কোন সময় লিখিতে লিখিতে মাথা একেবারে ফাঁকা হইয়া যায়, হাত-পা অবশ হইয়া আসে। কলামটা টেবিলে নামাইয়া অপু অনুভব করে, শরীর ভাঙিয়া আসিতেছে-আচ্ছন্নের মতো সে কাজ করিয়া যাইতেছে। কিছুটা লোভে লোভেও বটে। কাজটা শেষ হইলে আপাতত ছুটি।
হৈমন্তী আসিয়া বকে–রেখে দাও তো! এরকম খাটলে শরীর দুদিনে ভেঙে পড়বে। শোবে চলো।
অপু চুলের ভিতর হাত চালাইতে চালাইতে বলে–আর একটু, এই চ্যাপ্টারটা শেষ করে ফেলি।
হৈমন্তী বুঝাইয়া পারে না।
একদিন অপু টেবিলেই ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। হাত হইতে কলম খসিয়া পড়িয়াছিল। খাতার উপর মাথা রাখিয়া অপু স্বপ্ন দেখিতেছিল, মধ্যপ্রদেশের সেই বন্যজীবনটা আবার ফিরিয়াছে। সে তেজী ঘোড়ার সওয়ার হইয়া আদিগন্ত হাঁটুসমান জঙ্গলে তীব্ৰবেগে ভ্ৰমণ করিতেছে। কালপুরুষ পশ্চিম দিগন্ত ছুঁই-ছুঁই করিয়াছে। বাতাসে সেই সজীব ভাবটা।
বাধা দিবার কেহ নাই, মহাশূন্যে গাঢ় অন্ধকারে ভীমরেগে ধাবমান উল্কার মতো জীবন আবার ফিরিয়াছে। চিন্তা নাই, দুঃখ নাই, ক্ষোভ নাই-স্বপ্নের মধ্যেই সব পাইবার তৃপ্তি তাহাকে আচ্ছন্ন করিতেছে। খুব জোরে ঘোড়া ছুটাইয়াছে সে। দৌড়-দৌড়-দৌড়। সামনে কালোমত কী একটা আসিতেছে, বিশাল পাহাড়ের মতো। সে ঘোড়ার রাশ টানিল।
ঘুম ভাঙিয়া সে কলমটা আবার তুলিয়া লইল, কিন্তু আর লিখিবার উৎসাহ নাই। স্বপ্ন এখনও মাথার মধ্যে ঘুরিতেছে। অর্থটা বোঝা যাইতেছে না বলিয়া অস্বস্তি হইতেছে। টেবিলের ওপাশে জানালা খোলা, হু-হু বাতাস আসিয়া কাগজ-পত্ৰ এলোমেলো হইতেছে। সবাই ঘুমাইয়া, কেবল বহুদূরের কোন সাঁওতাল বস্তির ক্লান্ত মাদলের শব্দ এখনও শোনা যায়।
চিঠি লিখিবার প্যাডটা টানিয়া লইয়া অপু মনে করিয়া করিয়া বহু পুরাতন বন্ধু আর আত্মীয়দের এক-একখানা চিঠি লিখিল। অনেককে লেখা হইল না, তাহাদের ঠিকানা মনে নাই। লিখিল–ভালো আছো? অনেকদিন খবর নিতে পারিনি, স্বার্থপরের মতো নিজের ভেতরে নিজেকে গুটিয়ে বসে ছিলাম। কিন্তু মানুষ এক বাঁচে না, তোমাদের সবাইকে আমার জীবনে বড়ো দরকার। আমাকে মনে রেখো, একেবারে ভুলে যেয়ো না যেন। মানুষের মধ্যে বেঁচে আছি—এ বোধটা আমার জীবনে যেমন প্রয়োজন, তোমাদের জীবনেও তেমনি।
চিঠিগুলি লিখিতে রাত শেষ হইয়া গেল। পূর্বদিকের টিলোটার পাশের আকাশে লাল রঙ ধরিল। মেঘের লম্বা স্তরগুলিকে দেখাইতেছে যেন আঁকা ছবি। আলো ফু দিয়া নিভাইয়া অপু বারান্দায় আসিয়া দাঁড়াইল।
বিকালে অপু ছেলেকে ডাকিয়া বলিল–খোকা চল, বেরুই কোথাও।
উঁচুনিচু লালমাটির ডাঙা ধরিয়া দুইজনে কিছুক্ষণ হাঁটিল। অনুচ্চ একটি পাহাড়ের কাছে আসিয়া অপু বলিল–আয়, এখানে বসি।
দুইটা ছোট পাথরে দুইজনে বসিল। কাজল বলিল–বাবা, সেই যে গল্পটা। নির্জন দুর্গে একলা রাজকুমারী থাকতো, সেটা আজ শেষ করো।–
সে কথা কানে না লইয়া অপু, ডাকিল-খোকা।
-কী বাবা?
