কাজল বলিল–বাবাও বেঁচে নেই, আমার ছোটবেলাতেই মারা গিয়েছেন।
বৃদ্ধ কেমন একটা অসহায় না-বুঝিবার ভঙ্গিতে তাকাইয়া বলিল–কেউ বেঁচে নেই? তোমার বাবাও মারা গিয়েছে? তার তো মরার বয়েস হয়নি
তারপর কাজলকে বলিল—কাছে এসে দেখি, পড়াশুনা করো?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি এবার এম.এ. দেব—
বৃদ্ধ সস্নেহে তাহার গায়ে হাত বুলাইয়া বলিল—ভাল। মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া কববে।
কাজল বলিল–আপনার নামটা তো জানা হল না–
—সে জেনে আর কী হবে? আমাকে যারা চিনতে পাবত তারা তো আর কেউ বেঁচে নেই বল্পে। তোমার বাবা থাকলে নন্দবাবু বললে চিনত—
—আমি কিন্তু আপনার নাম জানি—
বৃদ্ধ বলিল—তুমি কীভাবে আমার নাম জানবে? কে বলেছে তোমাকে?
—কেউ বলেনি। কয়েকখানা বই লিখে মারা যাবার আগে বাবা খুব নাম করেছিলেন। তার মধ্যে একখানা বই বাবার নিজের জীবন নিয়ে লেখা। সেই বইতে আপনার নাম আছে
নন্দবাবু একটু থতমত খাইয়া বলিল—আমার কথা? কী লেখা আছে তাতে?
প্রকৃত কথা বলিতে গেলে নন্দবাবুর মদ্যপান ও আনুষঙ্গিক দুশ্চরিত্রতার কথা বলিতে হয়। কাজল বলিল—ওই আপনি যা বললেন, ঠাকুরদার মৃত্যুর সময়ে আপনার সাহায্যের কথা।
—শুধু ওই?
—আর কী থাকবে?
বৃদ্ধ একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল–নাঃ, কিছু না—আর কী থাকবে।
বিদায় লইয়া কিছুদুর আসিয়া পিছন ফিরিয়া কাজল দেখিল নন্দবাবু প্রস্তরমূর্তির মতো বোয়াকে বসিয়া আছে। আবার সে হয়তো কাশী আসিবে, এই বাড়িটা দেখিতে আসিবে-কিন্তু তখন নন্দবাবু বোধহয় আর থাকিবে না।
মহাকালের ঘটিকাযন্ত্র নিপে কাজ করিয়া চলিয়াছে। আগ্রহী জন ছাড়া কে তার নিঃশব্দ প্রহর ঘোষণা শুনিতে পায়?
» ০৮. পরের দিন সকালের দিকে
অষ্টম পরিচ্ছেদ
পরের দিন সকালের দিকেই কাজল নারদ ঘাটের ঠিকানাটায় খোঁজ করিতে গেল।
এবার অবশ্য ঠিকানা বাহির করিতে অসুবিধা হইল না। রাস্তার উপরেই বেশ বড়ো বাড়ি। সামনে লোহার কারুকার্য করা ফটক। দেখিলেই মনে হয় বেশ ধনীর বাড়ি—যদিও এখন কিঞ্চিৎ শ্রীহীন। ভিতরে লোকজনও বিশেষ আছে বলিয়া মনে হইল না। ফটকের ভিতরেই একজন বিহারী দারোয়ান বসিয়া খৈনি ডলিতেছে। কাজল তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল–বাবু আছেন?
নিচের ঠোঁটটা টানিয়া চূর্ণীকৃত খৈনি সেই গহ্বরে নিক্ষেপ করিয়া দারোয়ান বলিল—ববালিয়ে বাবুসাহেব, কিত্সকো চাহিয়ে?
—মিঃ রায়চৌধুরী আছেন? আমি তার সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই।
—জী, আইয়ে—
পুরাতন ধরনের আসবাবে সাজানো ড্রয়িংরুমে তাহাকে বসাইয়া লোকটা ভিতরে খবর দিতে গেল। ঘরে বিচিত্র গঠনের সেকেলে মেহগনি কাঠের চেয়ার, মেঝেতে বহু ব্যবহারে জীর্ণ সূতা বাহির হওয়া কার্পেট, কাঁচের টপ সমন্বিত ভারি টেবিল, দেওয়ালের সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো বিলাতি ল্যান্ডস্কেপ-সমস্তই এই পরিবারের হৃত গৌরবের সাক্ষ্য দিতেছে। তাহার বাবার সহিত ইহাদের কীরূপ যোগাযোগ ছিল?
