নীলা বলে, আলবেনিয়া এমন কোনও ধনী দেশ ছিল না। আর ভারতে এসে ভারতের দারিদ্র্য ঘোচাতে তিনি বিন্দুমাত্র কিছু করেননি। সমাজের শ্রেণীভেদ সম্পর্কে কখনও তিনি প্রশ্ন তোলেননি। ধনী দরিদ্রের বৈষম্য নিয়ে কখনও না। ভারতের বড় বড় দুর্নীতিবাজদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। দিয়েছেন বলেই নিয়েছেন। কারা দিচ্ছে কেন দিচ্ছে, টাকাটা কী থেকে উপার্জন, তা একবারও দেখেননি, দেখতে চাননি। হাইতির স্বৈরাচারি জেনারেলের কাছ থেকেও তো টাকা নিয়েছেন। ভারতের কালোবাজারি, লুটেরা, বদমাশদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সমাজে ওদের সম্মানের জায়গায় বসিয়ে গেছেন। কারণ মাদার তেরেসাকে টাকা দিলে পুণ্যের কাজ করা হয়, সাত খুন মাপ হয়, কালো টাকা সাদাও হয়। আর কী জানতে চাও? ভারতের দারিদ্রের বড় একটি কারণ জনসংখ্যার আধিক্য। যেখানে জনসংখ্যা রোধ করা খুব জরুরি একটি ব্যাপার, সেখানে তোমাদের মাদার তেরেসা জন্মরোধের বিপক্ষে সোচ্চার হয়েছেন, ভারতের মতো দেশে। কনডম চলবে না, পিল চলবে না, যিশু মন খারাপ করবেন। এবরশন? তা তো চলবেই না, যিশু হার্টফেইল করবেন।
দানিয়েল আর মরুনি দুজনই উচ্চস্বরে হাসে।
ওয়াইন এক এক বোতল করে শেষ হয়, আর স্বর উঁচুতে উঠতে থাকে তিনজনেরই। সবচেয়ে বেশি ওঠে নীলার। দানিয়েল বলে, কেবল ওয়াইনের কারণে নয়, বাঙালিরা ওয়াইন না খেয়েও জোরে কথা বলে।
নীলা বলে, আমাদের বলতে হয়, প্রচুর জনসংখ্যা তো, এক বাড়িতে এগারোজন করে বাস করে। কিচিরমিচির হাউ মাউ লেগেই আছে। ঘরে মানুষ বাইরে মানুষ, যানবাহনের চিৎকার, ধুলোয় বাতাস ভারী হয়ে থাকে। চিৎকার না করলে কেউ কারও কথা শুনতে পাবে না। অভ্যেস।
নীলার এই হয়। পেটে ওয়াইন পড়লে বিরামহীন বকে যায়।
আবার নীলা মরুনিতে ফেরে, ধরো, এই মরুনির মা, তার বিয়ে হয়নি, বিয়ে না হয়ে বাচ্চা জন্ম দিয়েছে, আর এ এমনই পাপ, যে কোলের বাচ্চাকে আবর্জনায় ফেলে দিতে হয়েছে তার। কিন্তু এবরশন করার সুযোগ হলে, তাকে ওইন মাস বাচ্চা বইবার কষ্টটা ভোগ করতে হত না। আর একটি দুধের শিশুকে ছুঁড়ে ফেলার কষ্ট নিয়েও তাকে সারাজীবন বাঁচতে হত না।
মরুনি হেসে ওঠে, ও প্রভু, তা হলে আমার কী হত! ও মহিলা এবরশন করে ফেললে আমার তো জগৎ দেখা হত না।
জগৎ বলে যে একটা ব্যাপার আছে, তা তো জগতে এসে বুঝেছ। কয়েক সপ্তাহের ভ্রুণ মরুনি মারাটা অনেক ভাল, এক মাসের মানুষ মরুনিকে মারার চাইতে।
দানিয়েল থামায় নীলাকে, থামায়, কিন্তু, দানিয়েল কিছু বলার আগে মরুনি বলে, এবরশন করার সুযোগ হলেই কি সমাজে একটা বড় বিপ্লব ঘটে গেল। বিয়ে হয়নি বলে বাচ্চা জন্ম দেওয়া অপরাধ, এই নিয়মটি পালটানোর কথা বলছ না কেন নীলা!
