নীলা শাঁ জার্মার কোলাহলে দৃষ্টি ছড়িয়ে বলেছে, অবশ্য রাজা খেদিয়ে পরে আবার রাজা মেনে নেওয়াটা আমার কাছে একটু কেমন কেমন যেন লাগে। নেপোলিয়নও তো বেশ বিপ্লবীর মতো উড়ে এসে জুড়ে বসে সেই রাজাগিরিই শুরু করেছিলেন। আর বিপ্লবী ফরাসিরাও তা মেনে নিয়েছিল।
নেবার অবশ্য কারণ আছে। আর…গির্জার সবাই তো আর বিপ্লবের বিপক্ষে ছিল না। পক্ষেও ছিল অনেকে। বেনোয়ার চোখ তখনও ফিরে ফিরে দি প্রের গির্জায়।
নীলা বেনোয়ার কথার পেছনে কথা বলেই যাচ্ছিল পাশে বসে, পক্ষে ছিল কারণ ছোট জাতের ছিল তো। বড় জাতের মার খেয়ে ছোট জাত শত্রু দলে ভেড়ে।
তুমি তো গির্জা দেখে বেড়াও, তো গির্জার বিরুদ্ধে কেন বলো। বেনোয়া কঠিন স্বরে প্রশ্ন করেছে। কঠিনের উত্তর নীলা নরম করে দিয়েছে, প্যারিসের চব্বিশটি নতরদাম দেখা হয়ে গেছে। দেখেছি এ সবের স্থাপত্যসৌন্দর্য, আর কিছু নয়।
আচ্ছা তুমি কি সত্যিই বলতে চাও যে তুমি ধর্মে বিশ্বাস করো না? সে দিনও বেনোয়া জিজ্ঞেস করেছে। নীলা বলেছে, আমি ইগালিতে, লিবার্তে আর ফ্রাতারনিতেয় বিশ্বাস করি।
তুমি খুব প্রশ্ন এড়িয়ে যাও, নীলা।
বেনোয়ার অভিযোগের কোনও উত্তর নীলা দেয়নি।
.
নিস থেকে বেনোয়া ফোনে খবর নেয় নীলার, নীলা কেমন আছে, কী করছে, কী ভাবছে। বেনোয়া বলে সে তীরের বালুতে তোয়ালে পেতে শুয়ে আছে, চোখে রোদ চশমা, পাশে পাসকালও শুয়ে আছে, এল ম্যাগাজিন পড়ছে, ওর নিম্নাঙ্গে এক টুকরো কাপড় শুধু, বাকিটা খোলা। পাসকালের গায়ে সে সানটান মেখে দিয়েছে খানিক আগে। জ্যাকলিন বালুতে খেলছে। একফোঁটা মেঘ নেই আকাশে, পরিষ্কার নীল আকাশ। আকাশ দেখতে দেখতে বেনোয়ার নীলাকে মনে পড়ছে।
কদিন থেকে সামুদ্রিক মাছই খাচ্ছে বেনোয়া।
কাল মন্টে কারলো যাবে।
পরশু মনাকো।
বেনোয়ার কণ্ঠে সুখ ফেনিয়ে উঠছে।
নীলার ইচ্ছে করে না বেনোয়ার সুখের গল্প শুনতে। তার ভয় হয় বেনোয়া হয়তো নিখুঁত বর্ণনা করে বসবে জ্যোৎস্নারাতে পাসকালের সঙ্গে সে কী করে ভালবাসা ভালবাসা খেলেছে অর্ধেক জলে অর্ধেক বালুতে। একবার সে বলেওছিল তাকে যে, গরমকালে ঘরে সম্ভোগে মজা নেই, মজা বনে, সমুদ্রপারে। চাঁদের আলোয় পাসকালকে নিশ্চয় অপ্সরীর মতো লেগেছে, আর বেনোয়া তার নোনা জলের ঢেউয়ের সঙ্গে নেচেছে।
ভয়ে অথবা শোধ নিতে, নীলার বিশ্বাস শোধ নিতেই, সে বাড়ি থেকে বেরোয়, মিমিজঁ অনেকটা ঘরের মধ্যে পৌঁছে। পথে অতলান্তিকের চেয়ে ভূমধ্যসাগরই ঢেউ তুলেছে বেশি। এভিন্যু দু ল্যাকে একটি হোটেল নিয়ে সারা দুপুর সে শুয়ে থাকে। রোদ খানিকটা নরম হলে বেরোয় সমুদ্রপারের দিকে। উচ্ছল উদ্দাম উলঙ্গ নারী পুরুষের ভিড় চারদিকে, দীর্ঘ বালুতীরে সারা শরীরের মেলা। নীলা