পরে একটু বিষয় হসিয়া বলিল—ওতে আমার মায়ের কথা আছে—
তুলির বিষণ্ণ হাসিটা কাজলের হৃদয়ের মর্মস্থানে আঘাত করিল। বেচারা! ও নিশ্চয় নিজের মায়ের শূন্যতাময়, ব্যর্থ জীবনের কথা জানে। সে বলিল—তুমি কী এইখানেই থাকো?
-হ্যাঁ। দিদিমা এই বাড়িতে থাকতেন, মা মারা যাবার পর দিদিমার কাছেই আমি মানুষ হয়েছি। দিদিমাও মারা গিয়েছেন আজ দু-মাস। এবার হয়তো কলকাতা চলে যাব
-ভবানীপুরের বাড়িতে থাকবে?
তুলি অবাক হইয়া তাকাইল—ভবানীপুরের বাড়ির কথা আপনি জানেন?
-জানি। বাবার ডায়েরিতে পড়েছি। তোমাদের-তোমার মায়ের অনেক কথা আছে তাতে–
তুলি আগ্রহের সঙ্গে বলিল—মায়ের কথা। আমাকে সে ডায়েরি একবার পড়াবেন?
-বেশ তো। তুমি কলকাতায় গিয়ে তোমাদের ঠিকানা আমাকে জানিও, আমি তোমাকে পড়তে দিয়ে আসবো। আমার ঠিকানা তোমার মামার কাছে দিয়ে যাচ্ছি।
তুলি ঘাড় কাত করিয়া সম্মতি জানাইল, তারপর বলিল—ভবানীপুরের বাড়ি কিন্তু আর নেই, বিক্রি হয়ে গিয়েছে। বড়োমামার কথা জানেন কিনা, তব নাম রমেন, তিনি নানারকম বদখেয়ালে সমস্ত সম্পত্তি নষ্ট করে ফেলেছেন। কেবল বর্ধমানের বাড়িটা আছে, তাও হয়তো শিগগিরই দেনার দায়ে বিক্রি হয়ে যাবে। ছোটমামা, এই মামা, তিনি কিছু নেন নি। পড়াশুনো করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। আপনার বাবার বইতে আমাদের কথা যেমন পড়েছেন, আমরা এখন কিন্তু আর তেমন নেই—এখন আমরা গরিব হয়ে গিয়েছি।
কাজল বলিল—আমাকে তুমি এসব কথা বলছো কেন তুলি? আমাদের সঙ্গে তোমাদের সম্পর্কটা অন্যরকম, তোমরা গরিব কি বড়োলোক তাতে কিছু এসে যায় না।
পরে আলোচনার মোড় অন্যদিকে ফিরাইবার জন্য বলিল—তুমি পড়াশুনো করো তো?
–ছোটবেলায় স্কুলে পড়েছি, বড় হবার পর বাড়িতে মাস্টারমশাই এসে পড়িয়ে যান। এখানে বাঙালি মেয়েদের পড়বার মতো তেমন ভালো ইস্কুল নেই কিনা। ইচ্ছে আছে এইবারে কলকাতায় কোথাও ভর্তি হয়ে ম্যাট্রিকটা দিয়ে দেব–
এইসময় বিমলেন্দু ফিরিয়া আসিলেন।–তোমার খাওয়া হয়ে গিয়েছে দেখছি, চা খাবে? কাজল জানাইল-এইসময়ে সে চা খায় না।
—তুমি আসায় আমি যে কত খুশি হয়েছি তা বলতে পারি না। দেখা যখন হল, এবার থেকে মোগাযোগ রাখবে, কেমন? তোমার ঠিকানাটা দাও দেখি–
কাজল নিজের ঠিকানা লিখিয়া দিয়া বিমলেন্দুকে বলিল—আপনার ঠিকানাটা?
—আমি কিছুদিনের মধ্যেই কাশী থেকে চলে যাচ্ছি, কলকাতায় কোথায় উঠব এখনও কিছু ঠিক হয়নি। মাসখানেকের মধ্যে চিঠি দিয়ে তোমাকে জানাব–
বিদায় দিতে আসিয়া ফটকের কাছে বিমলেন্দু বলিলেন—অনেক কথা তোমায় বলবার আছে, বাবাকে তুমি বেশিদিন পাও নি, তোমারই দুর্ভাগ্য। আর একটু বেশি বয়েস পর্যন্ত তার সাহচর্য পেলে সেটা তোমার জীবনের অক্ষয় সৌভাগ্য হয়ে থাকত। অমিতাভ, আমি জোর গলায় বলছি—অমন মানুষ হয় না। সে সব কথা একদিন তোমাকে বলব–
—আপনি আর কদিন আছেন কাশীতে?
