দানিয়েল বলে, কী ব্যাপার, একবারও তো জিজ্ঞেস করলে না সুইডেনে কেমন কাটালাম?
নীলার জিজ্ঞেস করতে হয় না, দানিয়েল নিজেই বলে সুইডেনের উত্তরে ল্যাপল্যান্ডে এবসুলুত পান করতে করতে রাত বারোটায় মাথার ওপর সূর্য দেখতে কেমন লেগেছিল। নিকল বুঝে পায়নি কখন রাত আর কখন দিন। চব্বিশ ঘণ্টাই আলো থাকলে বোঝা অসম্ভব বটে। শীতের সময় যেমন চব্বিশ ঘণ্টা ও জায়গা অন্ধকার, গরমে তার উলটো। যে জিনিসটি দেখে নিকল, মিশেল আর দানিয়েল হেসে বাঁচেনি তা হল, জেব্রা ক্রসিং-এ ভুল করে গাড়ি থামিয়ে ফেলে, রাস্তায় কোনও লোক ছিল না, কিছু না, কারও কোনও ক্ষতি হয়নি, কিন্তু মারিয়ার নিজে গিয়ে পুলিশকে তার ট্রাফিক নিয়ম ভঙ্গের কথা জানিয়ে জরিমানা দিয়ে আসা। যে জিনিসটিতে দানিয়েল মুগ্ধ হয়েছে তা হল সুইডেনে কোনও জেলখানা নেই, যা আছে তা হল ত্রুটি সংশোধন কেন্দ্র অথবা বয়স্ক শিক্ষায়তন। খুন করার পর বিচারে খুনির শাস্তি হলে পুলিশ এসে খুনিকে অনুরোধ করে, ত্রুটি সংশোধন কেন্দ্রে যেতে। খুনি যদি বলে তার সময় হবে না, তবে কবে সময় হবে জিজ্ঞেস করে। যেদিন সময় হয় সেদিন পুলিশ তাকে কেন্দ্রে ভর্তি করে দেয়, কেন্দ্রে দামি আসবাবে ভরা বাড়ি দিয়ে দেওয়া হয় আত্মীয়স্বজন নিয়ে থাকার, বাদশাহি খানা দেওয়া হয়। এই আয়েসি জীবনযাপনের বাইরে যা করতে হয়, তা হল রুটিন মতো ক্লাস করা। মাস্টাররা আসে নিয়মিত। ক্লাস নেয়। পরীক্ষা নেয়। পাশ করলে ব্যাস ছুটি। কারও ছুটি হয় দশ দিনে কারও তিন মাস লাগে। মাস্টারদের কাজ কেন লোকটি খুন করেছে, তার মনে কী সমস্যা ছিল, কীসের অভাব ছিল তার, তার শৈশব কেমন ছিল, ভালবাসা পরিমাণ মতো পেয়েছে কি না, তার গড়ে ওঠায় কোনও রকম ত্রুটি ছিল কি না এ সব খুঁটিয়ে দেখে বিশ্লেষণ করে, সমস্যার গভীরে গিয়ে সমস্যার সমাধান করা।
সুইডেনের গল্প শুনতে নীলার ইচ্ছে হয় না। এ সব গল্প তাকে মনে করিয়ে দেয় সে ক্ষুদ্র তুচ্ছ একটি মানুষ, যে কোথাও যাবার আমন্ত্রণ পাবার যোগ্য নয়। অহংকার করার একটি গল্পই তার আছে, সে বেনোয়া দুপঁ।
নীলা বলে, একবারও তো তুমি জিজ্ঞেস করলে না আমার প্রেমের কাহিনী!
দানিয়েল আগ্রহ দেখায় না, কিন্তু নীলা বেনোয়া দুপঁর সঙ্গে তার প্রথম দেখা, কাছে আসা, ভালবাসা, বেনোয়ার আলা ফলি প্রেম, বেনোয়ার বেনো জলে তার ভেসে যাওয়া ইত্যাদি বর্ণনা করে। দানিয়েলের প্রশ্নের উত্তরে অবশ্য এ তার বলতে হয় যে বেনোয়ার স্ত্রী কন্যা আছে।
শেষ অব্দি বেনোয়ার রক্ষিতা হয়ে জীবন কাটাতে শুরু করেছ! বাহ বাহ বাহ! অভিনন্দন। দানিয়েল জোরে তালি বাজায়।
নীলা দাঁতে দাঁতে চাপে, এত জোরে তালি বাজিয়ো না। প্রতিবেশীদের ঘুমের অসুবিধে হবে। উফ মাদাম সুজান দুগের আজ রাতে বুঝি ঘুম হল না।
ঠিক তখনই বেনোয়ার ফোন।
কী করছ?
