স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করিতে করিতে কাজল অপালাকে বলিলআপনার মধ্যেও বেশ কবিত্ব আছে, নইলে কলাবাগানের ধারে গিয়ে বসে ছিলেন কেন?
অপালা অবাক হইয়া বলিল—কী করে জানলেন? আমি তো একা বসে ছিলাম–
—কথাটা ঠিক কিনা?
-বসে ছিলাম সেটা ঠিক, কবিত্বের ব্যাপারটা আপনার মনগড়া। আপনি ওদিকে গিয়ে আমাকে দেখতে পেয়েছিলেন, না?
–না।
–তবে?
কাজল হাসিয়া বলিল—আপনার সমস্ত শাড়িতে চোরকাটা লেগে আছে। বাগানে ওই জায়গা ছাড়া আর কোথাও চোরকাটা নেই আমি দেখেছি। আর না বসলে শুধু পায়ের দিকে লাগত, সমস্ত কাপড়ে লাগত না। এ থেকেই অনুমান করলাম।
—আপনি বুঝি খুব ডিটেকটিভ বই পড়েন? গল্পের গোয়েন্দারা জুতোর তলায় সুরকির দাগ আর বেড়াবার ছড়ির ডগা দেখে সব বলে দিতে পারে—
কাজল বলিল—এটুকুর জন্য ডিটেকটিভ বই পড়তে হয় না, এমনিই বলা যায়। তবে হ্যাঁ, পড়ি বইকি–শার্লক হোমসের গল্প আমার খুব প্রিয়।
—চেস্টারটনের লেখা পড়েছেন? ফাদার ব্রাউন স্টোরিজ?
কাজল লজ্জিতমুখে বলিলনাঃ, খুব প্রশংসা শুনেছি–
–পড়ে দেখবেন, খুব ভালো লাগবে। আপনি, এমনিতে কী ধরনের বই পড়তে ভালোবাসেন, বলুন তো দেখি—আমার সঙ্গে মেলে কিনা—
সমস্ত ট্রেনযাত্রার সময়টা তাহারা গল্প করিয়া কাটাইল। বিশেষ কোনও বিষয়ে আলোচনা নহে, মনে আনন্দ থাকিলে এই বয়েসটায় অকারণেই উচ্ছল হইয়া ওঠা যায়।
নোটবুক হইতে কাগজ ছিড়িয়া কাজল অপালাকে তাহার ঠিকানা লিখিয়া দিল। শেয়ালদা হইতেই পরস্পরের নিকট বিদায় লইয়া যে যাহাব বাড়ি চলিয়া গেল। কেবল কাজল জীবনে এই প্রথম বাড়ি ফিরিবার জন্য কোনও তাড়া অনুভব করিল না। হ্যারিসন রোড ধরিয়া সে অকারণেই আঁটিয়া কলেজ স্ট্রীটের মোড় পর্যন্ত গিয়া আবার শেয়ালদায় ফিরিয়া আসিল। সবই ঠিক আছে সেই অবিরাম জনস্রোত, বিদ্যুৎবাতির সমারোহ, কলিকাতা শহরটা। কেবল তাহার মধ্যে অকস্মাৎ যেন কী একটা পরিবর্তন হইয়া গিয়াছে।
০৪. সেদিন কী কারণে ছুটি ছিল
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
সেদিন কী কারণে ছুটি ছিল, সকালে বাহির হইবার তাড়া নাই। কাজল পড়িবাব ঘরে চৌকির উপর আধশোয়া হইয়া খবরের কাগজে চোখ বুলাইতেছিল। সে এমন অনেক লোক দেখিয়াছে যাহারা সকালে উঠিয়া কোনরকমে দাঁতটা মাজিয়া লইয়া হিংস্রভাবে খবরের কাগজকে আক্রমণ করে এবং প্রাণপণে পড়িতে পড়িতে দুইঘণ্টার মধ্যে এমন কী বেহালার পাচনের বিজ্ঞাপন পর্যন্ত নিঃশেষে চিবাইয়া ফেলে। কিন্তু সে নিজে খবরের কাগজ পড়িতে বিশেষ ভালোবাসে না। সমস্ত পাতাগুলি জুড়িয়া কেবল যুদ্ধের খবর, নয়তো আজেবাজে হেঁদো গল্প—আর রাজ্যের বিজ্ঞাপন। এসব খবরের প্রয়োজন নাই এমন কথা সে বলে না, কিন্তু ইহা অপেক্ষাও মহত্তর ঘটনা কোথাও ঘটিতেছে না সে কথাও