—দিন-পনেরো খুব বেশি হলে। তুমি?
–আমার তেমন কিছু ঠিক নেই, তবে হপ্তাখানেকের বেশি হয়ত্বে থাকবো না—
বিমলেন্দু বলিলেন–সন্ধের দিকে আমি রোজই একবার দশাশ্বমেধ ঘাটের দিকে বেড়াতে যাই। ওখানে যদি ওইসময়ে কখনও আসে, তাহলে দেখা হতে পারে।
ধর্মশালায় ফিরিতে ফিরিতে কাজলের মনে হইল আকাশ-বাতাসের রঙ যেন বদলাইয়া গিয়াছে। এক ধরনের ঘটনা আছে, যাহা ঘটিয়া গেলে জীবনের অর্থ সম্পূর্ণ বদলাইয়া যায়—কিছুই আর যেন পুর্বের মতো থাকে না। তুলির সহিত দেখা হওয়াটা ঠিক সেইরকমের ঘটনা। ডায়েরিতে বাবার গৃঢ় ইচ্ছাটা পড়িয়া থাকিবার জন্যই হোক বা প্রথম যৌবনের আশীর্বাদপূত অলৌকিক বয়েসে সুন্দরী একটি মেয়ের সহিত পরিচয় ঘটিয়া যাইবার জন্যই তোক, তাহার ভিতরে এতদিনকার ঘুম ভাঙিয়া কে যেন জাগিয়া উঠিল। সবই ঠিক আছে, সে সেই পুরাতন অমিতাভই রহিয়াছে, তবু সে যেন ঠিক পুরাতন মানুষটা নহে।
রাত্রিতে বিছানায় শুইয়া ঘুম আসিতেছিল না। ধরমদাস আর রামচরণ আজ নৌকায় করিয়া রামনগর গিয়াছিল। সেখানকার রাজবাড়ি দেখিতে যাইবার পথে এক সাধুর দর্শন পায়। সেই গল্প ধরমদাস উৎসাহের সহিত করিয়া চলিয়াছে। খুব ভারি সাধু, কেবল মুখের দিকে তাকাইয়া ভূতভবিষ্যৎ বলিয়া দিতে পারেন, হাত অবধি দেখিবার প্রয়োজন বোধ করেন না। ধরমদাসের যে বর্তমানে সময়টা ভালো যাইতেছে না, আর রামচরণের ছোটবেলায় বসন্ত হইয়াছিল—এসব তো তাহারা গিয়া বসিবামাত্র বলিয়া দিলেন। অনেক ভাগ্যে এমন সাধুর দর্শন মেলে।
শুনিতে শুনিতে কাজল অন্যমনস্ক হইয়া গেল। তুলিকে তাহার এত ভালো লাগিল কেন? সুন্দরী বলিয়া? কিন্তু সুন্দরী মেয়ে তো সে অনেক দেখিয়াছে—অবশ্য তুলি সত্যই অদ্ভুত সুন্দরী, তাহার দেখা অনেকের অপেক্ষা বেশি, তবু বোধহয় কেবল বাহিরের সৌন্দর্য তাহাকে মুগ্ধ করে নাই। লীলার মেয়ের সহিত তাহার বিবাহ হইবার যে সম্ভাবনার কথা বাবা ডায়েরিতে প্রকাশ করিয়াছে সেই মধুর সম্ভাবনার ইঙ্গিত মনের জানালা দিয়া তাহার চেতনার গভীরে প্রবেশ করিবার উদ্যোগ করিল। আর একটা বড়ো কারণ—তুলির বর্তমান জীবনের অসহায়তা। লীলার হীরক রায়ের সঙ্গে গৃহত্যাগের ঘটনা কাজল জানে, তাহা লইয়া সমাজে বিশ্রী ঘোট হইয়াছিল তাহাও তাহার অজানা নাই। সত্যই তুলির বিবাহ হওয়া কঠিন। যতই সুন্দরী হোক, অমন মায়ের মেয়েকে কেহ গৃহবধূ করিয়া ঘরে তুলিয়া লইবে না। কিন্তু বাবার বই পড়িয়া মনে মনে সে লীলাকে দেবীর আসনে বসাইয়াছে। মনের দেবমন্দিরে প্রতিষ্ঠিত সেই মূর্তির গায়ে কোনো কলঙ্কের দাগ পড়িতে পাবে না। সমাজ যাহাই বলুক, লীলাকে বিচার করিবার দায়িত্ব তাহার উপর ন্যস্ত নাই, সে অধিকারও তাহার নাই।
