান করতে। মাদ্রাজে থাকাকালীন ফরাসি মেয়ে হেনরিয়েটার প্রেমে পড়ে ওঁকে বিয়েও করলেন। জাত কুল সব গেল, বাবা তাড়িয়ে দিলেন বাড়ি থেকে। ইংল্যান্ডে এসে ব্যারিস্টারি পাশ করেছেন। চরম অভাবে অনাহারে দিন কাটাতেন এখানে, এই ভেরসাইয়ে, কলকাতা থেকে বন্ধুরা টাকাপয়সা পাঠিয়ে মধুসূদনকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। এ দেশে এসে তিনি প্রথম দিকে বেশ আনন্দে ছিলেন কারণ ফরাসিরা তাঁকে ড্যাম নিগার বলে অন্তত গাল দেয় না, ইংরেজরা যেমন দেয়, বরং ফরাসি সম্রাট এবং সম্রাজ্ঞীকে কুর্নিশ করলে পালটা কুর্নিশ পাওয়া যায়, বলতেন। ইওরোপীয় ভাষায় সাহিত্য রচনা করে তিনি খ্যাতি লাভ করবেন যে স্বপ্ন ছিল তাঁর, কাটে। মোহ কেটে যায়। অতীতে ফেরেন, সাগরদাঁড়িতে তাঁর শৈশবের নদ কপোতাক্ষের কথা মনে পড়ে তাঁর,
