ডান হাতে খেলে বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে না, বাঁ হাতে খেলে দেখাবে তা দানিয়েল যেমন বোঝে না, মরুনিও না।
দানিয়েল বাঁ হাতে লেখে, বাঁ হাতে টেনিস খেলে, বাঁ হাতে বাজারের ব্যাগ হাতে নেয়, বাঁ হাতে সিগারেট নেয়, বাঁ হাতে ওয়াইনের গেলাস ধরে, দেখতে বিচ্ছিরি লাগে কি? লাগে না।
নীলা এর উত্তর জানে না। আসলে যুক্তি নেই। দেখার অভ্যেস নেই, তাই।
হাতে খাওয়ার অভ্যেস নেই বলে দানিয়েলকেও হাত গুটোতে হয়। ও যতবারই হাতে ভাত নিচ্ছিল, ভাত গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছিল হাত থেকে। মুখ অব্দি ভাত ওঠাচ্ছিল হাত ভাঙা রোগীর মতো।
মরুনি তুমি পারবে? নীলার কৌতূহল হয়।
মরুনি সাহস করে না। আবদারের পর সে হাতে ভাত তুলতে গেলে থালা গড়িয়ে পড়ে যায় খাবারসহ ওর কোলের ওপর। বেচারার জামা ঝোলে লাল হয়ে থাকে।
মরুনিকে একটি জামা এনে দেয় নীলা, পরতে। জামাটি পরে কোন দেশের জামা এটি ভারতের নাকি জিজ্ঞেস করায়, নীলার ইচ্ছেটি হয়, মরুনিকে শাড়ি পরানোর।
নীলার ইচ্ছের কথা শুনে হাতে তালি লাগায় দানিয়েল। ওঠে দানিয়েল।
খাবার অর্ধেক ফেলে নীলা মরুনিকে নিজের একটি শাড়ি পরাল। নীলার কুচি কাটা দেখে নয়ন জুড়োল ওদের।
তোমার ওই বুট জুতোজোড়া খোলো তো। মানাচ্ছে না।
নীলা একজোড়া চটি দেয় পরতে মরুনিকে।
হেঁটে আয়নার সামনে যাও। মরুনি হাঁটতে গিয়ে উপুড় হয়ে পড়ল চেয়ারে।
ধীরে বন্ধু ধীরে।
দু বছরের শিশুকে শাড়ি পরিয়ে নীলা হাঁটাচ্ছে, এমনই বোধ হল তার।
আয়নার সামনে ভাবলেশহীন মুখে দাঁড়িয়ে থাকে মরুনি।
খুব সুন্দর লাগছে। লাগছে না। একবারে বাঙালি মনে হচ্ছে তোমাকে। নীলা উত্তেজিত। কেমন লাগছে তোমার? বলো তো।
মরুনি চুপ করে থাকে।
নীলা বলে, যদি ফ্রান্সে না আসা হত, মরুনি ভেরনেস না হয়ে মরুনি পাল বা মরুনি দাস হতে, এরকম শাড়ি পরতে, রবীন্দ্রসংগীত গাইতে।
নীলা মরুনির কপালে লাল একটি টিপ পরিয়ে দেয়।
কী, দেখেছ নিজেকে, কী সুন্দর লাগছে, তাই না!
