দুইজনে কোন কথা না বলিয়া বসিয়া রহিল। বিবি ডাকোব বিবাম নাই। চাঁদ ইউক্যালিপটাস গাছ দুইটাব মাঝখান দিয়া ধীরে ধীরে নামিয়া পড়িতেছে। তাহাদের ছায়া ক্রমশ দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইয়া আসিল। চাঁদের আলো স্নান হইবাব সঙ্গে সঙ্গে নক্ষত্রগুলি উজ্জ্বল হইয়া ফুটিয়া উঠিতেছে। বাতাস একবার গাছের পাতায় হালকা দোলা দিল।
–হৈমন্তী।
–কী?
–না, থাক–
হৈমন্তী অপুর হাত ধরিয়া বলিল–বলো না, কী বলবে।
অপু একবার আকাশের দিকে তাকাইল, তারপর বলিল—বলা যায় না, বলা যায় না। ভাষা জানি নে—
পরের দিন সকালে যদু পিওন আসিল মনি অর্ডার দিতে। কিছুদিন আগে কাগজে হৈমন্তীর গল্প বাহির হইয়াছিল। তাহার পারিশ্রমিক পনেরোটি টাকা আসিয়াছে। যদু পিওন এমনি মনি অর্ডার আগেও কয়েকবার বিলি করিয়াছে। মৌপাহাডির নিরালায় হৈমন্তী বেশ কয়েকটি গল্প লিখিয়াছে।
মনি অর্ডার ফর্মে হৈমন্তী সই করিতেছে, অপু আসিয়া পিছনে দাঁড়াইল।
— বঙ্গবাণীর টাকাটা এলো বুঝি?
হৈমন্তী ফিরিয়া মুখ টিপিয়া হাসিল।
যদু, পিওন বলিল–এই তল্লাটে এমন রোজগেরে বৌ আর দেখিনি বাবু।
হৈমন্তী হাসিয়া বলিল– তোমাকে আর বকবক কবতে হবে না যদুদা। এই টাকাটা নাও, বাচাঁদের মিষ্টি কিনে দিয়ো।
টাকা দুইটি হাত পাতিয়া লইয়া বলিল–দিদির আরও অনেক মনি অর্ডার আসুক।
হাসিতে হাসিতে যদু চিঠির ব্যাগ তুলিয়া রওনা দিল।
সারাদিন অপু টেবিলেই বসিয়া রহিল। লিখিতে লিখিতে কখন যে দিন কাটিয়া গেল কে জানে। উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ের শেষ বাক্যটি লেখা হইয়া গেল। স্তূপাকার কাগজগুলির দিকে তাকাইয়া অপুর অবাক লাগিল। শেষ হইয়া গিয়াছে। বিনিদ্র রাত্রির বেদনা-অনুভূতির ফল ওই কাগজগুলি। এইবার প্যাকেটবন্দী হইয়া কলিকাতায় যাইবে, নাকের উপর চশমা নামিয়া আসা বৃদ্ধ কম্পোজিটার বানান করিয়া করিয়া কম্পোজ করিবে।
শরীরে ভীষণ ক্লান্তি। এত পরিশ্রম সে একসঙ্গে কখনও করে নাই। ডান হাত ব্যথায় টনটন করিতেছে, হৈমন্তীকে ডাকিয়া অপু বলিল– একটু গরমজল করে দাও তো, হাতটা বড্ড বাথা করছে, ড়ুবিয়ে রাখব।
কাজ মিটিয়া গেল। সামনে অব বড়ো কোন কাজ নাই। অপু আপনমনে বেড়াইতেছিল। ছেলেবেলাকার অভ্যাসমত হাতে সরু কঞ্চির মতো একটা লাঠি লইয়াছে। অনেকক্ষণ ঘুরিবার পর মনে হইল, সে আজ ভীষণ অন্যমনস্ক। অনেক পুরাতন কথা মনে পড়িতেছে। অনেক পুরাতন মুখ। অপৰ্ণার কথা বড়ো বেশি মনে আসিতেছে। তাহাকে কিছু দেওয়া হয় নাই–তখন অপুর পয়সা ছিল না। অথচ অপর্ণা হাসিমুখে অবস্থার সহিত খাপ খাওয়াইয়া নিয়াছিল–কখনও অভিযোগ করে নাই। বড়ো সিঁদুরের টিপ পরা অপর্ণার সলজ্জ মুখখানি আজ অনেকদিন বাদে মনে পড়িয়া গেল। তাহার চিবুকের টোলটা সে স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছে।