বিশ্বাস করা কঠিন। ভালো খাওয়া ভালো পরার প্রয়োজনের বাহিরে যে অতিরিক্ত কর্মোৎসাহ মানুষকে একদিন পশুত্বের স্তর হইতে টানিয়া উঠাইয়াছিল, সে সম্বন্ধে সংবাদ কোথায়? এই মুহূর্তে সারা পৃথিবীতে মানুষ কি কেবল যুদ্ধ করিতেছে? কেবল ক্ষমতালাভের চক্রান্ত করিতেছে? কেহ কি গোলাপফুলের নতুন প্রজাতি সৃষ্টির জন্য গবেষণা করিতেছে না? কোনও অখ্যাত, দরিদ্র মানুষ কি গত একবৎসরে কোথাও মহৎ উদ্দেশ্যে আত্মোৎসর্গ করে নাই? জ্যোতির্বিজ্ঞানের কোনও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয় নাই? একঘেয়ে খবর পড়িয়া মানুষ কী যে আনন্দ পায়। কাজলের তো বিরক্তি ধরিয়া গিয়াছে।
এই সময়েই বাহিরের দরজায় কড়া নড়িয়া উঠিল।
দরজা খুলিয়া কাজল দেখিল ধুতি আর শার্ট পরা চোখে চশমা বছর ত্রিশ বয়েসের এক ভদ্রলোক দাঁড়াইয়া আছেন। হাতে কয়েকখানা বই এবং একটি চামড়ায় বাঁধানো মোটা খাতা। চেহারায় পরিশীলিত বুদ্ধির ছাপ।
কাজল জিজ্ঞাসা করিল—আপনি কাকে চাইছেন? ভদ্রলোক মার্জিত গলায় বলিলেন–এইটে কি সাহিত্যিক অপূর্বকুমার রায়ের বাড়ি?
কাজলের বুকের মধ্যে হঠাৎ কেমন করিয়া উঠিল। কতদিন পরে আবার কেহ বাবার নাম করিয়া বাড়ির খোঁজ করিতেছে। বহুদিন পরে এমনটা হইল।
–আজ্ঞে হ্যাঁ। কী দরকার যদি–
–দরকার সে অর্থে কিছুই না। আমি ওঁর লেখার একজন ভক্ত, পাবলিশারের কাছ থেকে ঠিকানা জোগাড় করে একবার ওঁর স্ত্রী আর ছেলের সঙ্গে কথা বলতে এলাম। শুধু শ্রদ্ধা নিবেদন ছাড়া আমার আর কোনও উদ্দেশ্য নেই। একবার কি–
কাজল ভদ্রলোককে আনিয়া নিজের পড়িবার ঘরে বসাইল। ভদ্রলোক চারিদিকে তাকাইয়া দেয়ালে টাঙানো অপুর বড়ো ছবিখানা কিছুক্ষণ দেখিলেন, তারপর বলিলেন–একটা কথা জিজ্ঞাসা করছি, কিছু মনে করবেন না। ভুল হলে মার্জনা করবেন। আচ্ছা, আপনি কি অপূর্ববাবুর ছেলে?
কাজল হাসিয়া ঘাড় হেলাইয়া জানাইল-হ্যাঁ।
—আমি ঠিকই ধরেছি তাহলে। আপনার বাবার সঙ্গে আপনার চেহারার খুব মিল রয়েছে, জানেন? আমার দেখেই মনে হয়েছিল—আপনার মাও তো এখানে আপনার সঙ্গেই থাকেন, তাই না? ওঁকে একবার প্রণাম করে যাব–
-হ্যাঁ, নিশ্চয়। মা স্নান করছেন, আপনি বসুন। চা খাবেন তো?
–তা চা একটু হলে মন্দ হয় না
ভদ্রলোকের চা-পানের মাঝপথে হৈমন্তী আসিয়া ঘরে ঢুকিল। ভদ্রলোক সম্রমে, ব্যস্ততায় তটস্থ হইয়া খটাখট শব্দে পেয়ালা-পিরিচ টেবিলের উপর রাখিয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন, বলিলেন— আমার নাম জগদীশ চৌধুরী, কলকাতায় ভবানীপুরে থাকি। কলেজে পড়ার সময় থেকেই অপূর্বকুমাব রায়ের লেখা আমার খুব ভালো লাগে। ওঁর সব বই-ই আমি বহুবার করে পড়েছি। আপনাদের সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছে আমার অনেকদিনের। তাই ভাবলাম–