একা বোধ করে। কেউ তার দিকে ফিরে তাকায়, যদি তাকায় কেউ, নীলা বেমানান বলে তাকায়। সমুদ্রপারে শরীর ভরে কাপড়চোপড় পরে গরমকালে কেউ আসে না। গাছের ছায়ার বেমানান নীলা একা বসে থাকে। নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হয় নিজেব কাছেই। বেনোয়া অন্তত আকাশের দিকে তাকিয়ে নীলার কথা ভাবে। কোথাও তো আর কেউ নেই তাকে ভাবার। যে ভাবে, সে যদি আরেকটি শরীরে বুঁদ হয়, হোক। নীলা ঠকে যায়, এর নাম শোধ নেওয়া নয়, শোধ নেওয়া হতে পারত সে যদি কোনও সুদর্শন পুরুষকে সঙ্গী করে মিমিজঁ আসত, একা নয়, সে যদি জ্যোৎস্নারাতে সেই পুরুষকে বলতে পারত জ তেম, যদি সে নোনা জলে আর সাদা বালুতে মিশে ভালবাসার গোপন খেলা খেলতে পারত। বেনোয়া ছাড়া আর কোনও পুরুষকে তার গভীর নিকটে কল্পনা করতে চেষ্টা করে, ভেবে তার গা গুলিয়ে ওঠে অন্য এক পুরুষকে সে জ তেম বলছে।
নীলা ফিরে যায় হোটলের ঘরে। একা জানালায় বসে সমুদ্রের নীলের সঙ্গে আকাশের নীলের সঙ্গম দেখে।
.
সন্ধেয় মরুনির সঙ্গে কথা হয় নীলার। বন্ধু নিয়ে গতকাল মিমিজঁ পৌঁছেছে সে।
দানিয়েলের সঙ্গে মরুনির কথা হয়েছে, দানিয়েল আর নাতালি গানের উৎসবে গেছে।
তুমি কি সেখানে যেতে চাও?
ঠিক জানি না।
কী করবে তা হলে?
ঠিক জানি না।
হোটেলে বসে থাকতে মিমিজঁ এসেছ।
কি জানি না।
মরুনি হেসে ওঠে। কী ভাষায় হাসে মরুনি, নীলা ভাবে। হাসি বা কান্নার কোনও ভাষা আছে কি?
নীলা বেজোড়, জোড়দের আনন্দক্ষণে বেজোড় আস্ত আপদ ছাড়া কিছু নয়।
আপদটিকে মরুনি উপেক্ষা করে না। সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে বেরোয় সাগরপারে। সাগর জলে ঢেউয়ের উৎসব, পারে উৎসবের ঢেউ। হাঁটতে হাঁটতে রক্ত আর গৌরবের উৎসবে নীলার গতি শ্লথ হয়। মরুনি দ্রুত হাঁটে। বোহা রেকর্ডসের সিডি বিক্রি হচ্ছে মঞ্চের কাছ থেকে।
জিনস, বুট, বোম্বার জ্যাকেটের টাটুঅলা, ন্যাড়ামাথা ছেলের দলের উদ্দাম উৎসবে অভিভূত চোখ নীলার। বড় ব্যানারে ওআই, স্কা, ছোটতে স্নিক্স, কিডন্যাপ, তলবিয়াক টোডস, ওয়ারিওর কিডস, কমিটারন সেক্ট, দ্য হেরবেরটস। আর ছোটবড় ব্যানারের মধ্যিখানে নীলা। সমুদ্রের গর্জন ছাপিয়ে উঠছে ন্যাড়াদের গর্জন, ল ভলনত দ্য লা নেশন এরিয়েন। নীলা দু হাতে কান চেপে মরুনির দিকে এগোতে থাকে, তখনই রেনজারস্কিনের ধাক্কা, ডক মারটেনের মুহুর্মুহু লাথি নীলার পিঠে, উপুড় হয়ে পড়ে নীলা, পড়ে ফ্যানজাইনে। মরুনি দৌড়ে নীলাকে তুলতে আসে যেই, সেও পড়ে উপুড় হয়ে। কটি গোলাপি আর সবুজচুলো পাংক ভিড় ঠেলে নীলা আর মরুনিকে ওঠায়, নীলার গালে সেঁটে থাকে ফরাসি চুমুর মতো ফ্যানজাইনের গৌরব আর মরুনির দু হাতে রক্ত।