মরুনি মুখ খোলে, শাড়িটি ভাল সুতোয় বানানো, কিন্তু শাড়িতে তাকে মানাচ্ছে এ তার মনে হয় না। সে তার পাতলুনেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
ভারতীয় মেয়েরা এ পরে কী করে হাঁটে! মরুনি শাড়ি খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করে।
কেবল হাঁটে? দৌড়োয়, ট্রেনে চড়ে, বাসে চড়ে। চর্চায় কী না হয়।
ভারতীয় সংস্কৃতি, মরুনিকে টানছে না, নীলা টের পায়। শাড়ি না পরে, এ সময় জাপানি কিমোনো পরলেও মরুনির একই রকম অনুভূতি হত। ভারতীয় খাবার না রেঁধে আজ মেক্সিকান বা চিনে খাবার রাঁধলেও মরুনির একই রকম আনন্দ হত। নীলা বিশ্বাস করতে শুরু করে মরুনি আগে যা বলেছিল, ভারত তার কাছে যে কোনও একটি দেশ, কলকাতা যে কোনও একটি শহর। নীলার কাছেও কি তাই নয়? নীলা ভাবে।
মাদার তেরেসা কেবল কি মরুনিকেই, এরকম কত লক্ষ মানুষকে বাঁচিয়েছে। দানিয়েল বলে। মরুনিও মাথা নেড়ে সায় দেয়।
মাদার তেরেসার গুণ গাইছে যখন ওরা, নীলা বাধা দেয়, এত গুণ গেয়ো না তো, রাগ লাগে।
নীলার কেন রাগ হয় তা জানতে ওরা আগ্রহী।
নীলার রাগ হয় এই কারণে যে মাদার তেরেসা তাঁর প্রভু যিশুকে খুশি করতে যা করার প্রয়োজন বোধ করেছেন, করেছেন, মানুষের জন্য মায়ায় বা মমতায় কিছু তিনি করেননি। দরিদ্রের দুর্দশা তিনি দূর করতে চাননি, কারণ দুর্দশা ঈশ্বরের দেওয়া। রাস্তা থেকে অসুস্থ মানুষ তুলে এনেছেন নিজের আশ্রমে, খেতে দিয়েছেন, বিছানা দিয়েছেন, আরাম করে মরার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, আর জগৎসুদ্ধ নাম কামিয়েছেন। যারা মাদার তেরেসার গুণ গায় তারা জানে না, কোনও একটি রোগীর জন্যও তিনি ডাক্তার ডাকেননি। চিকিৎসা হলে বেঁচে থাকতে পারত ওরা, তেরেসার আশ্রমে চিকিৎসাহীনতায় মরতে হয়েছে ওদের! রাস্তায় পড়ে থাকলে বরং ভাল হত, একসময় কোনও দরদী লোক, একটি রিকশা করে অথবা টেনে হিঁচড়ে হলেও অন্তত হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারত, সে সুযোগ ছিল। রাস্তায় পড়ে মরতে থাকা রোগীদের মাদার তেরেসা আশ্রমে তুলেছেন, রাস্তায় না মরে বিছানায় রোগীরা মরেছে, এই হল পার্থক্য। যন্ত্রণায় সে সব রোগী চিৎকার করেছে, কিন্তু কাউকে তিনি একটি ব্যথা কমার ওষুধ দেননি। বলেছেন, যন্ত্রণা সইতে, কারণ প্রভু যিশু এই যন্ত্রণা দিচ্ছেন।
আর নিজের বেলায়, তাঁর অসুখের সময় কিন্তু চিকিৎসার অভাব হয়নি। সর্বাধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়েছে তাঁর জন্য, যিশুর দেওয়া যন্ত্রণা তাঁর পোহাতে হয়নি।
মারা তো গেলেন। দানিয়েল বলে।
ভালই তো হল। তাঁর প্রভুর কাছে গেলেন। প্রভু তাঁকে বিরাট পুরস্কার দেবেন। সারাজীবন এই প্রভুকে তুষ্ট করে গেছেন। পুরস্কারের লোভেই তো করেছেন। এ জগতের নোবেলও পাওয়া হল, ও জগতের নোবেলও হল।
মরুনি সিগারেট ধরায়। ধোঁয়া ছেড়ে বলে, এ তুমি ঠিক বলছ না নীলা। নিজের ভোগ বিলাসিতার কথা মাদার তেরেসা ভাবেননি।
নীলার উত্তপ্ত উচ্চ কণ্ঠ, বলো কী? কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ব্যাঙ্কে। সে টাকায় নিজের নামে এখানে ওখানে আশ্রম খুলছেন। পৃথিবীর তাবৎ লোক তাঁকে মহা সম্মান করছে। বিরাট তারকা তিনি। মানুষের প্রশংসা তিনি প্রতি মুহূর্তে ভোগ করেছেন।
দানিয়েল বলে, গরিব দেশের মানুষের দুঃখ দূর করতেই তিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাই তিনি কলকাতা গেছেন।