ভিতরের দরজা দিয়া একজন অত্যন্ত সুপুরুষ বছর পঞ্চাশ-বাহান্নর ভদ্রলোক ঘরে ঢুকিয়া একটু বিস্ময়ের সঙ্গে কাজলের দিকে তাকাইলেন।
কাজল দাঁড়াইয়া নমস্কার করিয়া বলিল–আমি একবার মিঃ রায়চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে চাই—
প্রতিনমস্কার করিয়া ভদ্রলোক বলিলেন–আমিই বিমলেন্দু রায়চৌধুরী। কী দরকার বলুনতো? আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি বলে মনে হচ্ছে-বসুন!
বসিয়া কাজল বলিল—আমাকে বোধহয় কোথাও দেখেন নি। এবার কাশীতে আসার সময় ট্রেনে একজন সাংবাদিক ভদ্রলোকের সঙ্গে আপনার আলাপ হয়েছিল, তার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে আসছি–
বিমলেন্দু বলিলেন—ট্রেনে! ওঃ হ্যাঁ, নির্মল চট্টোপাধ্যায় বলে এক ইয়াং ভদ্রলোক-তাঁর কাছ থেকে ঠিকানা পেয়েছেন? আমি কী আপনার কোনও কাজে আসতে পারি?
কথা বলিতে বলিতে কাজল ভদ্রলোককে লক্ষ করিতেছিল। প্রৌঢ়ত্বের প্রথম ধাপে দাঁড়াইয়াও মানুষটি দেখিতে আশ্চর্য রকমের সুন্দর। যৌবনেও লোকে এত রুপবান হয় না। কাব্যে নারীসৌন্দর্যের জয়গান আছে, কিন্তু পুরুষও যে এত সুন্দর হইতে পারে তাহা সে এই প্রথম দেখিল।
কাজল বলিল—আমি কোনও কাজ নিয়ে আপনার কাছে আসিনি, কেবল একটা বিষয় জানবার খুব কৌতূহল হওয়ায় এসেছি। সেদিন ট্রেনে আপনি আর নির্মলবাবু সাহিত্যিক অপূর্বকুমার রায়ের প্রসঙ্গে আলোচনা করছিলেন, তাই না? আপনি বলেছিলেন অপূর্ব রায়ের সঙ্গে আপনার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল, সেই পরিচয়ের ব্যাপারটা আমি একটু জানতে চাই–
বিমলেন্দু বলিলেন—আপনিও কী সাংবাদিক? আর্টিকেল লিখবেন?
–আজ্ঞে না।
–তবে? এ প্রসঙ্গে আপনার উৎসাহের কারণ কী?
কাজল একমুহূর্ত চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল—আমি অপূর্বকুমার রায়ের ছেলে, আমার নাম অমিতাভ রায়।
বিমলেন্দু প্রথমে স্থির হইয়া বসিয়া রহিলেন, যেন কাজল কী বলিয়াছে তিনি শুনিতে পান নাই। তাহার পর তাহার মুখের উপর দিয়া পরপর অনেকগুলি ভাবের ঢেউ খেলিয়া গেল। সটান দাঁড়াইয়া উঠিয়া তিনি বলিলেন—আপনি—তুমি অপূর্ববাবুর ছেলে! অই তোমাকে দেখে প্রথমেই তোমাকে কেউ বলেনি তোমার চেহারা অবিকল তোমার বাবার মতো? কেবল মনে হচ্ছে কোথায় দেখেছি—এখন বুঝলাম। এই বয়েসে তোমার বাবা ঠিক এইরকমই দেখতে ছিলেন। তুমি কাশীতে কী করছো?
বেড়াতে এসেছি। ছোটবেলায় বাবা কাশীতে থাকতেন জানেন বোধহয়, বাবার ডায়েরি থেকে ঠিকানা পেয়ে সে বাড়িটা দেখতে এসেছিলাম। সেখানেই তো নির্মলবাবুর সঙ্গে পরিচয়। উনি আপনার কথা বললেন–