কাশীতে যখন বাবা মারা যায়–উঃ কী দিন গিয়াছে। কনকনে শীতের রাত্রে সেই গঙ্গাস্নান করিয়া বাড়ি ফেরা।
সবার হইতে বেশি মনে পড়ে মাকে। কখনও কিছু চায় নাই, আশা করে নাই। অপু সুখে থাকিলেই সুখী হইত। মনসাপোতার বাড়িতে ফিরিয়া তাহার প্রতি ছাত্রীর অভিভাবকদের সদয় ব্যবহারের কথা সে মাকে খুশি করিবার জন্য বানাইয়া বানাইয়া বলিত। মা সরল মনে সব বিশ্বাস করিত। ছিন্নবেশ-পরা মায়ের হাস্যময়ী চেহারা মনে পড়িয়া যায়।
ঘুরিতে ঘুরিতে সুবর্ণরেখার তীরে আসিয়া পড়িয়াছে অপু। বসিলে মন্দ হয় না। যে পাথরটার উপর বসিয়া সে লিখিত, জুতা ছাড়িয়া তাহার উপর অপু বসিল। জনপ্রাণী নাই কোনদিকে। সুবর্ণরেখার শূন্য বুকটা খা-খাঁ করিতেছে। কয়েকটি বক একপায়ে নদীর চরে ধ্যানমগ্নের মতো দাঁড়াইয়া। সূর্য যেন জ্বলিতেছে। অপুর মনে হইল, সবদিকে কেমন একটা নাই-নাই ভাব। আকাশ বিক্ত। এতটুকু মেঘ নাই। নদীর বুক রিক্ত, জল নাই। দিগন্ত পর্যন্ত প্রান্তর রিক্ত, নদীর ওপারে কেবল একটিমাত্র পলাশ গাছ বিপুল একটি প্রাকৃতিক কবিতার যতিচিহ্নের মতো সোজা মাথা তুলিয়া আছে। গাছটার সর্বাঙ্গে যেন আগুন। নিঃস্ব প্রান্তরের পটভূমিতে পুষ্পিত পলাশগাছটাকে সামান্য এতটুকু সত্ত্বনার মতো দেখাইতেছে।
এমনি একটা দিনে কলিকাতা হইতে মায়ের জন্য সামান্য কিছু জিনিস কিনিয়া গ্রামের পথে হাঁটিয়া মনসাপোতায় ফিরিয়াছিল। দরজা খুলিয়া তাহাকে দেখিয়া মা কি খুশিই না হইয়াছিল! মাকে জড়াইয়া আদর করিলে কেমন সুন্দর গন্ধ পাওয়া যাইত মায়ের গায়ে।
মাকে মনে পড়িতেছে। ছোটবেলায় মা তাহাকে পাঠশালায় যাইবার জন্য খুব সকালে ঘুম হইতে তুলিয়া দিত, নিজের হাতে সাজাইয়া হাতে বই দিয়া বলিত–যাও বাবা, পাঠশালায় যাও। তুমি লেখাপড়া শিখে মানুষ হলে বংশে্র নাম উজ্জ্বল হবে।
সে কি মানুষ হইতে পারিয়াছে? অথবা মা কি অন্য কিছু চাহিয়াছিল, যা সে হইতে পারে নাই?
একদিন রাগ করিয়া সে মায়ের দেওয়া তালের বড়া ছুঁড়িয়া উঠানে ফেলিয়া দিয়াছিল। অনেকদিন আগের ঘটনাটা। মায়ের কত কষ্টে জোগাড় করা জিনিসে তৈয়ারি।
এসব মনে করিয়া তাহার চোখে জল আসিতেছে কেন? আশ্চর্য! ইহা কি কাঁদিবার সময় হইল? এমন সুন্দর পরিবেশে? কিছু দূরে নদীর বাঁকের মুখটায় বালির উপর তাপতরঙ্গ থর থর করিয়া কাঁপিতেছে, আকাশে সূর্য, ধূ-ধূ প্ৰান্তর-সব মিলাইয়া স্বরলিপির তীব্র মধ্যমের মতো।