আড্ডা দিচ্ছি, দুজন বন্ধুর সঙ্গে।
বন্ধু? ছেলে না মেয়ে?
মেয়ে।
সমকামী।
একজন। আরেকজন নয়।
তো কতক্ষণ আড্ডা দেবে?
জানি না।
ওরা যাবে তো? না কি থেকে যাবে তোমার বাড়ি?
জানি না।
নিশ্চয় জানো।
না জানি না।
আমার কথা জানে ওরা?
কেন?
বলো। বলো যে তোমার একজন প্রেমিক আছে।
কেন?
কেন নয়? লুকোতে চাও। আমি তো লুকোই না।
লুকোও না? কাকে কাকে বলেছ, আমার কথা?
বলেছি অনেককে।
কী বলেছ, বলেছ তোমার এক রক্ষিতা আছে, তাই না?
বাজে কথা বোলো না নীলা।
বাজে কথা নয়। সত্যি কথা।
খটাস।
.
আড্ডা গড়াতে গড়াতে আরও দূর যায়। নীলার মিমিজঁ যাবার শখ হয়। মরুনিরও হয়। দল বেঁধে না হোক তিজেভি ঘন ঘন যাচ্ছে বোরদো, চড়ে বসলেই হয় আজ বা কাল, দেখা হবে সাগরপারে।
রাত দুটোয় দানিয়েল বেরোয়। মরুনি আরও কয়েক গেলাস শেষ করে তিনটেয় ওঠে।
এত রাতে যাচ্ছ যে, তোমার ভয় লাগবে না রাস্তায়?
মরুনি আকাশ থেকে পড়ে, ভয় লাগবে কেন?
নীলা নিজেকে আবার শুধরে দেয়, এ কলকাতা নয় নীলা, এ প্যারিস।
কোনও এক সম্ভবত প্রতিমা পাল অথবা সরস্বতী দাসের মেয়ে মরুনির জন্য নীলা লক্ষ করে, অযথাই মায়া হচ্ছে তার। মরুনিকে চন্দনকাঠের একটি হাতি উপহার দিয়ে বলে, এর সুগন্ধ কোনও দিন যাবে না। কাছে রেখো।
মরুনি ধন্যবাদ বলে, চুমু খায় নীলার দু গালে। তারপর আলো থেকে আলোয় বেরিয়ে যায়। নীলা একা অন্ধকার বারান্দায় বসে চেয়ারে দুলতে দুলতে কল্পনা করে মরুনি ওই হাতিটির সুগন্ধ নিচ্ছে, ওই হাতিটিকে সে তার বিছানার কাছের টেবিলটিতে রাখবে, হাতিটি দেখতে দেখতে তার হয়তো একদিন মনে হবে কোথাও একটি দেশ আছে তার, সে দেশে এক দুঃখিতা গোপনে কাঁদছে তার হারিয়ে যাওয়া মেয়ের জন্য। সারাজীবন কেঁদে যাবে সেই দুঃখিতা। মরে পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও কাঁদবে সে।
.
মরে গেলে কেউ কি কাঁদে, নীলা ভাবে। মলিনা কি কোথাও বসে চোখের জল ফেলছেন নীলার জন্য!
.
চৌদ্দই জুলাই
চৌদ্দই জুলাইয়ের উৎসব শুরু হয়ে গেছে প্যারিসে। ফরাসি বিপ্লব নীলাকে উত্তেজিত করে ভীষণ, ফরাসিদের যে খুব একটা করছে তা মনে হচ্ছে না তার। বেনোয়া বলে ফরাসি বিপ্লব পালন করা মনে হয় সেই দিনটিকে পালন করা যেদিন আমার টাইফয়েড জ্বর হয়েছিল। বেনোয়া প্যারিস ছেড়ে রোদ পোহাতে চলে গেছে রিভিয়েরায়। ফরাসি বিপ্লবকে বিপ্লব বলেই মানে না সে, বলে খুনোখুনি। শাঁ জার্মা দি প্রের গিজা দেখিয়ে একদিন বলেছিল, এখানে ওই খুনোখুনির সময় গির্জার কত লোকদের নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে! নীলা বলেছে, বেশ ভালই করেছে। গির্জার লোকেরা তো সুবিধে ভোগ করত সবচেয়ে বেশি। রাষ্ট্র আর গির্জাকে আলাদা করে বিপ্লবীরা মহৎ একটি কাজ করেছে। ওই ধর্মবাদীদের খুন না করলে বিপ্লব টিকে থাকত না। বেনোয়া বিড়বিড় করে, একদিকে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা হল, অন্যদিকে গির্জার সম্পত্তির ওপর মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হল, বৃক্ষ কেটে বন উৎপাদনের মতো।