নীলা এবার দুজনের উদ্দেশেই গলা নামিয়ে বলে, আমি তো বলছি না এ নিয়ম ভাল। মরুনির মা, তার বিয়ে হয়নি বলে, বা মেয়ে জন্মেছে বলে, বা মেয়ে কালো বলে সে কোনওরকম দুঃখ করবে না, এমন একটা সমাজই তো চাই।
দানিয়েল কাঁধ ঝাঁকায়, মুখ বাঁকায়, এরকম সমাজ চাই ওরকম সমাজ চাই, তা বললেই তো হয় না। সে সমাজ গড়ার জন্য কিছু করা চাই। কী করেছ তুমি নীলা? কিছু করেছ?
নীলার শান্ত কণ্ঠ, না কিছু করিনি।
পালিয়ে এসেছ এই তো!
হ্যাঁ পালিয়ে এসেছি। সুখে থাকতে এসেছি। যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াতে এসেছি।
মরুনির হাতের সিগারেটটি নিয়ে নীলা ফোঁকে। ধোঁয়ার রিং বানাতে বৃথা চেষ্টা করতে করতে বলে, ফরাসি বিপ্লবের মতো একটা বিপ্লব দরকার ভারতে।
বিপ্লবে তুমি কী অংশ নেবে? বুর্জোয় পরিবারে জন্ম তোমার, সুবিধে ষোলো আনা পাচ্ছ। দানিয়েল চোখ টিপে বলে।
নীলা হাসে, বুর্জোআজি ছাড়া ফরাসি বিপ্লব সম্ভব হত না।
খানিকক্ষণ ফরাসি বিপ্লব নিয়ে নীলা একা বকে গেল। এ নিয়ে কারও কথা বলার, নীলা লক্ষ করে, আগ্রহ নেই।
চৌদ্দই জুলাইয়ে কে কী করছে সে জানতে চায়। কেউ শাঁজ এলিজেতে কুচকাওয়াজ দেখতে যাবে না, মারণাস্ত্রের প্রদর্শনী দেখবে না, শিরাখের কৃত্রিম আর জসপার অকৃত্রিম হাসি দেখতে ওদের কারও উৎসাহ নেই। দানিয়েল আর নাতালি যাবে মিমিজঁ, আতলান্তিকের পারে, রোদ পোহাতে, সাঁতার কাটতে। মরুনি এখনও ঠিক করেনি কোথায় যাবে।
আর নীলা কী করবে? নীলা বসে বসে বেনোয়ার কথা ভাববে, ভাববে যে সে তাকে ভালবাসে, ভাববে যে সে যেখানেই থাকুক, যতদূরেই, নীলা সারাক্ষণ তার হৃদয়ে আছে।
এরকম ঘরে বসে থাকতে আমার ভাল লাগে না। একটা চাকরি টাকরি করলে ভাল হত। আর বসে খেলে তো রাজার ধনও ফুরিয়ে যায়। নীলা বলে।
তা ফুরোক। হাতে যখন টাকা আছে, যত পারো ঘুরে বেড়াও। যা আনন্দ করার করে নাও। বসে সময় নষ্ট করবে কেন! টাকা ফুরোলে তারপর চাকরি খুঁজো। আমার যদি এত টাকা থাকত, এই চাকরি ছেড়ে দিতাম। বেরিয়ে পড়তাম বিশ্ব ভ্রমণে। ভ্রমণ শেষ করে তারপর সাধারণ জীবনে ফিরতাম। যদি নটা পাঁচটা চাকরি করো, ভ্রমণের সময় এবং খরচা কোনওটাই জোগাড় করতে পারবে না। আর ওই বাক্সবন্দির মতো জায়গায় কাজ করে এত বড় বাড়িতে থাকা, হা হা স্বপ্ন। দানিয়েলের ঠোঁট বেঁকে থাকে।
নীলার একবার মনে হয় দানিয়েল তাকে ঈর্ষা করছে। আরেকবার নিজেকে শুধরে দেয় সে, না করছে না।
