রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে নীলাকে অবাক করে এক কিলো ভুট্টার গুঁড়ো কিনে প্যারিসের বাইরে বোয়া দ্য বোলোনে গিয়ে ঠিক ঠিকই নির্জন জঙ্গলে ছড়িয়ে দিল বেনোয়া।
.
বাড়ি ফিরে নীলা সারাদিনের চমক সামলাতে বাথটাবের ফেনা তোলা জলে নেমে পড়ে। বেনোয়াও নামে। টাবের কিনারে দুজনের জন্য দু গেলাস বোরগোন ওয়াইন রাখা। কড়া বাতি নিবিয়ে কেবল দুটো মোম জ্বালানো। মায়াবী আলোয় ডুবে দুজনেই অল্প অল্প ওয়াইন পান করে। বেনোয়া হাততোয়ালেতে তরল সাবান ঢেলে নীলার শরীরে বুলিয়ে দেয়। নীলার ভাল লাগতে থাকে, সারাদিনের তার ভাল না লাগার ঘটনাগুলো একটু একটু করে দূরে সরতে থাকে। সাদা ফেনার তলে ডুবে থাকে নীলার শরীর, কেবল চেরিদুটো উঁকি দেয়। চেরি খেতে বেনোয়া ঝুঁকে আসে নীলার দিকে। জিভ বাড়াতেই চেরি ডুবে যায় ফেনার তলে। লুকোচুরি খেলা চলে জিভের জলে আর চেরিতে। বেনোয়ার শরীর ফুঁড়ে জেগে উঠতে থাকে আরেক শরীর। সে শরীরটির স্পর্শ নীলা তার গায়ে পায়ে পেতে থাকে, শ্বাস ঘন হতে থাকে তার, বেনোয়ারও। নীলার পা দুটো জলের ভেতর থেকে তুলে আনে ওপরে, যেন পা নয়, অতল জলে হারিয়ে যাওয়া কোনও রহস্য, বেনোয়া মুগ্ধ চোখে দেখে ভেজা মসৃণ পা, বাদামি পা। বেটোফেনের বাজনার তালে তালে বেনোয়ার শরীর ওঠে নামে নীলার শরীরে, যতক্ষণ না অসুরের চিৎকারের মতো মোবাইল বাজে।
রাত এগারোটায় বেনোয়া বেরোয়। যাবার সময় আরও একটি চমক দেয়। সে কাল আসছে না, কেবল কাল নয়, দশ দিন তার আসা হবে না, রিভিয়েরায় যাবে বউ বাচ্চা নিয়ে, ছুটি কাটাতে, সমুদ্র পারে রোদ পোহাতে। আর নীলা কী করবে? বেনোয়ার কথা ভাববে, ভাববে যে সে তাকে ভালবাসে, ভাববে যে সে যেখানেই থাকুক, যতদূরেই, নীলা সারাক্ষণ তার হৃদয়ে আছে।
দরজা বন্ধ করে জানালা বন্ধ করে আলো বন্ধ করে বেটোফেন বন্ধ করে অতল নৈঃশব্দ্যের ভেতর নীলা যখন তার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনছে কেবল, দরজায় কড়া নড়ে।
বেনোয়া, সিঁড়ির মুখ থেকে ফিরে এসেছে যে জিনিসটি জানা হয়নি, জানতে।
.
তোমার ওই ফ্ৰাসোয়াটা কে?
ভলতেয়ার।
.