-আমার কাছে উঠে আয় তো একটু।
কাজল বাবাব কোল ঘেঁষিয়া দাঁড়াইল।
–খোকা, তুই আমায় ভালোবাসিস?
উত্তর না দিয়া কাজল বাবাব বুকে মুখ গুজিয়া রহিল। তাহার বয়সী ছেলের পক্ষে ইহা বিসদৃশ হইলেও, বাবা ও মায়ের আদর পাইলে সে এমনি করিয়া থাকে।
অপু ছেলের মাথায় হাত বুলাইতে লাগিল। সূর্যাস্তের রঙে রঞ্জিত প্রান্তরে সে অনেকক্ষণ ছেলের সহিত বসিয়া রহিল। ক্রমে আলো কমিয়া কীটপতঙ্গের গুঞ্জন শুরু হইল। অপু উঠিয়া ছেলের হাত ধরিল।
–চল, বাড়ি চল, তোর মা ভাববে।
বাবার হাত ধরিয়া কাজল হাঁটিতেছিল। বাবা আজ এত গম্ভীব কেন?
কী একটা প্রাণী সুড়ৎ করিয়া রাস্তা পার হইল, অন্ধকারে দেখা গেল না। হয়তো মেঠো ইঁদুর। বাড়ি ফিরিতেই হৈমন্তী বলিল–তোমাকে বলে আর পারা গেল না। এত দেরি করে ফিরিতে হয়। খাবাব এদিকে জুড়িয়ে ঠাণ্ডা হয়ে গেল–
অপু কাজলের হাত ছাড়িয়া দিয়া অদ্ভুত ছেলেমানুষির সুরে বলিল– আর করব না। হৈমন্তী, সত্যি বলছি- আর কখনও না–
রাত্ৰে শুইয়া অপু, হৈমন্তীকে ডাকিল–হৈমন্তী।
–কী গো?
–বাইরে কেমন জ্যোৎস্না উঠেছে দেখেছি?
সুন্দর জ্যোৎস্নায় উঠান ভাসিতেছে। অষ্টমী তিথি, চাঁদ দিগন্তের দিকে ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে। বিষণ্ণ অথচ সুন্দর জ্যোৎস্না।
হৈমন্তী বলিল–সুন্দর।
–চল, একটু বাইরে গিয়ে বসি। ঘরে ভালো লাগছে না।
ঘুমন্ত কাজলের চারপাশে মশারি গুজিয়া দিয়া দুইজনে উঠানে গিয়া বসিল। শব্দহীন রাত্রি। চাঁদের আলোয় একটু বসিতেই কেমন একটা আবেশ জড়াইয়া আসে দেহে-মনে।
-হৈমন্তী, কাল আমার উপন্যাস শেষ হয়ে যাবে। বড়ো ভালো লাগছে। যা লিখতে চেয়েছিলাম–ঠিক সেই রকমটি হল না, কিন্তু অনেকখানি পেরেছি বলে মনে হচ্ছে।
কাছেই কোথাও ঝিঁঝি ডাকিতে শুরু করিল।
–ছোটবেলায় দূরে তাকিয়ে ভাবতাম, ওই যেখানে আকাশ আর মাটি মিলেছে, তার ওপারেই আছে রূপকথার ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর দেশ। তেমনি আমার লেখায় একটা দূর দিগন্তের ইঙ্গিত রয়েই গেল। সারাজীবন আমিও এগুলাম, স্বপ্নটাও মরীচিকার মতো পিছিয়ে গেল।
হৈমন্তী অপুর হাঁটুতে হাত রাখিয়া বলিল–তোমার জীবনে কি কোন দুঃখ আছে?
–না, আমি পবিপূর্ণ, আমি তৃপ্ত। কারণ আমি বুঝেছি সন্ধানেই আনন্দ, প্ৰাপ্তিতে পরিসমাপ্তি। আমি পথ চলতে ভালোবাসি হৈমন্তী। আমি পথের শেষ চাই না।