সন্ধে বরদোর স্রোতে ভাসে, রাত ওড়ে গুলোয়াজের ধোঁয়ায়
মরুনি আর দানিয়েলের নেমন্তন্ন নীলার বাড়িতে। নিজের বাড়ি হলে মরুনিকে বাঙালি খাবার খাওয়াবে, এরকম ইচ্ছে ছিলই নীলার। দানিয়েলকে ডাকার পেছনে কারণ, এক, দুজনের পক্ষে অতিরিক্ত খাবার তৈরি করা হয়ে গেছে, দুই দানিয়েল বন্ধু হিসেবে এক সময় মন্দ ছিল না, তিন, দানিয়েল দেখে যাক নীলা পরনির্ভর নয় আর।
আমার বাড়ির তুলনায় এ তো দেখছি প্রাসাদ। দানিয়েল ঘরগুলো দেখে আর বলে।
কেবল দারিদ্র্যই ঘোচেনি, নীলা প্রেমে পড়েছে এবং সুখে আছে এ দুটো খবরও শ্যাম্পেনের বুদবুদের মতো নীলা থেকে বেরোয়।
রাতে ঘরের বাতি নিবিয়ে খাবার টেবিলে প্রথামতো মোম জ্বেলে দেওয়া হল, ভারতীয় খাবারের সঙ্গে ভারতীয় সংগীত হলে মন্দ হয় না, রবীন্দ্রসংগীত চালিয়ে দেওয়া হল। নীলা লক্ষ করে গানের দিকে কান কারও পাতা নেই। নীলাই কান পেতে কান পেতে রই শোনে, শোনে ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান..আর বলে মরুনি, তুমি যদি বাংলা জানতে, কাঁদতে গান শুনে।
মরুনি জোরে হেসে ওঠে।
থালা সাজিয়ে গেলাসে ওয়াইন ঢেলে দিয়ে নীলা পরিবেশন শুরু করে।
আমরা নিজেরা নিয়ে নিতে পারব, ঠাকুরমা, তুমি বসো। দানিয়েল বলে।
দানিয়েলের অভিজ্ঞতা আছে বাঙালির সপ্তব্যঞ্জনের। মরুনির নেই, ঠোঁট টিপে হাসে টেবিল ভরা খাবার দেখে।
মনে হচ্ছে, পঞ্চাশ জনের খাবার রান্না করেছ।
তুমি যদি কলকাতা থাকতে মরুনি, তা হলে ঠিক এই রাঁধতে, আমি যা রেঁধেছি।
বাঙালি খাবার মাছ ভাত, কাঁটা ছুরিতে খেতে নীলার ইচ্ছে করে না, সে হাতে শুরু করে। মরুনি হাঁ হয়ে নীলার হাতে খাওয়া দেখে।
ভাত নিয়ে সেই ভাতের সঙ্গে সবজি মাছ মাংস সব একবারেই ওরা নিয়ে নেয়। থালার কিনারে নুন নেওয়ার মতো করে মরুনি ভাত নেয়, মাছ আর মাংসের পরিমাণ বেশি। হলে কী হবে, রুইয়ের একটি টুকরো খেতে নিয়েই সে টের পায়, মাছ তার পক্ষে খাওয়া সম্ভব হবে না, কাঁটা। কাঁটা বলে দানিয়েলও মাছ ছুঁল না, মাংসের ওপর ঝড় গেল। ভাত ভাতের মতো পড়ে রইল। তলবিয়াকের চিনে দোকান থেকে কেনা রুই তেলাপিয়া, কই নীলার জিভেই রুচল কেবল।
নীলা হাতে মাছের ঝোলে ভাত মাখতে মাখতে মরুনিকে বলে, কখনও দেখোনি কাউকে হাতে খেতে?
মরুনি দেখেনি, কখনও চোখের সামনে দেখেনি, যা দেখেছে পর্দায়, আফ্রিকার দুর্ভিক্ষ দেখায় যখন টেলিভিশনে, তখন।
হাতে খাওয়ার স্বাদই অন্যরকম। খেয়ে তৃপ্তি হয়। নীলা বলে।
দানিয়েল কাঁটা ছুরি ফেলে বাঁ হাত ডুবিয়ে দিল খাবারে। নীলা আঁতকে ওঠে দেখে।
বাঁ হাতে খেতে হয় না, ডান হাতে খাও। নীলা চেঁচিয়ে বলে।
আমি তো বাঁ হাতি, দানিয়েল বলে।
বাঁ হাতে খেতে হয় না কেন? মরুনি জিজ্ঞেস করে।
নীলা বলে, বাঁ হাতে নোংরা কাজ করা হয়, তাই।
নোংরা কাজ?
মল মূত্র ত্যাগের পর বাম হস্তে আমরা আমাদের গোপন অংশগুলো ধৌত করি কিনা।
দানিয়েল বলে, কিন্তু আমরা তো ধৌত করি না। কাগজ ব্যবহার করি।
তবু দেখতে যেন কেমন বিচ্ছিরি দেখায়। নীলার নাক কুঁচকে ওঠে, যেন দানিয়েলের বাঁ হাত থেকে ভুরভুর করে দুর্গন্ধ বেরিয়ে সোজা তার নাকে ঢুকছে।
